kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কোরবানির মাংস

সংরক্ষণ হতো যেভাবে

যখন ফ্রিজ ছিল না, তখন কোরবানির মাংস কিভাবে সংরক্ষণ করা হতো তা জানালেন পুরান ঢাকার গৃহিণী বেগম ফাতিমা ও রাহিমা আহমেদ

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সংরক্ষণ হতো যেভাবে

কোরবানির মাংস তো আর এক দিনেই খেয়ে ফেলা সম্ভব নয়। এসবের মধ্যে একটা সাধারণ উপায় ছিল মাংস জ্বাল দেওয়া।

কোরবানির দিন থেকে মাংস শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতিদিন মাংসগুলো জ্বাল দেওয়া হতো দিনের নির্দিষ্ট সময় ধরে। বেশ সময় নিয়ে এগুলো গরম করে রাখা হতো। কখনো কখনো দুই বেলা করেও করতে হতো সেটা। ফলে শেষের দিকে কোরবানির মাংসগুলো নরম হয়ে খুলে খুলে যেত। এই মাংস একটু করে ভেজে ঢাকার লোকজন তা দিয়ে বাখরখানি খেতে ভালোবাসে।

আর মাংস আস্ত রেখে দিতে চাইলে অনুসরণ করা হতো ‘ভাজা মাংস’ পদ্ধতি। আদি ঢাকাবাসী অনেক দিন ধরেই এ পদ্ধতিতে মাংস সংরক্ষণ করে আসছে। প্রথমে কোরবানির চর্বি এক দিন ধরে খোলা বাতাসে শুকিয়ে সেই চর্বি পরে জ্বাল দিয়ে তরল করে ফেলতে হয়। সেই চর্বিতে হাড়বিহীন মাংসকে বড় বড় টুকরা করে আদা, রসুন, দারুচিনি, এলাচ, লবণ দিয়ে হালকা আঁচে সিদ্ধ করা হয়। আর সুঘ্রাণ পাওয়ার জন্য তাতে সয়াবিন তেলে হালকা করে ভাজা পেঁয়াজের কুচি দেওয়া যায়। টানা তিন দিন ধরে ভেজে নিলেই এ মাংস তিন মাস ধরেও খাওয়া যায়। অনেকেই এ মাংস মহররম পর্যন্ত রেখে দিত। অনেকে আবার বিশ্বাস করত, কোরবানির মাংস মহররমের পর আর খাওয়া উচিত নয়।

সম্ভবত ‘জাহাজি কালিয়া’র খানিকটা পরিবর্তিত রূপই হচ্ছে এই ‘ভাজা মাংস’। হাকিম হাবিবুর রহমানের স্মৃতিকথা ‘ঢাকা পঞ্চাশ বছর আগে’তে পাওয়া যায়, এক-দেড় শ বছর আগে কিভাবে ‘জাহাজি কালিয়া’ তৈরি করা হতো তার বর্ণনা। অতীতে ঢাকা থেকে হজযাত্রী বা ব্যবসায়ীরা সমুদ্রপথে আরব, ইরাক, ইরান যেতেন। তাঁরাই মূলত যাত্রাপথে খাওয়ার জন্য এভাবে মাংস সংরক্ষণ করে নিয়ে যেতেন। জাহাজে খাওয়া হতো বলে এটার নাম হয়ে যায় ‘জাহাজি কালিয়া’। চিনামাটির বিশেষ বয়ামে এই মাংস জলপাইয়ের তেলে ডুবিয়ে রাখা হতো। আর বয়াম থেকে বের করার জন্য ব্যবহার করা হতো কাঠের তৈরি শুকনো চামচ। ভেজা চামচে এই কালিয়া নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। এটা খাওয়া হতো ‘নান খোরশ’ বা নিমসুখা বা বাখরখানি রুটি দিয়ে। পুরান ঢাকার লোকজনের মাংস সংরক্ষণের আরেক পদ্ধতি হচ্ছে ‘গ্রেল’।   এটা করার জন্য গরুর পেছনের দিকের রানের মাংসের প্রয়োজন হয়। গরুর আস্ত রান খোলা বাতাসে শুকিয়ে নেওয়া হয়। তারপর রান থেকে চর্বি বাদ দিয়ে মাংস হাড়বিহীনভাবে কাটা হয়। একেকটি টুকরা দেড় থেকে দুই কেজি হয়। তারপর ধুয়ে পানি ঝরিয়ে নেওয়া হয়। সোহাগা , আদার রস, লেবুর রস, আখের গুড়, লবণ সহযোগে দু-তিন ঘণ্টা ধরে জ্বাল দিয়ে মাংসটা শুকিয়ে ফেলতে হয়। শুকনো আর খোলা জায়গায় রাখলে এই মাংসও অনেক দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। এ ছাড়া কোপ্তা করেও কোরবানির মাংস সংরক্ষণ করার পদ্ধতি ছিল। কাঁচা মাংস শিলপাটায় পিষে তাতে মেশানো হতো গুঁড়া গরম মসলা, আদা, রসুন। পরে এই মিশ্রণসহ মাংসকে গোল আকৃতি করে গরুর চর্বিতে ডুবিয়ে জ্বাল দেওয়া হতো। এই কোপ্তা তিন মাসেরও বেশি সময় সংরক্ষণ করা হতো। কোরবানির অতিরিক্ত চর্বি বাখরখানি তৈরিতেও কাজে লাগত। লোকজন কোরবানির মাংস শুঁটকি দিয়েও সংরক্ষণ করে থাকে। হাড়বিহীন মাংস হলুদ দিয়ে সিদ্ধ করে পানি ঝরিয়ে নেওয়া হয়। সেই মাংস পাটের দড়ি কিংবা তারের মধ্যে মালার মতো গেঁথে রোদে কিংবা চুলার ওপর দিয়ে শুকানো হয়। মাংস শুকিয়ে গেলে বায়ুনিরোধক টিনের পাত্রে রেখে দেওয়া হয়।


মন্তব্য