kalerkantho


মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার

মৌলভিবাজারের দুই রাজাকারের ফাঁসি, তিনজনের আমৃত্যু কারাদণ্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০১:২৬



মৌলভিবাজারের দুই রাজাকারের ফাঁসি, তিনজনের আমৃত্যু কারাদণ্ড

প্রতীকী ছবি

মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়ে মৌলভিবাজারের রাজনগর উপজেলার দুই রাজাকারের ফাঁসি ও তিনজনকে আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায় দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। গতকাল বুধবার বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের ৩০তম মামলার রায় এটি।

এই পাঁচ রাজাকারের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা, হত্যা, অপহরণ, আটক, নির্যাতনের পাঁচটি অভিযোগ সন্ধেহাতীতভাবে প্রমানিত হওয়ায় মো. নেছার আলী (পলাতক) ও উজের আহমেদকে (কারাবন্দি) সর্ব্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুণ্ডের রায় দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। অপর তিন রাজাকার সামছুল হোসেন তরফদার ওরফে আশরাফ, ইউনুছ আহমেদ, মোবারক মিয়াকে অমৃত্যু কারাদন্ডে দন্ডিত করা হয়েছে। 

গতকাল রায় ঘোষার সময় এই পাঁচ রাজাকারের মধ্যে কারাবন্দি থাকা ইউনুছ ও উজের কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। বাকি তিনজন মামলার শুরু থেকেই পলাতক। মৌলভিবাজারের রাজনগর উপজেলার দক্ষিণখোলা গ্রামে গণহত্যার ঘটনার সঙ্গে জড়িত থকার অভিযোগ প্রমানিত হওয়ায় দুই রাজাকারকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন ট্রাইব্যুনাল।

ট্রাইব্যুনাল গতকালের রায়ে বলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই রাজাকার নেছার আলী ও উজের আহমেদকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে বা গুলি করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হবে। তবে কারাবন্দি দুই রাজাকার চাইলে ৩০দিনের মধ্যে এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে পারবে। পলাতকরা আপিল করতে চাইলে ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পন করতে হবে। পাশাপাশি পলাতকদের গ্রেপ্তারে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশ মহাপরিদর্শককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে ইন্টারপোলের সহযোগিতা নিতে বলা হয় রায়ে।

এই রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন ও রেজিয়া সুলতনা চমন। আসামিদের আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন বলেছে, গ্রেপ্তার থাকা দুই রাজাকার এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবে।

ট্রাইব্যুনালে দন্ডিত পাঁচ রাজাকারের সবাই মোটামুটি বয়স্ক। তাদেরকে দণ্ড প্রদানের বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন, বৃদ্ধ বয়স দণ্ড কমানোর ক্ষেত্রে কোনো কারণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। 

রায় ঘোষণার পর আদালতের পর্যবেক্ষণ সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন ট্রাইব্যুনালের অন্যতম প্রসিকিউটর ড. তুরিন আফরোজ। তিনি বলেন, ‘আজ (বুধবার) মামলার রায় ঘোষণার সময় আদালত দুটি পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। আদালত বলেছেন, ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধীদের বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একাত্তরের ইতিহাস জনসমক্ষে স্পষ্ট হয়ে উঠে আসে। দ্বিতীয়ত দুটি ট্রাইব্যুনালে যখন মানবতাবিরোধীদের বিচার চলতো তখন আসামিদের বয়স বিবেচনা নিয়ে কিছু মতভেদ ছিল। তবে মানবতাবিরোধীদের অপরাধ এতটাই ঘৃণ্য যে বিচারের ক্ষেত্রে আসামির বৃদ্ধ বয়স দণ্ড কমানোর কারণ হতে পারে না।’

এই পাঁচ রাজাকারের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগুলোর মধ্যে এক নম্বর অভিযোগে পাঁচজনকেই আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। দুই নম্বর অভিযোগে নেসার, ইউনুস ও উজেরকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তিন নম্বর অভিযোগে উজের ও নেছারকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও ইউনুসকে খালাস দেওয়া হয়েছে। চার নম্বর অভিযোগে পাঁচজনকেই আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাঁচ নম্বর অভিযোগে উজের ও নেছারকে মৃত্যুদণ্ড এবং বাকি তিনজনকে আমৃত্যু কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। 

এই অভিযোগে মৌলভিবাজার জেলার রাজনগর উপজেলায় সুশীতল ধরদের বাড়িতে ধর পরিবারের লোকজনসহ হিন্দু সমপ্রদায়ের ১৪ জনকে হত্যার মাধ্যমে হিন্দু সমপ্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করার অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে উঠে আসে।

গত বছরের ২০ নভেম্বর উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন ট্রাইব্যুনাল। এর আগে ২০১৬ সালের ৮ ডিসেম্বর এই মামলার বিচার শুরুর নির্দেশ দেওয়া হয়। গত বছরের ১৫ জানুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়।

২০১৬ সালের ২৬ মে এই পাঁচ রাজাকারের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা, হত্যা, অপহরণ, আটক, নির্যাতন, লুটপাট এবং আটকে রেখে নির্যাতনের ৫টি অভিযোগ সম্বলিত আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) ট্রাইব্যুনালে দাখিল করে প্রসিকিউশন। ২০১৪ সালের ১২ অক্টোবর এই পাঁচ আসামিদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে মোট ২৭৯ পৃষ্টার প্রতিবেদন প্রসিকিউশনের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, আসামিদের মধ্যে শামসুল হোসেন তরফদার একাত্তরে আল-বদর বাহিনীর এবং নেছার আলী রাজাকার বাহিনীর স্থানীয় কমান্ডার ছিলেন। অন্যরা এই দুইজনের সহযোগী হিসেবে কাজ করে।

২০১৫ সালের ১৩ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল এই পাঁচ রাজাকারের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। ওইদিনই রাজনগর থানার গয়াসপুর গ্রামের উজের আহমেদ চৌধুরী ও সোনাটিকি গ্রামের মৌলভি ইউনুছ আহমদকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ১৪ অক্টোবর ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হলে তাদেরকে কারাগারে পাঠনোর নির্দেশ দেওয়া হয়।

 



মন্তব্য