kalerkantho


মহানবী (সা.) এর জীবনে সমঝোতার অনন্য নজির

রায়হান রাশেদ   

৫ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১৯:৪১



মহানবী (সা.) এর জীবনে সমঝোতার অনন্য নজির

মনে পড়ে, ছেলেবেলার প্রতিযোগিতামূলক এক ক্রিকেট ম্যাচের কথা। বন্ধুর আবদারের কাছে হেরে গিয়ে তাকে বল মারতে দিয়েছিলাম। ভালো বল করতে জানত না; তারপরও দিয়েছিলাম। সে এক ওভারে ২২ রান দিয়ে আমাদের প্রিয় মানুষের কিছু পরাজিত মুখ উপহার দেয়। তখন রাগে জিদে ও লজ্জায় তাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে মাঠে ফেলে দিয়েছিলাম। ছোট ভাই মারফত 'ঘাড় ধাক্কা দেওয়ার’ বিষয়টা বাবাকে জানলেন। ডেকে নিয়ে কিছু কথা বললেন, যা আজও আমি অন্তরের কান দিয়ে শুনতে পাই। কথাগুলো আজও আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। বাবার কথাগুলো ছিল এমন : ‘ঝগড়া ও রুঢ় আচরণে মানুষের ভালবাসা পাওয়া যায় না। এমন করলে কেউ তোমার বন্ধু হবে না। কোনো মানুষ তোমার পাশে থাকবে না।

আর যদি তুমি মানুষের জন্য নিবেদিত প্রাণহতে পারো, সবার জন্য উদার হতে পারো, তাহলে সবাই তোমায় ভালোবাসবে। তোমাকে ঘিরে থাকবে মানুষের নানান আয়োজন। মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ো। সমঝোতায় জীবনকে সাজাও। ’ 

হিংসা, বিদ্বেষ, বাগাড়ম্বরতা ও ঝগড়ায় কোনো কল্যাণ নেই। মন্দ আচরণ জীবনে সুফল বয়ে আনতে পারে না । অন্তরকে তৃপ্ত করতে পারে না সম্পর্কচ্ছিন্নতা। সমাজে লোবানের গন্ধ ছড়াতে পারে না বিচ্ছেদের বৈরী হাওয়া। অমিমাংসা মানুষ, সমাজ ও বিশ্বকে নিক্ষেপ করে লয়, পতন আর ধ্বংসের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। সম্পর্কহীন হৃদয় কোনো ‘হৃদয়’ নয়। সমঝোতায় সুখ। সমঝোতায় শান্তি। সমঝোতা মানুষের পারষ্পরিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করে। সম্পর্ককে জিইয়ে রাখে যুগের পর যুগ। অন্তরে অন্তরে গড়ে ওঠে অদেখা তবে উপলব্ধি জাগ্রত ভালবাসার ক্যানভাস। হৃদয়ের জমিনে বর্ষণ হয় অদৃশ্য তৃপ্তির বারি। সমঝোতা মানুষকে শুদ্ধ গল্পে বাঁচিয়ে রাখে মাটির এ পৃথিবীতে। সমঝোতা নির্মাণ করে একদল সভ্য মানুষ, একটি সভ্য সমাজ ও আলোকিত ভোর। সভ্য মানুষ সমাজ পৃথিবী বিনির্মাণে সমঝোতা অবশ্যম্ভাবী। জগতের মালিক আল্লাহ তাআলা মানুষকে সমঝোতা, পারষ্পরিক সুসম্পর্ক গড়ার জন্য প্রত্যাদেশ নাজিল করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘ তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজেদের পারষ্পরিক সম্পর্ক সঠিকরূপে গড়ে নাও। ’ ( সুরা আনফাল : ০১)

ইসলামের নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ৬ষ্ঠ হিজরিতে ১৪০০ সাহাবির এক দল নিয়ে ওমরা পালনের জন্য মক্কার দিকে রওনা হন। হুদায়বিয়া নামক স্থানে গেলে মুশরিকদের দ্বারা বাধা প্রাপ্ত হন। সেখানে উভয় পক্ষের সম্মতি অনুযায়ী ৬টি শর্ত আরোপপূর্বক সন্ধি চুক্তি হয়। প্রত্যক্ষভাবে সন্ধিগুলো ছিল মুসলমানদের বিপক্ষে। প্রসিদ্ধ অনেক সাহাবি এই সন্ধি চুক্তির বিরোধী ছিলেন। কিন্তু ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, এই সন্ধির মাধ্যমে পরবর্তীতে মক্কা বিজয় হয়েছিল। ইসলামের চিরন্তন শান্তির পতাকা খোদার আকাশে উড্ডীন হয়েছিল। সন্ধি সমঝোতা একটা জাতিকে পৃথিবী বিখ্যাত বিজয় দিয়েছে। পৃথিবীর বাতাসে ছড়িয়ে দিয়েছে আতর আতর সুভাস। পৃথিবী শহরের অলি গলিতে স্থাপন করেছে সভ্যতার বিদ্যানিকেতন। পৃথিবীকে শান্তি সমৃদ্ধিতে ভরে দিয়েছে। সেই সন্ধির কল্যাণে পৃথিবী আজও হাসে পুষ্পের হাসি। বাগানের ফুল আজও সৌরভ ছড়ায়। শুদ্ধতা ও সভ্যতার আলোচনা হয় গোল টেবিলে। সন্ধিতেই পবিত্র জীবন নিহিত। সন্ধিতেই অগাধ কল্যাণ। সন্ধিকে ভালোবেসে হৃদয়ে ধারণ করে জাতি ভাসতে হবে সুখের ভেলায়। প্রশান্ত চিত্তে ঘুরতে পারবে পৃথিবীর জনপদে। আল্লাহ তাআলা মানুষকে সন্ধির শিক্ষা দিয়েছেন বাস্তবসম্মতভাবে। আল্লাহ বলেন, ‘সন্ধি সর্ববস্থায় উত্তম। ’ ( সুরা নিসা : ১২৮)

পৃথিবীকে সভ্যতায় আলোকদীপ্ত করতে হলে মানুষের মাঝে হৃদ্যতা থাকতে হবে গভীরের। মনের ঘরে আরেক মনের বসবাস স্থায়ী করতে হবে। আরেকটা মানুষের জন্য অস্তিত্বে অনুসন্ধান করতে হবে মায়া মমতা।  
মুসলমানরা ভাই ভাই। কেউ কারো বিরোধী নয়। মুসলমানের সম্পর্কের শিকড় খুব গভীরে প্রোথিত। খোদার কুদরতি অনিঃশেষিত খাতায় সম্পর্কের ঘন গভীরতা লিখিত। পরষ্পর বিরুদ্ধ দুটি মানুষের মধ্যে সুসম্পর্ক স্থাপন করতে পারলে আল্লাহর পছন্দনীয় বান্দা হওয়া সম্ভব। সম্পর্ক স্থাপনকারীকে আল্লাহর রহমতের আকীর্ণ চাদরে আবৃত করবেন; এটা আল্লাহর ওয়াদা। আল্লাহ বলেন, 'মুমিনরা পরষ্পরে ভাই ভাই। অতএব তোমাদের ভাইদের পারষ্পরিক সম্পর্ক যথাযথভাবে পুনর্গঠিত করে দাও। আল্লাহকে ভয় করো, আশা করা যায় তোমাদের প্রতি রহম করা হবে। ’ ( সুরা হুজরাত : ১০) 

হিংসা, গিবত আর সমালোচনায় অষ্টপ্রহর ডুবে থাকে মানবসমাজ। গোল টেবিল বৈঠক, আড্ডার মহল, ধূমায়িত চায়ের কাপে চুমুকে চুমুকে, ক্লাসে এবং ক্লাসের বাইরে এমনকি একান্ত কথার ফাঁকেও আমরা অপরজনের সমালোচনা করতে ভুল করি না। গিবত আর সমালোচনা যেন মানুষের সব আড্ডার প্রতিপাদ্য বিষয়। একজনকে অপরজনের বিরুদ্ধে ফুসলে দিয়ে অলীক আত্মশান্তিতে ভোগি আমরা। ঝগড়ার আগুনে ‘কেরোসিন তৈল’ ঢেলে দিয়ে মজা পাই। অপরজনকে সুন্দরের এ পৃথিবী থেকে নিশ্চিত করে দিতে, তার সম্মান মাটিতে মিশিয়ে দিতে আমরা সব ধরণের কলাকৌশল অবলম্বন করি। গোপনে গোপনে সলাপরামর্শ করি। এসবে সাময়িক ভালো লাগা থাকলেও গভীরে রয়েছে হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করে দেওয়ার উপকরণ। মানুষের উপকারে জীবনকে উৎসর্গ করার নামই তো জীবন। মানুষের জন্য নিজেকে ভালবাসাঘেরা ছায়াদার আকাশ, নিবেদিত প্রাণ, হৃদয়কে উদার, তৃষিত মনের জন্য সিক্ত বারি হতে হবে।   যুক্তি-পরামর্শে মানুষের কল্যাণ কামনা করতে হবে। মানুষকে ভালোবেসে মানুষের হৃদয়ে সুখের পূবালী হাওয়া বইয়ে দিতে পারলে জীবন  আলোকিত পৃথিবীর। এ জীবন পৃথিবীর  সব মানুষের। এ জীবনের প্রেমে পড়েন জগতের সৃষ্টিকর্তা মহান প্রভু। তাকে সংগোপনে স্মরণে এনে শান্তি পায় ধরার সব সৃষ্টি। তার সঙ্গে অভিসারে সময় যাপন করতে চায় মনওয়ালা।  

মানুষের সলাপরামর্শের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘লোকদের গোপন সলা-পরামর্শে প্রায়ই কোনো কল্যাণ নিহিত থাকে না। অবশ্য কেউ যদি গোপনে কাউকে দান-খয়রাত করার জন্য উপদেশ দেয়, অথবা কোনো ভাল কাজের জন্য অথবা লোকদের পরষ্পরের কাজ কর্মের সংশোধন করার জন্য কাউকে কিছু বলে তবে তা নিশ্চয় ভালো কথা। আল্লাহর সন্তোষ লাভের জন্য যে কেউ এমন করবে তাকে আমি বিরাট প্রতিদান দেব। ’ ( সুরা নিসা : ১১৪)  

ভালো কাজ অন্তরে প্রশান্তি আনে। হৃদয়ে সুখের দোলা দেয়। মানুষের পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে অনুপ্রাণিত করে। সুন্দর কাজেরা জগতের ফ্রেমে সুভাসিত প্রাণ নিয়ে বন্ধি থাকে অনেকদিন। তাদের কর্ম ও তাদের মানুষ স্মরণ রাখে যুগ থেকে যুগান্তর পর্যন্ত। দুটি বিরোধী মনকে এক ডুরে গেঁথে দেওয়া পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কাজের মধ্যে একটি। মানুষের মাঝে ন্যায়ের সঙ্গে সমঝোতা করে দেওয়া সদকা। সদকায় সওয়াব। সদকায় আমলের পাল্লা ভারি হয়। প্রাপ্তির ঝুলি পূর্ণ হয়। সদকা চিরস্থায়ী জীবনে সুন্দর  বাসস্থান তৈরী করে। সুতরাং দুই ব্যক্তির মাঝে ইনসাফ সম্মত সমাঝোত বিধান তৈরি করে সদকার সওয়াব নিজের আমলের ডায়েরিতে যুক্ত করা কর্তব্য। হাদিসে এসেছে, ‘ দুই ব্যক্তির মাঝখানে ইনসাফ সহকারে সমাঝোতা স্থাপন করে দেওয়া সদকা হিসেবে গণ্য। ’ (বুখারি, হাদিস : ২৯৮৯)

সমঝোতা জীবন সমাজ ও পৃথিবীর জন্য অতি জরুরি। সমঝোতা জগতকে আলোকদীপ্ত করতে পারে। আলোর ফল্গুধারা বহমান করতে পারে মানুষের হৃদয় মিনারে। সমঝোতাকে ইসলাম দেখেছে অনেক গুরুত্বের চোখে। গর্বের ধর্ম ইসলাম পরষ্পরের মধ্যে সমঝোতা বিধান স্থাপন করে দিতে মানুষকে বিভিন্ন ভাবে উদ্বুদ্ধ করেছে। পরষ্পরের মধ্যে সমঝোতা করে দেবার লক্ষে মিথ্যার আশ্রয় নিতেও অনুমোদন দিয়েছে ইসলাম। অথচ ইসলামে মিথ্যার কোন স্থান নেই। মিথ্যাকে সমস্ত ধ্বংসের মূল বলে ঘোষণা করেছে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, উম্মে কুলসুম (রা.) থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, ‘আমি রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, কল্যাণ লাভ করার উদ্দেশ্যে যে ব্যক্তি মিথ্যা কথার মাধ্যমে পরষ্পরবিরোধী দুই ব্যক্তির মধ্যে সন্ধি স্থাপন করে সে মিথ্যুক নয়। ’ (বুখারি, হাদিস : ২৬৯২, মুসলিম, হাদিস : ২৬০৫) 

ইসলাম সূচনাতেই মানুষকে সমঝোতার শিক্ষা দিয়েছে। সমঝোতায় জীবন যাপন করতে বলেছে। সমঝোতা প্রতিষ্ঠা করতে আদেশ করেছে । ইসলামের যুগান্তকারী শিক্ষা বাস্তব জীবনে আকীর্ণ করতে পারলে জীবন হবে আলোকিত ও সুভাসিত। সভ্যতা আর প্রগতিতে পৃথিবী জিইয়ে থাকবে আখের পর্যন্ত।  

লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক


মন্তব্য