kalerkantho


চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

ফার্মেসি বিভাগে সবার সেরা হুমায়রা

বিপুল বড়ুয়া, চট্টগ্রাম   

১৪ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



ফার্মেসি বিভাগে সবার সেরা হুমায়রা

আধুনিক বিশ্ব অভিনব আবিষ্কারের নেশায় মত্ত। ডিজিটাল সংস্কৃতিতে টালমাটাল আজ সারা বিশ্ব। এর মৃদু ঢেউ এ বদ্বীপ অঞ্চলেও খানিকটা এসে পড়েছে। তবে তা অনেকটা নগরকেন্দ্রিক। গ্রামবাংলায় এখনও তা ততটা সক্রিয় ও দৃশ্যমান নয়। আকাশ-সংস্কৃতির জানালা অবারিত হলেও অন্তর্জালের আলো জাঁকিয়ে টিকরে পড়েনি। আসি আসি করছে। এই যখন অবস্থা, স্বপ্ন মুঠোয় ধরে ইশকুল-বাড়ি করছে লাখো শিশুদের মতো ছোট্ট এক গ্রামীণ শিশু। সবুজঢাকা পাখি ডাকা নিভৃত ছোট্ট গ্রাম- চন্দনাইশের বরকল।

পুঁথিগতবিদ্যা বগলদাবা করে গ্রামের আলো বাতাস গায় মেখে প্রকৃতিপাঠ করতে করতে এখানেই তার বেড়ে ওঠা। দিন যায় রাত আসে। রাত যায় নিয়মের দিনও আসে। দুচোখে ভর করে স্বপ্ন আর স্বপ্ন। এলোমেলো, আবছা। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখার মতো কখনো তা আবার মিলিয়েও যায়। থির করতে পারে না কোন স্বপ্ন তার জন্য মঙ্গল। ক্লাসে ১০টা-৫টার রুটিন মেনে টেক্সট বুক বোর্ডের পুঁথিগতবিদ্যায় গৎ বাঁধা স্বপ্ন ছাড়া আর কী কিছু পাওয়া যায়? তবুও একদিন সে-স্বপ্ন নির্দিষ্ট হল-‘আমি আলোকিত মানুষ হব’- এমন স্বপ্নদ্রষ্টা মেয়েটির নাম বিবি হুমায়রা খানম। বাবা মো. জামাল উদ্দিন খান। মা নূর নাহার চৌধুরী। তাঁদের সপ্তম সন্তান হুমায়রা। ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিজ্ঞানী এ পি জে আবদুল কালাম-এর অমর একটি বাণী-‘ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখা স্বপ্ন নয়, স্বপ্ন তাকেই বলে যে-স্বপ্ন মানুষকে ঘুমাতে দেয় না।’ বিবি হুমায়রার দেখা সেই স্বপ্ন ঘুমের নয়, ঘুমাতে দেয়নি এমন স্বপ্নই তিনি দেখেছেন। সেই স্বপ্নের পিছনে ছুটতে গিয়ে তাকে বহুকাল নির্ঘুম কাটাতে হয়েছে। খেতে পারেননি তৃপ্তির ঢেকুর তুলে সুস্বাদু খাবার, অভিজাত সাজ নিয়ে যেতে পারেননি অনুষ্ঠানাদিতে। এত ত্যাগ! এত বিসর্জন! সবই ছিল তার সাফল্যের ভিত্তি। স্বপ্নপূরণের চাবিকাঠি। মূলত বইয়ের সাথে সখ্য করে, ক্লাসে মনোযোগী হয়েই কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নকে মুঠোবন্দি করেছেন। তিনি গত ৩০ সেপ্টেম্বর তাঁর স্বপ্নের অনন্য সিঁড়ি ডিঙিয়েছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগ থেকে থিসিস নিয়ে স্নাতকোত্তর ফলাফলে ৪ পয়েন্টের মধ্যে ৩.৯৪ পেয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান লাভ করেছেন। এটি ছিল জীববিজ্ঞান অনুষদের মধ্যে এ বছরের সর্বোচ্চ ফলাফল। তার থিসিস টাইটেল ‘ফাইটোকেমিক্যাল অ্যান্ড অ্যাথনোফার্মাকোলজিক্যাল ইনভেস্টিগেশন অব লিভস্, ফ্রুটস অ্যান্ড বার্কস অব অ্যাসোসিয়া রুগাটা’। তিনি ২০১৬-২০১৭ সেশনের ছাত্রী।

তিনি স্নাতক অনার্সেও (২০১১-১২ সেশন) প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান লাভ করেন। তার পয়েন্ট ছিল ৪ এর মধ্যে ৩.৯৫। একইভাবে ২০১০ সালে হাজী মুহাম্মদ মহসীন কলেজ থেকে এইচএসসি ও ২০০৮ সালে চন্দনাইশের বরকল এস জে উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি-তে জিপিএ-৫ অর্জন করেন।

এখানেই শেষ নয়। তিনি স্বপ্নপথে এখনও দুর্বারগতিতে ছুটছেন-নতুন প্রত্যয়ে নতুন স্বপ্ন মুঠোয় ধরে। কী সেই স্বপ্ন? জ্ঞানের আলো বিতরণ করা। মানে আলোর ফেরিওয়ালা হওয়া। শিক্ষকতার মহান পেশায় নিজেকে নিবেদিত করার নতুন স্বপ্নে বিভোর বিবি হুমায়রা। এজন্য তিনি একাডেমিক শিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি বর্তমানে বিভিন্ন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে পাঠদানের হাতেখড়িও নিচ্ছেন। সুযোগ পেলেই লাইব্রেরিতে সময় কাটান। তার কথা : ‘সময়খেকো ফেসবুকে ব্যস্ত না থেকে আমি পাঠাগারে ঢু মারার চেষ্টা করি। সময়কে অর্থবহ কাজে ব্যয় করি। আমার কাছে ফেসবুকের চেয়ে বইপড়া অনেক বেটার মনে হয়।’ বিবি হুমায়রা অংশগ্রহণ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলতি বছরে অনুষ্ঠিত ‘বায়োসেফটি ও বায়োডাইভারসিটি’ শীর্ষক দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলন, এশিয়ান উইম্যান ইউনিভার্সিটিতে ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত ‘নেচারেল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’ শীর্ষক চতুর্থ জাতীয় সম্মেলনে, সিভাসুতে ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত ‘প্রমোটিং ফুড সেফটি, হেলথ অ্যান্ড ব্লু ইকোনমি’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে, ‘ট্রেডিশনাল মেডিসিন অ্যান্ড ইউনিভার্সেল হেল্থ কভারেজ’ শীর্ষক চতুর্থ এওয়াইইউএনএস আন্তর্জাতিক সম্মেলন, গ্লাক্সো স্মিথক্লালাইন-এ ইনপ্লান্ট ট্রেনিং, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজে হসপিটাল ট্রেনিং, ঢাকা সাভারে প্রাকটিক্যাল এক্সপেরিয়েন্স অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড মলিউকুলার বায়োলজি ট্রেনিং, গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্রাকটিস ইন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও কর্মশালায়। তিনি চিটাগাং ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটির (সিইউডিএস) সাথেও যুক্ত আছেন। ২০১৬ সালে দ্য ডিউক অব এডিনবার্গ’স ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-এ অংশ নিয়ে ব্রোঞ্জ অ্যাওয়ার্ডও লাভ করেন।

তিনি এইড অ্যান্ড ইন্সপিরিশন টু প্রমোট সায়েন্স (এআইপিএস) ফাউন্ডেশনের কো-ফাউন্ডার (ম্যানেজার ও প্রমোটার)। বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষায় দক্ষ বিবি হুমায়রা অনায়াসে কম্পিউটারের বিভিন্ন প্রোগ্রাম অপারেট করতে পারেন।

তিনি আইসোলেসান অ্যান্ড কোয়ান্টেটিফিকেশন অব্ ডিএনএ ফ্রম অ্যা রেঞ্জ অব স্যাম্পলস, ব্লাড টিস্যু অ্যান্ড প্লান্ট সোরসেস, জেল ডকুমেনটেশন অ্যান্ড ইলেকট্রোফোরসিস (হরাইজেন্টাল অ্যান্ড ভার্টিক্যাল) অব জেনোমিক অ্যান্ড প্লাসমিড ডিএনএ; প্রাইমার ডিজাইনিং, পিসিআর অপটিমাইজেশন অ্যান্ড পিসিআর-আরএফএলপি অ্যানালাইসিস টু ডিটেক্ট এসএনপি’স ইন জিনস; মাইক্রোবিয়েল মিডিয়া প্রিপারেশন, টোটেল ব্যাকটেরিয়া কাউন্ট অ্যান্ড ক্যারেক্টারাইজেশন অব অ্যান্টিবায়োটিক রেসিসটেন ব্যাকটেরিয়া বিষয়ে রিসার্চ দক্ষতা অর্জন করেছেন।

মেধাবী শিক্ষার্থী বিবি হুমায়রা খানমের শখ বই-পুস্তক পাঠ আর সুরের মূর্ছনায় মনরাঙানো ক্লান্তিমোচন।

তার পাশাপাশি ইচ্ছের ডানা মেলে অবকাশমুহূর্তে জাগতিক সৃষ্টিতে দৃষ্টি ছড়িয়ে দেওয়া । ভ্রমণপিপাসু এ  কৃতী শিক্ষার্থীর ইচ্ছে পূরণ হোক, সর্বাদৃত হোক-কামনা করি।



মন্তব্য