kalerkantho

মানুষ গড়ার কারিগর জাকারিয়া মহিউদ্দিন

আসাদুজ্জামান দারা, ফেনী   

৩০ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মানুষ গড়ার কারিগর জাকারিয়া মহিউদ্দিন

সেই সময় স্কুলগুলোতে বিজ্ঞানের শিক্ষক তেমন একটা ছিল না। তিনি ভাবলেন, নিজে বিজ্ঞানে পড়াশোনা করেছেন। এখন যদি বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন তাহলে উপকৃত হবে এ অনগ্রসর এলাকার ছাত্ররা। তাদের মাঝে বিজ্ঞানমনষ্কতা তৈরি হবে। আবার আত্মীয়স্বজন আর গ্রামের গুরুজনরাও এ বিষয়ে উৎসাহ দিলেন। তাই চলে এলেন শিক্ষকতা পেশায়। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষকতার পর গত ৫ বছর ধরে অবসরে আছেন আদর্শ শিক্ষক জাকারিয়া মহিউদ্দিন। সোনাগাজীর বগাদানা ইউনিয়নের বিষ্ণুপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন তিনি।

ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলার বগাদানা ইউনিয়নের নদনা গ্রামে জন্ম এই গুণী শিক্ষকের। বাবা মরহুম নুরুল হক, মা মরহুমা আঙ্কুরের নেছা মৃত্যুবরণ করেন কয়েক বছর আগে। বাবা একসময় কুটিরহাট বাজারে ব্যবসা করতেন। দুই ভাই, দুই বোনের মধ্যে সবার বড় তিনি। ছোট ভাই জাকারিয়া মেজবাহউদ্দিন ফেনী-সোনাগাজী সড়কের ডাকবাংলো এলাকায় ব্যবসা করেন। বোন আনোয়ারা বেগম ও হোসনে আরা বেগম স্বামী-সন্তানদের নিয়ে ভালোই আছেন। এঁদের মধ্যে আনোয়ারার স্বামী মো. গিয়াস উদ্দিন রাজধানীতে হাউস বিল্ডিং ফিন্যান্স কর্পোরশেনের প্রিন্সিপাল অফিসার ছিলেন। ছোট বোন হোসনে আরা বেগমের স্বামী বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা সালামত উল্যাহ সোনাগাজীর মঙ্গলকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রথান শিক্ষক ছিলেন।

‘আমরা শিক্ষকরা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেখতাম, ছাত্ররা পড়ছে কিনা। সবসময় অভিভাবকদের বোঝাতাম তারা যেন তাদের সন্তানদের প্রতি খেয়াল রাখে। স্কুলের শিক্ষার্থীরা যাতে ভালো ফল করে, সেদিকেই আমাদের খেয়াল থাকত বেশি। অনেক সময় ক্লাস শুরুর আগে ছাত্রদের জন্য বিশেষ কোচিং এর ব্যবস্থা করা হত।’

শিক্ষক জাকারিয়া মহিউদ্দিন ১৯৬২ সালে প্রাথমিকের পাঠ চুকান সোনাগাজীর পাইকপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। একই এলাকার মঙ্গলকান্দি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন ১৯৬৭তে। কুমিল্লা সরকারি ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে আইএসসি ও বিএসসি করার পর ১৯৭৯/৮০ সেশনে ফেনী সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড করেন। ১৯৭৩ সালের ১১ মে থেকে তিনি বিষ্ণুপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। ৪০ বছর ৪ মাস পর তিনি ২০১৩ সালের ২৯ জানুয়ারি অবসরে যান। এর আগে ৫ বছর তিনি প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০০ ও ২০০৪ সালে স্কুলটি দুইবার উপজেলার শ্রেষ্ঠ স্কুল হিসেবে পুরস্কার পায়। ২০০৪ সালে তিনি উপজেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে পুরস্কার লাভ করেন। তিনি ৯ বছর কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের টেবুলেটর (ছক বিন্যাসক) ছিলেন।

গুণী শিক্ষক জাকারিয়া মহিউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওই সময় এলাকার স্কুলগুলোতে বিজ্ঞানের শিক্ষক তেমন ছিল না। ভাবলাম-বিজ্ঞান নিয়ে যেহেতু পড়েছি। এ বিষয়ে শিক্ষকতা শুরু করলে কেমন হয়। আবার এলাকার গুরুজন ও আত্মীয়রাও সায় দিলেন। ব্যস্, চলে এলাম শিক্ষকতায়। এক স্কুলেই কাটিয়ে দিলাম চার দশকেরও বেশি সময়।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা শিক্ষকরা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেখতাম, ছাত্ররা পড়ছে কিনা। সবসময় অভিভাবকদের বোঝাতাম তারা যেন তাদের সন্তানদের প্রতি খেয়াল রাখে। স্কুলের শিক্ষার্থীরা যাতে ভালো ফল করে, সেদিকেই আমাদের খেয়াল থাকত বেশি। অনেক সময় ক্লাস শুরুর আগে ছাত্রদের জন্য বিশেষ কোচিং এর ব্যবস্থা করা হত।’

ওই সময় এলাকার স্কুলগুলোতে বিজ্ঞানের শিক্ষক তেমন ছিল না। ভাবলাম, বিজ্ঞান নিয়ে যেহেতু পড়েছি। এ বিষয়ে শিক্ষকতা শুরু করলে কেমন হয়! এলাকার গুরুজন ও আত্মীয়রাও সায় দিলেন। ব্যস্, চলে এলাম শিক্ষকতায়। এক স্কুলেই কাটিয়ে দিলাম চার দশকেরও বেশি সময়।

চার দশকের সুদীর্ঘ শিক্ষাজীবনে জাকারিয়া মহিউদ্দিনের ছাত্রদের অনেকে আজ দেশের নানা স্থানে প্রতিষ্ঠিত। এঁদের মধ্যে রয়েছেন সিনিয়র ডেপুটি কন্ট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (ঢাকা) মো. ইকবাল হোসেন, কালের কণ্ঠের উপ সম্পাদক টিটু দত্তগুপ্ত, সরকারি তিতুমীর কলেজের অধ্যক্ষ আবুল হোসেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্যানলে মেয়র ফরিদ উদ্দিন রতন, রেসালাহ গ্রুপের পরিচালক ও বিএইচ বিডি ব্রাদার্স লিমিটেডের সহকারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. নিজাম উদ্দিন, বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েট এর প্রভাষক আমীরুল ইসলাম সায়মন, ব্রিজকেমি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সাবেক ছাত্রনেতা নাজমুল করিম দুলাল, বিশিষ্ট শিল্পপতি মোহাম্মদ আলী খান, ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজের প্রভাষক ডা. মো. ইকবাল হোসেন সিরাজী, ফেনী সদর হাসপাতালের সাবেক চিকিৎসক, বর্তমানে চমেক হাসপাতালে এমএস ইএনটি দ্বিতীয় পর্বে অধ্যয়নরত ডা. মোশাররফ হোসেন ও অগ্রণী ব্যাংক ফেনী আঞ্চলিক অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার বাহার এ আলমের নাম জানালেন তিনি। এমন আরো বহু ছাত্র থাকলেও এতো স্বল্প পরিসরে সবার নাম বলা সম্ভব নয়। জাকারিয়া মহিউদ্দিন বলেন, ‘পুরনো ছাত্রদের সঙ্গে দেখা হলে তারা যে সম্মান দেখাই তাতে আমি অত্যন্ত গর্ব অনুভব করি।’

বর্তমানে ফেনী শহরের ফলেশ্বর এলাকায় বাড়ি করে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন তিনি। ছেলে মহিবুল হাসান মঞ্জু বিএসএস অনার্স এমএসএস করে ফেনী সদর হাসপাতাল এলাকায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন। পিতা জাকারিয়াও তাকে সহায়তা করেন।

দুই মেয়ে শামীমা নাসরিন মীনা ও নাসিমা আক্তার উর্মি স্বামী-সংসার নিয়ে ভালোই আছেন।

মন্তব্য