kalerkantho


জিয়া চ্যারিটবেল ট্রাস্ট দুর্নীতি
রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ

খালেদাসহ অন্যদের ৭ বছর সাজা চায় দুদক

আদালত প্রতিবেদক   

৩১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:২৮



খালেদাসহ অন্যদের ৭ বছর সাজা চায় দুদক

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে মর্মে আইনের বিধানমতে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি সাত বছরের কারাদণ্ড প্রত্যাশা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

গতকাল মঙ্গলবার পুরান ঢাকার বকশী বাজারে কারা অধিদপ্তরের প্যারেড মাঠে ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতে মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে দুদকের পিপি ওই আবেদন করেন।

সংশ্লিষ্ট বিচারক ড. আখতারুজ্জামান রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষে এ মামলার আসামি জিয়াউল ইসলাম মুন্নার পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয়। আংশিক বক্তব্য উপস্থাপনের পর অবশিষ্ট শুনানি আজ পর্যন্ত মুলতবি করেন।

এর আগে বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটের দিকে বকশীবাজারের অস্থায়ী ওই আদালতে পৌঁছান বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

বেলা ১২টা ১০ মিনিটে আদালতের কার্যক্রম শুরু হয়। রাষ্ট্রপক্ষে দুদকের পিপি মোশাররফ হোসেন কাজল যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু করেন।

মোশাররফ হোসেন কাজল মঙ্গলবার দুপুরে এ মামলার প্রথম রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক তুলে ধরে বক্তব্য দেন। মামলার এজাহার পড়ে শোনানোর পরে মামলার চার্জশিটভুক্ত ৩২ জন আসামির সাক্ষ্য গ্রহণের বিষয় ও এর সারমর্ম তুলে ধরেন আদালতে।

দুদকের এই আইনজীবী বলেন, কোনো ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী পদে থাকা অবস্থায় ট্রাস্ট গঠন করতে পারেন না। কারণ তিনি ১৬ কোটি মানুষের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। আর এ কারণেই তিনি ব্যক্তিগত স্বার্থে ট্রাস্ট গঠন করতে পারেন না।
 
'এই ট্রাস্ট গঠনের সময় সোনালী ব্যাংকে যে হিসাব করা হয়েছে, সেখানে খালেদা জিয়া তাঁর প্রধানমন্ত্রী পদ গোপন করেছেন। কিন্তু তিনি ঠিকানা হিসেবে ব্যহার করেছেন তৎকালীন মঈনুল রোডের বাড়ির ঠিকানা।'

বলেন, খালেদা জিয়া ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তার নিজের ছয় নম্বর শহীদ মঈনুল রোডের বাড়ির নাম ব্যবহার করে শহীদ জিয়াউর রহমান চ্যারিটেবল ট্রাস্ট নামে গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ট্রাস্টটি রেজিস্ট্রি করেন। উক্ত দলিলে তার কোন সম্পত্তি রেজিস্ট্রি করেছেন তার উল্লেখ নেই। ট্রাস্ট সম্পর্কে অন্য কোন ব্যক্তির কিছু জানার সুযোগ ছিল না। তিনি ট্রাস্টের কাজে তার রাজনৈতিক সচিব আবুল হারিছ চৌধুরী এবং তার এপিএস জিয়াউল ইসলাম মুন্না ও অন্যদের সহযোগীতায় সোনালী ব্যাংক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় শাখায় লেনদেন করেন।

তিনি বলেন, খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর পদমর্যাদার বলে ক্ষমতা অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে সংগৃহীত এক কোটি ৩৫ লাখ টাকা তার রাজনৈতিক সচিবের সহযোগিতায় সংগ্রহ করেন। খালেদা জিয়া উক্ত টাকার বৈধ উত্সের বিষয়ে জানতে না চেয়ে বরং উহার বৈধতার প্রচেষ্টায় মেট্রোমেকার্স অ্যান্ড ডেভেলপার লিমিটেড এর নাম ব্যবহারের অপচেষ্টা করেছেন।

দুদকের এ আইনজীবী বলেন, টাকার উৎস যে অবৈধ খালেদা জিয়া তা জানতেন। কারণ খালেদা জিয়া উক্ত ট্রাস্টের প্রথম ম্যানেজিং ট্রাস্টি ছিলেন। তার অগোচরে ট্রাস্টের অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা জমা হওয়ার কথা না। খালেদা জিয়ার কার্যকলাপের কারণে বিএনপি এর দলীয় ফান্ড থেকে ছয় কোটি ১৮ লাখ ৮৯ হাজার ৫২৯ টাকা পাওয়ার পরও তিনি জেনে শুনে সাত কোটি ৭৭ লাখ টাকার চেক প্রদান করেন। অর্থাৎ দলীয় ফান্ডের অতিরিক্ত টাকা অবৈধভাবে সংগৃহীতভাবে জমা ছিল। তা খালেদা জিয়ার জানা ছিল। খালেদা জিয়া তার পদমর্যাদা ব্যবহার করে তার রাজনৈতিক সচিব ও অন্যান্যদের সহায়তায় অবৈধ টাকা সংগ্রহ ও খরচ করেন। তিনি স্পষ্ট জানতেন ওই টাকার উত্স অবৈধ। সে কারণেই মেট্রোমেকার্স অ্যান্ড ডেভেলপারের টাকা হিসেবে উক্ত অংকের টাকাকে বৈধ করার অপচেষ্টা করেছেন।

তিনি আরো বলেন, খালেদা জিয়া ট্রাস্টের নামীয় উক্ত ব্যাংক শাখার হিসেবে দুটি চেকে সাত কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং ২৭ লাখ টাকা প্রদান করেন। ব্যাংক থেকে ২টি পে-অর্ডারের মাধ্যমে জমির দাতা সুরাইয়া খানের নামীয় স্ট্যান্ডার্ড চার্টাড ব্যাংকের ২টি হিসেবে স্থানান্তর করেন এবং তা জমা করেন।

এ ছাড়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে ক্রয়কৃত জমির দলিল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দলিলটিতে মোট সম্পদের মূল্য উল্লেখ রয়েছে ছয় কোটি ৫২ লাখ ৭ হাজার টাকা। কিন্তু দলিলে উল্লেখিত টাকা ছাড়াও অপর একটি পে-অর্ডারের মাধ্যমে এক কোটি ২৪ লাখ ৯৩ হাজার টাকা জমির দলিল দাতাকে প্রদান দেখিয়ে লেনদেন করেছেন। অর্থাৎ তিনি অবৈধ উৎস থেকে প্রাপ্ত টাকা মিসেস সুরাইয়া খানকে প্রদান দেখিয়ে লেনদেন করেছেন।

মোশাররফ হোসেন কাজল আরো বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া যে উদ্দেশে ট্রাস্ট গঠন করেছেন, পরবর্তী সময়ে তা টাকা সংগ্রহের মধ্য দিয়ে তা প্রাইভেট ট্রাস্টে পরিণত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীর একান্ত সচিব ও বিআইডবি­উটিএর নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জিয়াউল ইসলাম মুন্না তাঁরাও সরকারি পদে ছিলেন। ট্রাস্টে তাঁরা সরকারি পদ ব্যবহার করতে পারেন না।'
 
তিনি আরো বলেন, খালেদা জিয়া অন্যান্য আসামিদের সহযোগিতায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অবৈধ উৎস থেকে টাস্টের হিসেবে মোট তিন কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা অবৈধভাবে সংগ্রহ করে, জমা করে এবং উত্তোলন করে পরস্পর যোগসাজসে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ ২নং আইনের ৫(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।

রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী আরো বলেন, 'খালেদা জিয়া ট্রাস্ট আইন ভঙ্গ করেছেন। এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে চারবার চিঠি দেওয়া হলেও তিনি এর কোনো উত্তর দেননি। পরে অবশ্য স্বীকার করে নিয়েছেন, ট্রাস্ট আইন অনুযায়ী জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট হয়নি। এই অভিযোগে বিধান অনুযায়ী খালেদা জিয়ার সাত বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।'

মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, ২০০৫ সালে কাকরাইলে সুরাইয়া খানমের কাছ থেকে 'শহীদ জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট'-এর নামে ৪২ কাঠা জমি কেনা হয়। কিন্তু জমির দামের চেয়ে অতিরিক্ত এক কোটি ২৪ লাখ ৯৩ হাজার টাকা জমির মালিককে দেওয়া হয়েছে বলে কাগজপত্রে দেখানো হয়, যার কোনো বৈধ উৎস ট্রাস্ট দেখাতে পারেনি। জমির মালিককে দেওয়া ওই অর্থ ছাড়াও ট্রাস্টের নামে মোট তিন কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা অবৈধ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।

২০১০ সালের ৮ আগস্ট জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়াসহ চারজনের নামে তেজগাঁও থানায় দুর্নীতির অভিযোগে এ মামলা করেন দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালক হারুন-অর রশিদ।

এ মামলায় ২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে দুদক। মামলায় খালেদা জিয়া ছাড়াও চার্জশিটে বিএনপি নেতা সচিব হারিছ চৌধুরী এবং তার তৎকালীন একান্ত সচিব জিয়াউল ইসলাম মুন্না ও ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রাক্তন মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খানকে আসামি করা হয়।

মামলাটিতে খালেদা জিয়াসহ অপর আসামিদের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ তৎকালীন বিচারক বাসুদেব রায় অভিযোগ গঠন করেন।

প্রসঙ্গত, একই আদালতে বিচারাধীন জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলাটি আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি রায়ের জন্য ধার্য রয়েছে। ওই মামলার ছয় আসামির মধ্যে খালেদা জিয়াসহ ২ জনের যাবজ্জীবন ও বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ চারজনের ৭ বছরের কারাদণ্ড দাবি করেছে দুদক।


মন্তব্য