kalerkantho

চট্টগ্রামে ‘শিক্ষাস্বর্গ’

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

৩০ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চট্টগ্রামে ‘শিক্ষাস্বর্গ’

শহরের গিঞ্জি পরিবেশ। ভাঙা কিংবা আধভাঙা সড়ক। চারদিকে ধুলোর রাজ্যে নিঃশ্বাস নেওয়া দায়।-এটা চান্দগাঁও এলাকার চিরচেনা পরিবেশের একটি অংশমাত্র। কিন্তু সেই গিঞ্জি পরিবেশের চান্দগাঁও থানার পাঠানিয়াগোদা এলাকায় একখণ্ড ‘শিক্ষাস্বর্গ’ গড়ে তোলা হয়েছে অনেকটা নিভৃতে। দৃষ্টিনন্দন এমন একটি ‘শিক্ষাস্বর্গ’ যে বন্দরনগরেতে গড়ে তোলা হয়েছে সেটা অনেকের অজানা।

আকস্মিকভাবে নগরের কোনো নাগরিককে যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে নিয়ে হাজির করা হয়, তাহলে নিশ্চিতভাবে তিনি বলবেন এটা বাংলাদেশের বাইরের কোনো উন্নত দেশের আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান! কিন্তু, সাইনবোর্ডের লেখা পড়ার পর তিনি নিশ্চিতভাবে গোলক ধাঁধায় পড়বেন। আর নিজের অজান্তেই মন্তব্য করতে পারেন, ‘এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও কি চট্টগ্রামে গড়ে তোলা হয়েছে!’

চোখ ধাঁধানো পরিবেশে তৈরি হওয়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির নাম হাজেরা-তজু স্কুল অ্যান্ড কলেজ। সেখানে একটি কিন্ডারগার্টেনও আছে। নাম চিটাগাং কিন্ডারগার্টেন।

স্কুল ক্যাম্পাসের প্রবেশ পথেই দৃষ্টিনন্দন গেট। সেখানে বসে আছেন প্রহরী। কিছুটা ভেতরে যেতেই চোখে পড়ে চারদিকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। শিক্ষাঙ্গনের বাইরে দেখা গিঞ্জি পরিবেশ মুহূর্তেই বদলে গিয়ে চোখের সামনে হাজির এক চোখ ধাঁধানো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সামনের মাঠজুড়ে বাহারি ফুলের বাগান। খোলা মাঠে দৌঁড়াদৌঁড়ি করছে কচিকাঁচা শিক্ষার্থীরা। কেউ বা দোলনায় চড়ে মজা করছে। কেউ বা শিশুপার্কের আদলে গড়ে তোলা নানা রাইডে চড়ছে। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয় ভেবে কেউ কেউ ভুল করে শিশুপার্কও ভাবতে পারেন।

মাঠ থেকে শিক্ষাঙ্গনের দিকে দৃষ্টি দিলেই দেখা যায় একটি চার তলা ভবন। নিচ তলায় কিন্ডারগার্টেন। শ্রেণিকক্ষগুলোতে প্রবেশ করে যে কোনো অভিভাবক কল্পনারাজ্যে হারিয়ে যেতে বাধ্য। ভাবতে পারেন, এমন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই তো পড়তে চেয়েছিলাম ছোটবেলায়। কিন্তু জীবনে সে সুযোগ আসেনি কখনোই। কিন্তু এই শিক্ষায়তনে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের পড়ানোর সুযোগ পাবেন।

নগরের চান্দগাঁও থানার পাঠানিয়াগোদা এলাকায় চোখ ধাঁধানো পরিবেশে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির নাম ‘হাজেরা-তজু স্কুল অ্যান্ড কলেজ’। সঙ্গে আছে একটি কিন্ডারগার্টেনও। নাম ‘চিটাগাং কিন্ডারগার্টেন’।

কেমন সেই শ্রেণিকক্ষ? শিক্ষার্থীদের বয়স বিবেচনায় নিয়ে শ্রেণিকক্ষগুলো সাজিয়ে তোলা হয়েছে। কোনোটিতে কার্টুনের নানা চরিত্র অঙ্কন করা হয়েছে। বসার চেয়ার-টেবিলগুলোও দৃষ্টিনন্দন ডিজাইনে তৈরি করা। শ্রেণিকক্ষগুলোর নামকরণও করা হয়েছে ‘হাসনাহেনা’, ‘ডালিয়া’, ‘টিউলিপ’সহ নানা ফুলের নামে। এভাবে ৩৬টি শ্রেণিকক্ষের নামকরণ করা হয়েছে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চার তলায় গড়ে তোলা হয়েছে সিনে কমপ্লেক্সের আদলে থিয়েটার। সেখানে শিক্ষামূলক ছবি দেখানো হয় শিক্ষার্থীদের। একই সঙ্গে ব্যবহারিক শিক্ষামূলক নানা ধরনের ভিডিওচিত্র প্রদর্শনী করা হয় এখানে।

আবার শিক্ষার্থীদের নাচ-গান, সুন্দর হাতের লেখা কিংবা বিতর্ক শেখার সব আয়োজনই আছে। পাশাপাশি লাইব্রেরি ও কম্পিউটার ল্যাব সাজানো হয়েছে দৃষ্টিনন্দনভাবে।

প্রতিষ্ঠানের এমন আয়োজন সম্পর্কে স্কুল শাখার অধ্যক্ষ সজল কুমার দত্ত ও কিন্ডারগার্টেন শাখার অধ্যক্ষ ফাতেমা ইয়াছমিন জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীরা যাতে মনের আনন্দে লেখাপড়া করতে পারে সেই জন্যই বর্ণিলভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি সাজিয়ে তোলা হয়েছে। শিশুরা খেলতে খেলতেই শিখতে পারে।

এখানে শিক্ষার্থীদের ‘চাপ’ দিয়ে কিছুই শেখানো হয় না, খেলাধুলা ও ছবি দেখা কিংবা আঁকাবুকির ফাঁকে ফাঁকেই শিক্ষার্থীরা পাঠ শেষ করে।

চট্টগ্রাম নগরে এমন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কীভাবে গড়ে তোলা হলো? যেখানে নগরের কিন্ডারগার্টেন বা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বলতেই ভাড়া করা বাড়িতে ছোট ছোট কক্ষের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেই বোঝেন নগরবাসী। সেখানে এমন ধারণা কোথায় পাওয়া গেল?-জবাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা শিল্পপতি মুজিবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কয়েক বছর আগে আমার সন্তানকে ভর্তি করতে অস্ট্রেলিয়া গিয়েছিলাম। সেখানে নিউ সাউথওয়েলস ইউনিভার্সিটি দেখে আমি মুগ্ধ হই। তখনই ভাবি, চট্টগ্রামে যদি এমন দৃষ্টিনন্দন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যায়, তাহলে সেটি হবে চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এবং আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এরপর প্রায় তিন বছর ধরে প্রচেষ্টা চালিয়ে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হয়েছে।’

হাঁটতে হাঁটতে তিনি গিয়ে দাঁড়ান প্রতিষ্ঠানের চতুর্থ তলায়। সেখানে জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশাল প্রতিকৃতি রয়েছে। বিভিন্ন জাতীয় দিবসে শিক্ষার্থীরা এখানে শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ পান। কোনো বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের দৃষ্টিনন্দন প্রতিকৃতি গড়ে তোলা সত্যিই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। তিনি বলেন, পুরো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম, সিসি ক্যামেরা রয়েছে। সব শ্রেণিকক্ষ মাল্টিমিডিয়ার আওতায় আছে। কম্পিউটার ল্যাবে ৩০টি কম্পিউটার এবং লাইব্রেরিতে রয়েছে প্রায় দুই হাজার বই। আর মাঠে লাগানো হয়েছে অস্ট্রেলিয়া থেকে আনা নানাজাতের গাছ ও ঘাস।

চট্টগ্রামে শিক্ষা প্রসারে ব্যাপক অবদান রয়েছে সাবেকমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসির। তিনি ২৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেছেন। তাঁরই সন্তান সানোয়ারা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শিল্পপতি মুজিবুর রহমান শিক্ষা প্রসারের নেশা পেয়েছেন যোগ্য বাবার কাছ থেকে। তাই তিনি এবার অস্ট্রেলিয়া থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ধারণা নিয়ে এসে চট্টগ্রামের ব্যতিক্রমী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি স্থাপন করলেন। এটি অলাভজনক এবং ভর্তুকি দিয়ে পরিচালনা করা হচ্ছে।

মুজিবুর রহমান জানান, ১২ বিঘা জায়গা নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলা হয়েছে। এই জমির মূল্য প্রায় শত কোটি টাকা। আর চারতলা ভবনের ফ্লোর স্পেস রাখা হয়েছে প্রায় ৪৯ হাজার বর্গফুট। বর্তমানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় এক হাজার ২০০ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে।

মন্তব্য