kalerkantho

নারী নাবিকদের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল বিএসসি

৩০ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নারী নাবিকদের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল বিএসসি

দেশের নারী নাবিকদের জন্য নতুন পৃথিবী খুলে দিল বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) বহরে যুক্ত হওয়া নতুন জাহাজ। এখন বাংলাদেশের নারীরা সমুদ্র জয় করছেন পুরুষদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। দেশের ব্লু ইকনোমিতে নতুন মাত্রা যোগ করবেন অদম্য এসব নারী নাবিক। দেশে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার একটি বড় অংশ যোগ করেন নাবিকরা। এখন থেকে যোগ হবে নারী নাবিকদের আয়ও। বিস্তারিত জানাচ্ছেন : শিমুল নজরুল, চট্টগ্রাম

বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’, ‘এমভি বাংলার অর্জন’, ‘এমটি বাংলার অগ্রযাত্রা’ নামের তিনটি জাহাজে সম্প্রতি যোগদান করেছেন ১৭ জন নারী নাবিক। এঁদের মধ্যে ৪ জন অফিসার এবং ১৩ জন ডেক ও ইঞ্জিন ক্যাডেট। আরো ৬ জন নারী নাবিক প্রস্তুত রয়েছেন বহরে যুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় থাকা ‘এমটি বাংলার অগ্রদূত’ জাহাজের জন্য। দীর্ঘ ৩২ বছর পর বিএসসির বহরে যুক্ত হল নতুন জাহাজ। এখন উত্তাল সাগর, মহাসাগর পাড়ি দিয়ে বিশ্বের বড় বড় বন্দর অভিমুখে ছুটছে লাল-সবুজের পতাকাবাহী এসব জাহাজ।

নারী নাবিকদের কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে বিএসসির পরিচালক (টেকনিক্যাল) মোহাম্মদ ইউসুফ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশে অনেক শিপিং কম্পানি থাকার পরও এদেশের নারী নাবিকরা এতদিন চাকরি পাননি। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনই একমাত্র প্রতিষ্ঠান এসব সম্ভাবনাময় নারী নাবিকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে।’

ভালোভাবে কাজ করছেন আমাদের নারী অফিসার ও ক্যাডেটরা। তাঁরা ছেলেদের চেয়ে কোনো অংশে কম নন। সুযোগ পেলে তাঁরা আরো ভালো করবেন।

ক্যাপ্টেন মো. জাকির হোসেন

এমভি বাংলার জয়যাত্রা

জানা গেছে, দেশে ২০টি শিপিং কম্পানির প্রায় ৩৫টি (মার্চেন্ট) সমুদ্রগামী জাহাজ রয়েছে। সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি শিপিং কম্পানিগুলোকে নারী নাবিকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য আদেশ দিলেও তা কার্যকর করেনি প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করে দেশের শীর্ষ জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপ ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশি মেরিন একাডেমি থেকে পাস করা ৫ জন নারী নাবিকের কর্মসংস্থান করেছে ওয়েস্টার্ন মেরিন। এঁদের মধ্যে অনেকে চাকরি ছেড়ে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের নতুন জাহাজে যোগ দিয়েছেন। এদিকে বিএসসির নতুন জাহাজ এমভি বাংলার জয়যাত্রা এখন অবস্থান করছে আইভরিকোস্টের আবিদজান বন্দরে। এই জাহাজে কর্মরত আছেন ৬ জন নারী নাবিক। সেখান থেকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে কালের কণ্ঠের কাছে অনুভূতি ব্যক্ত করেন সমুদ্র জয়ী নারীরা।

সাগর-মহাসাগর জয়ের অনুভূতি ভাষায় বর্ণনা করা যাবে না। পুরুষদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করছি আমরা। সরকার দেশের নারী নাবিকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে নতুন দিগন্ত তৈরি করে দিয়েছে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নারী নাবিকদের পক্ষ থেকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

খাদিজাতুল কোবরা

মেরিন অফিসার

একই জাহাজে কর্মরত নারী নাবিক ফারজানা আক্তার ফাইজা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভালো লাগার পাশাপাশি ভয়ও কাজ করছে। আমাদের ওপর আর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারব কিনা? মেরিন একাডেমির প্রতিষ্ঠার পর থেকে পুরুষরাই নাবিক পেশায় যোগ দিয়েছেন।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি মেরিন একাডেমির ৪৮তম ব্যাচ এবং নারীদের প্রথম ব্যাচের ক্যাডেট। এখন আমরা (নারীরা) এই চ্যালেঞ্জিং পেশায় এসেছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছেন।’

জাহাজের ডেক ক্যাডেট সোহানা পারভিন বলেন, ‘পেশাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে চাই।’

একই জাহাজে কর্মরত অপর নারী নাবিক আনজুমান আরা বলেন, ‘পেশায় নারী-পুরুষ বলে কিছু নেই। আমরা পুরুষদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছি। কোনো অংশে পিছিয়ে নেই।’ মার্চেন্ট শিপে নারী নাবিকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে দেওয়ায় সরকারকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

এদিকে, এমভি ‘বাংলার অর্জন’ জাহাজে চীনের সাংহাই থেকে উঠেছেন থার্ড অফিসার বিউটি আক্তার, ফোর্থ ইঞ্জিনিয়ার লাভলী দাস, ক্যাডেট মৌটুসি তালুকদার বৃষ্টি, ইসরাত জাহাজ সেতু, তাসনিমুল বাহার ও সাজিয়া আফরিন।

‘এমটি বাংলার অগ্রযাত্রা’য় নিয়োগ পেয়ে বর্তমানে চীনে অবস্থান করছেন ফোর্থ অফিসার ফারজানা আক্তার ফাইজা, ফোর্থ ইঞ্জিনিয়ার খাদিজা আক্তার, ক্যাডেট কানিজ ফাতেমা, মেমি আফরোজা রুমা, নাফিসা আহমেদ নোভা ও ফারজানা ইয়াসমিন।

‘এমটি বাংলার অগ্রদূত’ জাহাজটি ফেব্রুয়ারিতে বিএসসির বহরে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। এ জাহাজে নিয়োগের জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছে ক্যাডেট সানজিদা করিম মুমুু, বিলকিস আক্তার, আয়েশা সিদ্দিকা এলিনুর, সাবিনা ইয়াসমিন, সুস্মিতা দাস ও রিক্তা আজিজ। অনুভূতি জানতে চাইলে সানজিদা করিম মুমু বলেন, ‘মেরিন একাডেমির ৪৯তম ব্যাচে (২০১৪) ছিলাম। সেটি নারী ক্যাডেটদের দ্বিতীয় ব্যাচ। বিএসসির জাহাজে আমাদের এক বছরের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের সুযোগ দিলেও এতদিন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজ করার সুযোগ মেলেনি।’

‘পরিবারের সদস্য, অভিভাবক ও স্বজনরা প্রেরণা দিয়েছেন, আমাদের শিক্ষকরা সাহস দিয়েছেন। আমরা ধৈর্য ধরেছি। যোগ্যতা প্রমাণের অপেক্ষায় থেকেছি।

এখন নতুন জাহাজগুলো বিএসসির বহরে যুক্ত হওয়ায় আমাদের স্বপ্নযাত্রা শুরু হচ্ছে। জানি কাজটা চ্যালেঞ্জের। কিন্তু ইতোমধ্যে যারা জাহাজে অবস্থান করছেন তারা কাজের পরিবেশের সঙ্গে চমৎকার মানিয়ে নিয়েছেন।’ যোগ করেন সানজিদা করিম মুমু।

মন্তব্য