kalerkantho


নারীদের সেলাই ও বিউটিশিয়ান প্রশিক্ষণে নানা অভিযোগ

মো. জয়নাল আবেদীন, কাউখালী (রাঙামাটি)   

১৪ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



নারীদের সেলাই ও বিউটিশিয়ান প্রশিক্ষণে নানা অভিযোগ

কাউখালী উপজেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের আওতায় ৫ বছরের প্রকল্পের ৩ মাস মেয়াদি সেলাই ও বিউটিশিয়ান প্রশিক্ষণ চলছে নামমাত্র। দৈনিক ছয় ঘন্টার প্রশিক্ষণ চলে তিন ঘন্টা। অপরিছন্ন ছোট দুটি কক্ষের একটিতে সেলাই ও অন্যটিতে বিউটিশিয়ানের এ কার্যক্রম। দুটি ব্যাচে ৪০ জন শিক্ষার্থীকে দেওয়া হচ্ছে এ প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণ শেষে প্রশিক্ষণ ভাতাও কেটে রাখছে বলে অভিযোগ উঠেছে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। দৈনিক ১০০ টাকা হারে তিন মাসে ৬০০০ টাকা পাওয়ার কথা শিক্ষার্থীরা। কিন্তু অনুপস্থিত দেখিয়ে কেটে রাখা হচ্ছে ৭০০ থেকে ২৩০০ টাকা পর্যন্ত। প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ২০০০ টাকা করে।

৮ নভেম্বর সরেজমিন দেখা গেছে, কাউখালী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বাংলোর নিচতলার দুটি রুমের একটিতে সেলাই ও অন্যটিতে বিউটিশিয়ান প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করে একটি প্রকল্পের আওতায় মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর। সেলাই প্রশিক্ষণ রুমের এক কোণে একটি টেবিলে কাপড় কাটছেন প্রশিক্ষক কিছু শিক্ষার্থী তা দেখছেন। অন্য কোনে একটি সেলাই মেশিনে কাজ করছেন একজন। অন্য সেলাই মেশিনটি বসানো হয়েছে রান্না ঘরে। সেখানে কাজ করছেন একজন। অন্যরা গাদাগাদি করে চেয়ারে বসে আছেন। রুমে নেই পর্যাপ্ত আলো। একটি মাত্র ২৬ ওয়ার্ডের এনার্জি লাইটে চলছে পুরো রুম। সেলাই মেশিন দুটি বসানো হয়েছে জানালার পাশে। এসব দেখলে যে কেউ প্রশ্ন তুলবে আসলে এখানে কিছু শিখতে পারছে কি শিক্ষার্থীরা?

বিউটিশিয়ান প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে পাশাপশি রুমে। সারিবদ্ধ ভাবে বসে আছেন শিক্ষার্থীরা। একজনকে চুল বাঁধা দেখাচ্ছেন প্রশিক্ষক। মৃদু আলোর বিউটিশিয়ান রুমে নেই কোনো আয়না। আছে শুধু দুটি কাঁচি, দুটি চিরুণি, একটি ট্যালকম পাউডার ও একটি পানির স্প্রে। এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ বিউটিশিয়ান প্রশিক্ষণ। এর বেশি কিছু শিখতে চাইলে শিক্ষার্থীদেরই আনতে হবে কসমেটিক সামগ্রী।

৩য় ব্যাচের শিক্ষার্থী (বর্তমান ব্যাচ) উসাইচিং মারমা (ছদ্মনাম) বলেন, ‘দুটি সেলাই মেশিনে ২০ জন শিক্ষার্থী কি শিখতে পারবে সেটা আপনিই বলুন। যাদের একটু বেশি আগ্রহ আছে তারা আগে ভাবে মেশিনে বসে পড়ে। অন্যরা বসে থাকে, গল্প করে আর কি করবে।’

শীলা আক্তার (ছদ্মনাম) বলেন, ‘প্রশিক্ষণ রুম ছাড়া অন্য সব রুম অপরিছন্ন, এমন অপরিষ্কার ওয়াশরুম প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দেবে এমন কোনো উপায়ও নেই। চুলকাটা, চুল বাঁধা, ব্রু ফ্লাক শিখি এই আরকি। অন্য আরেক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন বললে অনেক কথাই বলা যায় কিন্তু বললে সমস্যা হতে পারে তাই কেউ কিছু বলে না।’ 

অভিযোগ রয়েছে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ ভাতা কেটে রাখার। ২য় ব্যাচের শিক্ষার্থী ঊর্মি রানি দেবী জানান, তিনি ৫ দিন অনুপস্থিত ছিলেন। তাও ছুটি নিয়ে। কিন্তু তাঁর কাছ থেকে কাটা হয়েছে ২৩০০ টাকা। ‘অথচ ৬০০০ টাকা বুঝে পেয়েছি’ মর্মে তাঁকে স্বাক্ষর করতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘প্রথম ব্যাচের প্রতি শিক্ষার্থী থেকে ২০০০ টাকা করে কেটে রাখছেন অফিস কর্মকর্তারা।’

ডলি দাশ অনুপস্থিত ছিলেন একদিন কাটা হয়েছে ১৩০০ টাকা। সালমা আক্তারের কাছ থেকে কাটা হয়েছে ৯০০, নাছিমা আক্তার থেকে কাটা হয়েছে ৭০০ টাকা। শাহানাজ বেগমের কাছ থেকে কাটা হয়েছে ১১০০ টাকা। এরকম প্রায় সবার কাছ থেকেই কেটে নেওয়া হয়েছে। ছুটি নিলেও দেখানো হয়েছে অনুপস্থিত। অভিযোগ রয়েছে, উপস্থিত থাকলেও ইচ্ছাকৃতভাবে অনুপস্থিত দেখানো হয়।

অভিযোগের বিষয়ে এ প্রতিবেদক হাজিরা রেজিস্ট্রার খাতা দেখতে চাইলে প্রশিক্ষক তা দেখতে দেননি। অবশ্য অভিযোগের কয়েকদিন পর রাজনৈতিক চাপে পড়ে শাহানাজ বেগমের টাকা কর্মকর্তা ফেরত দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে কথা বলতে উপজেলা মহিলা বিষয়ক অফিসারের কার্যালয়ে বৃহস্পতিবার দুই দফা গেলেও কাউকে পাওয়া যায়নি। পরে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা ধীমান চাকমার সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি বাইরে আছি। রবিবার অফিসে আসবো।’ ভাতা কর্তনের বিষয়ে জানতে চইলে তিনি জানান, অনুপস্থিত থাকলে তাঁদের ভাতা কর্তনের নিয়ম আছে। পুরো বিষয়টা নির্ভর করে প্রশিক্ষকের ওপর। অনুপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে ভাতা কর্তন করা হয়।

ছয় ঘন্টার প্রশিক্ষণ তিন ঘন্টা কেন জনতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের সুবিধার কথা চিন্তা করে ১০টা থেকে ১টা পর্যন্ত প্রশিক্ষণ করাচ্ছি।’ কর্তনকৃত টাকা কি করা হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা করা হয়।’ হাজিরা রেজিস্ট্রার, ভাতা বিতরণের মাস্টাররোল ও জমাকৃত ট্রেজারি চালানের কপি দেখার কথা জানালে রবিবার অফিসে আসার কথা বলেন এই কর্মকর্তা। কিন্তু গত রবিবার দুই দফা অফিসে গিয়ে ওই কর্মকর্তাকে না পেয়ে অফিস সহায়ক মমিনুল এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘স্যার তো তিন উপজেলার দায়িত্বে। আজ হয়তো অন্য উপজেলায় গেছেন।’ পরে ধীমান চাকমার মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।



মন্তব্য