kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কাবাব-ই-ঢাকা

ঢাকা শহরে কাবাব খেতে চাইলেই তিনটি এলাকার নাম মনে আসে একলহমায়। তা হলো পুরান ঢাকা, মোহাম্মদপুর আর মিরপুর। এসব কাবাবের ইতিহাস আর রেসিপির কথা জানাচ্ছেন আল মারুফ রাসেল। ছবিও তাঁরই তোলা

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



কাবাব-ই-ঢাকা

সোহেলের শিক কাবাব

পুরান ঢাকার নারিন্দা পুলিশ ফাঁড়ির কাছে সোহেল হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের শিক কাবাবের খ্যাতি সবার মুখে।

অর্ডার করতেই ১০ মিনিটের মধ্যে টেবিলে এসে হাজির হলো কয়লায় পোড়া কালচে-খয়েরি রঙের কাবাব।

সঙ্গে তেলে ভাজা সাধারণ পরোটা। আর স্বাদ! মুখে দিতেই যেন মাংস গলে যায়। মাংস আর মসলার দুর্দান্ত মিশ্রণ।

প্রতি শিক ৪৫, আর পরোটা পাঁচ টাকা। কিভাবে বানান জানতে চাইলেই কর্মব্যস্ত কাবাবের কারিগর ফিরিস্তি দিয়ে গেলেন।

উপকরণ

মাংসের কিমা (গরু বা খাসি) ১ কেজি, টক দই ৩ টেবিল চামচ, কর্নফ্লাওয়ার ২ টেবিল চামচ, পুদিনাপাতা ৫০ গ্রাম, ধনেপাতা ৫০ গ্রাম, কাঁচা মরিচ ৫টি, আদা বাটা ২ টেবিল চামচ, রসুন বাটা দুই টেবিল চামচ, পেঁপে বাটা সিকি কাপ, ধনে গুঁড়া ১ টেবিল চামচ, জিরা গুঁড়া ২ টেবিল চামচ, গরম মসলা গুঁড়া ১ টেবিল চামচ, মরিচ গুঁড়া ২ টেবিল চামচ, সরিষার তেল ৪ টেবিল চামচ।

যেভাবে তৈরি করবেন

১.  মাংসের সঙ্গে সব উপকরণ একসঙ্গে মাখিয়ে ২ ঘণ্টা মেরিনেট করে রেখে দিন। এরপর লম্বা শিকে ভালো করে মাংস লাগিয়ে নিন।

২.  বারবিকিউ চুলায় কয়লা জ্বালিয়ে শিকগুলো রাখুন।

৩.  শিকগুলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সব পাশ ভালোভাবে আগুনের আঁচে ঝলসে নিন। একটি ব্রাশে সরিষার তেল লাগিয়ে মাঝেমধ্যে শিকগুলো ব্রাশ করুন।

৪.  পোড়া পোড়া কালচে হয়ে এলে নামিয়ে ফেলুন।

 

বিসমিল্লাহর বটি কাবাব

পুরান ঢাকার নাজিরাবাজারের মোড়েই পাশাপাশি দুটি হোটেল। দুটিতেই আলাদা করে সাইনবোর্ড দেওয়া নাম এক ‘বিসমিল্লাহ কাবাব ঘর’।   ছোট অংশটি চলছে সত্তরের দশক থেকে।

বেয়ারাকে অর্ডার করার মিনিট পনেরো পর টেবিলে হাজির হলো বটি কাবাব। মিহি হয়ে যাওয়া খাসির মাংস তেলে ভেজে কালচে বাদামি করে ফেলা, কিন্তু পুড়ে যাওয়া নয়। সঙ্গে রয়েছে প্রচুর পেঁয়াজের উপস্থিতি। পরোটা ছিঁড়ে মাংস জড়িয়ে সালাদের সঙ্গে মুখে পুরে দিতেই যেন মুখের ভেতরে চমত্কার স্বাদের বিস্ফোরণ ঘটল। বটি কাবাব ৬০ টাকা আর পরোটা ৫ টাকা। ব্যস্ত কারিগরের কথা বলার সময় নেই। তার পরও একটু সময় বের করে বলে গেলেন বটি কাবাবের গুপ্ত রহস্যের অনেকটা।

উপকরণ

মাংসের কিমা (গরু বা খাসি) ১ কেজি, কাঁচা পেঁপে বাটা ৪ টেবিল চামচ, পেঁয়াজ কুচি ২ কাপ, আদা বাটা ২ টেবিল চামচ, রসুন বাটা ২ টেবিল চামচ, কাঁচা মরিচ বাটা ১ চা চামচ, মরিচের গুঁড়া ১ চা চামচ, গরম মসলা গুঁড়া ১ চা চামচ, তেল ১ কাপ, লবণ স্বাদমতো।

যেভাবে তৈরি করবেন

১.  একটি বাটিতে কাঁচা পেঁপে, আদা, রসুন ও কাঁচা মরিচ বাটা, মরিচ গুঁড়া, গরম মসলা গুঁড়া ও লবণ একসঙ্গে ভালো করে মিশিয়ে নিন।

২.  মিশ্রণটি মাংসের সঙ্গে মাখিয়ে ফ্রিজে তিন থেকে চার ঘণ্টা রেখে দিন। ১২ ঘণ্টা রাখতে পারলে সবচেয়ে ভালো হয়। এবার মাংসগুলো গরম তেলে চুলায় দিয়ে ভেজে ফেলুন।

৩.  মাংস আধাসিদ্ধ হয়ে এলে পেঁয়াজ কুচিগুলো দিন।

৪.  পুরোপুরি হয়ে গেলে প্লেটে নামিয়ে লুচি, পরোটা কিংবা রুটি দিয়ে পরিবেশন করুন।

 

মোহাম্মদপুরের তন্দুরি চিকেন

মোহাম্মদপুর টাউন হলের ঠিক উল্টো দিকে জাকির হোসেন রোডে ঢুকতেই কয়েকটি খাবারের দোকান। তবে কাবাবের দোকান একটাই। নামহীন এই দোকান নব্বইয়ের দশক থেকে মাতিয়ে রেখেছে। মূলত শিক কাবাব আর তন্দুরি চিকেন করলেও ঝুরা মাংস, ঝোল চাপের মতো হারিয়ে যেতে বসা খাবারও মেলে। দুটি দোকান এক করে একটায় পরোটা ভাজা আর মাংস পোড়ানোর কাজ করা হয়। অন্যটায় তিনটি টেবিলে চলে খাওয়ার পর্ব। তবে বেশির ভাগ সময় ভিড়ের কারণে দোকানের বাইরে দাঁড়িয়ে খেতে হয়। এই দোকানের অন্যতম জনপ্রিয় খাবার তন্দুরি চিকেন। দামও মাত্র ৮০ টাকা। কারিগর জানালেন তন্দুরি চিকেন বানানোর রেসিপি।

উপকরণ

মাঝারি আকারের মুরগি ১টি, টক দই ৪ টেবিল চামচ, টমেটো সস ৩ টেবিল চামচ, আদা বাটা দেড় চা চামচ, রসুন বাটা ১ চা চামচ, ভিনেগার ১ টেবিল চামচ, গোলমরিচ গুঁড়া ২ চা চামচ, শুকনা মরিচ ভাজা গুঁড়া ২ চা চামচ, তন্দুরি মসলা ২ চা চামচ, গরম মসলার গুঁড়া ১ চা চামচ, সরিষা বাটা ৪ চা চামচ, ঘি ২ টেবিল চামচ, লবণ স্বাদমতো।

যেভাবে তৈরি করবেন

১.   মুরগি চার টুকরা করে মাংসের ওপর ছুরি দিয়ে দাগ কেটে রাখুন।

২.   ঘি, টক দই, ভিনেগার মিশিয়ে সস বানিয়ে নিন। এগুলো বাদে বাকি সব উপকরণ দিয়ে মাংস মাখিয়ে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা মেরিনেট করে রাখুন।

৩.   এবার বারবিকিউ চুলায় কাঠকয়লার আগুনে মাংস ঝলসে নিন। মাঝেমধ্যে সস ব্রাশ করুন। পোড়া পোড়া হয়ে গেলে নামিয়ে পরিবেশন করুন।

 

মুস্তাকিমের চাপ

শেষ বিকেল থেকে মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের আশপাশ ভাজা মাংস আর কাবাবের সুঘ্রাণে ম ম। দোকান অনেকগুলো। তবে ‘মুস্তাকিম ভ্যারাইটিজ কাবাব’-এর সুনাম অনেক বেশি। ১৯৮৬ সাল থেকে চলছে ব্যবসা। এককালের ছাপরা দোকান এখন ডুপ্লেক্স।

দোতলায় বসে অর্ডার গেল গরুর চাপের। শসা-পেঁয়াজের সালাদে সস, ঝাল মসলার মিশ্রণ চলে এলো প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। আর ১০ মিনিট বাদে এলো চাপ। তেল চুপচুপে চাপটা টিস্যু দিয়ে একটু চেপে তেল বের করে খেতেই মনে হলো অসাধারণ। সঙ্গে লুচি। প্রতিটি লুচি তিন টাকা আর বিফ চাপ ৮০ টাকা। চাপ ঘরে বানানো বেশ সহজ অন্য যেকোনো কাবাবের চেয়ে, জানালেন এর কারিগর। তাই ঘরে বসেই পেতে পারেন এই চাপের স্বাদ।

উপকরণ

হাড় ছাড়া গরুর মাংস ১ কেজি (২ ইঞ্চি টুকরা করে কাটা), পেঁয়াজ বাটা ২ টেবিল চামচ, মরিচ গুঁড়া ২ চা চামচ, আদা বাটা ২ টেবিল চামচ, রসুন বাটা ১ টেবিল চামচ, জিরা গুঁড়া ২ চা চামচ, টক দই ৪ টেবিল চামচ, গরম মসলা গুঁড়া ২ টেবিল চামচ (দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গ, তেজপাতা, জায়ফল, জয়ত্রী, কাবাব চিনি, শাহি জিরা অল্প করে মিশিয়ে খুব হালকা টেলে নিয়ে গুঁড়া করে নিতে হবে। জায়ফল, জয়ত্রী আর শাহি জিরা পরিমাণে একেবারেই কম নিতে হবে, না হলে তেতো লাগবে), লবণ স্বাদমতো, পেঁপে বাটা ৩ চা চামচ, সয়াবিন তেল ১ কাপ।

যেভাবে তৈরি করবেন

১.   মাংসের টুকরা ভালো করে ছেঁচে টক দই, মরিচ গুঁড়া, পেঁয়াজ বাটা, আদা বাটা, রসুন বাটা, জিরা গুঁড়া, গরম মসলা গুঁড়া, পেঁপে বাটা, স্বাদমতো লবণ ও অল্প তেল দিয়ে খুব ভালো করে মেখে তিন ঘণ্টা রাখুন। যত বেশি সময় রাখা হবে, তত ভালোমতো মসলা মাংসের ভেতরে ঢুকবে।

৩.  এবার একটি প্যানে তেল গরম করে মাংসের টুকরাগুলো হালকা আঁচে ভাজুন।

৪.   মাংস ভাজা হয়ে এলে রুটি, লুচি অথবা পরোটার সঙ্গে পরিবেশন করুন।

 

আবুলের তিল্লি কাবাব

‘গরিবুল্লাহ শাহ কাবাব ঘর’ বা ‘আবুলের বট’ মিরপুরের অন্যতম কাবাবের দোকান। বট, খিরি, তিল্লি আর সেই সঙ্গে গরুর শিকও হয় এখানে। তবে পরিবেশনের রীতিটা অনেকটাই ভিন্ন। মরিচ আর তেঁতুলের সসে জারানো আলু দিয়ে পরিবেশন করা হয় এই কাবাবগুলো। বট আর খিরি অনেকেরই মুখে রোচে না, তাই তিল্লি কাবাবটাই এখানকার সেরা আইটেম। মিরপুর ১১ নম্বরের বটতলা বড় মসজিদের পাশে এই দোকান ২২ বছর ধরে কাবাব বিক্রি করে আসছে। তিল্লি কাবাবের প্রতি শিক ১৫ টাকা। স্বাদ অসাধারণ। এই দোকানের কারিগর আইয়ূব আলী (যার নাম সংক্ষেপে আবুল হয়ে গেছে লোকমুখে)। তিনি হাসিমুখে দিয়ে দিলেন তিল্লি কাবাবের রেসিপি।

উপকরণ

গরু বা খাসির কলিজা বা তিল্লি ১ কেজি, পুদিনাপাতা ৫০ গ্রাম, ধনেপাতা ৫০ গ্রাম, কাঁচা মরিচ ১০টি, আদা বাটা ২ টেবিল চামচ, রসুন বাটা ২ টেবিল চামচ, ধনে গুঁড়া ১ টেবিল চামচ, জিরা গুঁড়া ২ টেবিল চামচ, গরম মসলা গুঁড়া ১ টেবিল চামচ, মরিচ গুঁড়া ২ টেবিল চামচ, সরিষার তেল ৪ টেবিল চামচ।

যেভাবে তৈরি করবেন

১.   কলিজা বা তিল্লি ছোট ছোট টুকরা করে কেটে সব উপকরণ দিয়ে মাখিয়ে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা রেখে দিন। তারপর লম্বা শিকে ভালোমতো গেঁথে নিন।

২.   বারবিকিউ চুলায় কয়লা জ্বালিয়ে শিকগুলো রাখুন। শিকগুলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সব পাশ ভালোমতো আগুনের আঁচে ঝলসে নিন।

৩.   একটি ব্রাশে সরিষার তেল লাগিয়ে মাঝে মাঝে শিকগুলো ব্রাশ করুন। পোড়া পোড়া হয়ে এলে নামিয়ে ফেলুন।

 

শওকতের গুলি কাবাব

মিরপুরের কাবাবের কথা বলতে গেলে অবধারিতভাবে চলে আসে ‘শওকতের কাবাব’-এর নাম। মিরপুর ১০ নম্বর বেনারসি পল্লীর পাশে এই কাবাবের দোকান ১৯৭২ সাল থেকে ভোজনরসিকদের কাবাব খাইয়ে আসছে। এই দোকানের অন্যতম আকর্ষণ গুলি কাবাব। তিন টাকা পিসের এই কাবাব সম্ভবত ঢাকা শহরের সবচেয়ে সস্তা কাবাব। এটার প্রস্তুত প্রণালী জানতে চাইলে কারিগর জানালেন, ‘বাসায় যখন বানাইবেন তখন মাংসটা একটু বেশি কইরা দিয়েন। ’

 

উপকরণ

মুরগির কিমা ১ কেজি, পেঁয়াজ কুচি ২ কাপ, কাঁচা মরিচ কুচি ২ টেবিল চামচ, গরম মসলা গুঁড়া ২ চা চামচ, কাবাব মসলা ১ চা চামচ, গোলমরিচ গুঁড়া ২ চা চামচ, ভিনেগার ১ টেবিল চামচ, টমেটো সস ২ টেবিল চামচ, ময়দা ৪ টেবিল চামচ, লবণ স্বাদমতো, ভাজার জন্য তেল ২ কাপ।

বেটার (গোলা) তৈরি : ময়দা  ৩ কাপ, স্বাদমতো লবণ ও পানি ১ কাপ একত্রে মিশিয়ে বেটার তাৈর করে নিন।

যেভাবে তৈরি করবেন

১.   মুরগি, পেঁয়াজ কুচি, কাঁচা মরিচ, গরম মসলা, কাবাব মসলা, গোলমরিচ, ভিনেগার, টমেটো সস, ময়দা, লবণ একসঙ্গে মাখিয়ে গোল বল তৈরি করুন।

২.   এবার  বলগুলো বেটারে  চুবিয়ে  কড়াইয়ের ডুবো তেলে মচমচে করে ভেজে পরিবেশন করুন।


মন্তব্য