kalerkantho


সড়ক দুর্ঘটনায় রাজিবের নিহতের ঘটনায়

এককোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে রুলের শুনানি ১৪ নভেম্বর

*তদন্ত প্রতিবেদন: স্বজন পরিবহন-বিআরটিসি, স্বজনের চালক ও শমরিতা হাসপাতালকে দায়ী *১৮ দফা সুপারিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৫ অক্টোবর, ২০১৮ ২০:২৪



এককোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে রুলের শুনানি ১৪ নভেম্বর

রাজধানীতে দুই বাসের চাপায় নিহত তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী রাজিব হাসানের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে এককোটি টাকা দিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না তা জানতে চেয়ে জারি করা রুলের ওপর আগামী ১৪ নভেম্বর শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।

রাজধানীতে বাস দুর্ঘটনা রোধে ১৮ দফা সুপারিশ সম্বলিত প্রতিবেদন দেখার পর বিচারপতি জেবি এম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের বেঞ্চ আজ সোমবার এ আদেশ দেন।

ওই দুর্ঘটনায় দায়ীকে চিহ্নিত করতে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন রবিবার আদালতে দাখিল করা হয়। আজ এ প্রতিবেদনের বিষয়ে আদেশের জন্য দিন ছিল। তবে আদালত বলেন, এটা দেখে আদেশ দিতে হবে। তাই রুলের শুনানির দিন ধার্য করা হচ্ছে। 

আজ আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু।

প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই বাসের চালকের (বিআরটিসি ও স্বজন পরিবহন) বড় গাড়ি চালানোর লাইসেন্স ছিল না। তাদের হালকা যানবাহন চালানোর লাইসেন্স ছিল। প্রতিবেদনে শমরিতা হাসপাতালকেও দায়ী করে বলা হয়েছে, তারা দ্রুত চিকিৎসা শুরু করতে পারেনি। প্রতিবেদনে একটি সড়কে একটি কম্পানির গাড়ি চালানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এতে দুই পরিবহণের মধ্যে যাত্রী ওঠানোর প্রতিযোগিতা এড়ানো যাবে। এটা হলে দুর্ঘটনা অনেক কমে আসবে।

এ বিষয়ে ব্যারিস্টার কাজল সাংবাদিকদের বলেন, ওই হাসপাতালের কিছু অবহেলা রয়েছে। এই কমিটি জরিমানার পাশাপাশি সামগ্রিক সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা আনার জন্য কিছু সাধারণ পরামর্শ দিয়েছে। রুলের চূড়ান্ত শুনানিতে এসব বিষয় আসবে।

গত ৪ এপ্রিল হাইকোর্ট এক অন্তবর্তীকালীন নির্দেশনার পাশাপাশি এককোটি টাকা কেন দিতে নির্দেশ দেওয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। একইসঙ্গে সাধারণ যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে কার্যকর করতে কেন নির্দেশনা দেওয়া হবে না এবং প্রয়োজনে ভবিষ্যতে এ ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে আইন সংশোধন বা নতুন করে বিধিমালা প্রণয়নের কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না তাও জানতে চাওয়া হয়। চার সপ্তাহের মধ্যে স্বরাষ্ট্র সচিব, সড়ক পরিবহন সচিব, পুলিশ প্রধান, ডিএমপি কমিশনারসহ আট বিবাদিকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়।

গত ৩ এপ্রিল দুই বাসের চাপে হাত কাটা পড়ে রাজিবের। এ ঘটনায় ৪ এপ্রিল রিট আবেদন করেন ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল। এদিন রুল জারি করেন আদালত। কিন্তু রাজিব ১৬ এপ্রিল দিবাগত রাতে মারা যান। রাজিবের মৃত্যুর খবর জানানোর পর আদালত গত ৮ মে এক আদেশে রাজিবের দুই ভাইকে এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেন। আপিল বিভাগ ২২ মে হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত করে দেন। একইসঙ্গে হাইকোর্টকে কমিটি করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। এরপর হাইকোর্ট ৩০ মে এক আদেশে একটি কমিটি গঠন করে দেন।

কমিটির ১৮ দফা সুপারিশ

১. বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই) বিভাগের উন্নয়নে সরকারকে জোর দিতে হবে এবং এর জন্য বাজেট বরাদ্দ করতে হবে।

২. সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিআরটিএ, পুলিশ, বুয়েটের এআরআই, নিরাপদ সড়ক চাইসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে নিয়ে একটি কারিগরি টিম গড়ে তোলা এবং তাদের জন্য পৃথক অর্থ বরাদ্দ রাখতে হবে। বড় দুর্ঘটনাগুলো অনুসন্ধানে এই টিম কাজ করবে। দুর্ঘটনা সংক্রান্ত তথ্য ধ্বংস হওয়ার আগেই তা উদ্ধার করবে। 

৩. দুর্ঘটনাপ্রবণ সড়কে সিসিটিভি বসাতে হবে। এতে শুধু দুর্ঘটনা অনুসন্ধানই নয়, বরং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় সাহায্য করবে।

৪. প্রতিটি দুর্ঘটনা নথিভুক্ত করতে হবে। এতে দুর্ঘটনার বিষয়টি নথিভুক্তকরণ এবং গবেষণায় পুলিশের সক্ষমতা বাড়বে। বুয়েটের এআরআই বিভাগের অধীনে পুলিশকে অবশ্যই দুর্ঘটনার বিষয়ে নথি সংগ্রহ, সংরক্ষণ, অনুসন্ধান এবং সময়োপযোগী ব্যবস্থাপনার ওপর প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

৫. রাজধানীর বাসগুলোর ভেতর এবং বাইরের অবস্থা করুণ, বাসগুলোর নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা সংক্রান্ত সেফটি ফিচার (সাইড লাইট, হুইপার, হেড লাইট, টায়ার, প্রবেশের দরজা এবং জানালাগুলো) খুবই নিম্নমানের। তা সত্ত্বেও বাসগুলোর ফিটনেস সার্টিফিকেট থাকাটা ভয়ঙ্কর বিষয়। তাই কোনো বাসের ফিটনেস সার্টিফিকেট দিতে হলে সেটি সুন্দর রঙ এবং সেফটি ফিচারগুলো ঠিক আছে কিনা তা দেখতে হবে। নয়ত সে বাসগুলো চলতে দেওয়া যাবে না।

৬. বিআরটিসি বাসগুলো দৈনিক ইজারা ভিত্তিতে ভাড়ায় চালিত। অন্যান্য বাসের ক্ষেত্রে এমন পদ্ধতি বন্ধ করতে হবে।  

৭. চলন্ত অবস্থায় গাড়ির দরজা বন্ধ রাখতে হবে। বাসের দরজার কাছে কোনো যাত্রীকে দাঁড়িয়ে যেতে দেওয়া যাবে না। নির্দিষ্ট বাসস্টপেজে বাস থামার ব্যবস্থা করতে হবে।

৮. বাস স্টপেজগুলো সকল রুটে নির্দিষ্টভাবে পরিচিত থাকবে। কর্তৃপক্ষ সেখানে যাত্রী ছাউনি তৈরি করবে। কোনো চলন্ত বাস ব্যস্ত সড়কে দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠা-নামা করতে পারবে না। ট্রাফিক পুলিশকে এই নিয়ম কঠিনভাবে মেনে চলতে হবে।

৯. বিআরটিএ কর্তৃক একটি ড্রাইভিং স্কুল থাকা বাধ্যতামূলক করতে হবে। যেখানে ড্রাইভিং লাইসেন্স চাইতে হবে। এই স্কুলের সার্টিফিকেট ছাড়া কাউকেই ড্রাইভিং লাইসেন্স টেষ্ট করার জন্য আনা হবে না।

১০. চালকের দায়-দায়িত্ব, নিয়ম-কানুন বিভিন্ন থিওরি টেস্টের মাধ্যমে শেখাতে হবে।

১১. চালকদের থিওরি টেস্ট হবে এআরআই দ্বারা। বিআরটিএ প্রাকটিক্যাল টেস্টের ব্যবস্থা করবে।

১২. হাসপাতালগুলোতে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে কোনো রকম দেরি না করেই চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে। এসব রোগীদের ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত চিকিৎসা এবং আর্থিক দিকগুলো বিবেচনায় সরকারের পক্ষ থেকে ট্রমা ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি তৈরি করতে হবে।

১৩. ট্রিপ প্রতি বা দৈনিক ভিত্তিতে চালক নিয়োগ পদ্ধতি দ্রুত বাতিল করতে হবে।

১৪. মাসিক বেতন ভিত্তিতে চালক নিয়োগ দিতে হবে।

১৫. দুর্ঘটনা পুনরাবৃত্তির রোধে ও বেপরোয়া যান চলাচল বন্ধে রাজধানীতে বাস রুটগুলোকে ফ্রাঞ্চাইজ ভিত্তিতে চলার পদ্ধতি চালু করতে হবে।     

১৬. বৈধ লাইসেন্সের ভিত্তিতে একটি রুটে মাত্র একটি কম্পানির বাস চলবে।

১৭. ফ্রাঞ্চাইজ পদ্ধতিটি হবে রুট বা শহর ভিত্তিক। তাই প্রতিটি রুট ভিন্ন ভিন্ন রঙিন কোডের দ্বারা আলাদা করা থাকবে।

১৮. এই পদ্ধতির ফলে যাত্রিদের আর্থিক সুবিধা হবে এবং বাস কম্পানিগুলোর চালকদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা রোধ হবে।  



মন্তব্য