kalerkantho


মাটিরাঙা উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান হাসিনা বেগম

জনপ্রতিনিধি হওয়ার পেছনের গল্প

৭ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



জনপ্রতিনিধি হওয়ার পেছনের গল্প

খাগড়াছড়ির মাটিরাঙা উপজেলার দুর্গম তবলছড়ি ইউনিয়নের অজপাড়া গাঁয়ের বাসিন্দা হাসিনা বেগম। নানা সীমাবদ্ধতায় লেখাপড়ায় মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে পারেননি। তবু তিনি হাল ছাড়েননি। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তিনি এখন উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান। ১০ বছর ধরে মাটিরাঙা উপজেলা আওয়ামী মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন। তাঁর সাফল্যের গল্প জানাচ্ছেন : সাগর চক্রবর্তী কমল, মাটিরাঙা (খাগড়াছড়ি)

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল সময়ে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙা উপজেলার তবলছড়ির ভাগ্যপাড়া তুলাতলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন হাসিনা বেগম। তাঁর বাবা মো. সাহেব আলী স্কুলশিক্ষক এবং খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা। মা জাহানারা বেগম তবলছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার ছিলেন। গত জানুয়ারিতে তিনি ইন্তেকাল করেন।

তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সবার বড় হাসিনা বেগমের ১৯৮৩ সালে সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালীন সময়ে মা-বাবার পছন্দে বিয়ে হয় আপন জেঠাতো ভাই দুলাল মিয়ার সঙ্গে।

স্বামী মো. দুলাল মিয়া পেশায় পল্লী চিকিৎসক। বিয়ের পরও হাসিনা লেখাপড়া করেছেন কিছু সময়। কিন্তু তা বেশিদূর এগোয়নি। সামাজিক বাধা-নিষেধের ফ্রেমে আটকে যায় তাঁর এসএসসি পরীক্ষা। স্বপ্নের বাতি নিভে যায় হাসিনার।

এক ছেলে ও তিন মেয়ের জননী হাসিনা বেগম।

ছেলে-মেয়ের মধ্যে সবার বড় একমাত্র ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজকল্যাণ বিষয়ে মাস্টার্স করেছেন। এক মেয়ে বিএ পাস করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। দ্বিতীয় মেয়ে স্নাতক পাস করেন এবং ছোট মেয়ে বিএ পরীক্ষার্থী। নিজের স্বপ্ন নিভে গেলেও সন্তানদের উচ্চ শিক্ষায় জীবন গড়ার স্বপ্ন বুনে ইতোমধ্যে চমক সৃষ্টি করেছেন অজপাড়া গাঁয়ের হাসিনা বেগম।

লেখাপড়া বন্ধ হলেও নিজেকে গুটিয়ে নিতে চাননি হাসিনা।

সব সময় কিছু করার টানে ঘর থেকে বের হয়েছেন। কখনো সফল আবার কখনো ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু হাল ছাড়েননি তিনি। কিছু করার স্বপ্নে বিভোর হাসিনা বেগম ১৯৯৬ সালে প্রকাশ্য রাজনীতিতে নিজেকে জড়ান। ওই সময় আওয়ামী লীগের স্থানীয় ওয়ার্ড কমিটি এবং পরে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য মনোনীত হন। পারিবারিকভাবে আওয়ামী রাজনীতির সাথে নিজের যোগসূত্র থাকায় পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি এ নারীকে। তিনি গত ১০ বছর সময় ধরে মাটিরাঙা উপজেলা আওয়ামী মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কাজ করছেন।

২০১৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় মাটিরাঙা উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে হাসিনা বেগম বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মনোয়ারা বেগমকে দুই হাজার ৬০০ এক ভোটে পরাজিত করে মাটিরাঙা উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। জীবনের প্রথম নির্বাচনে সর্বাধিক ১৯ হাজার ৫৭১ ভোট পেয়ে ভোটের মাঠেও চমক দেখালেন তিনি।

এক প্রশ্নের জবাবে হাসিনা বেগম বলেন, ‘আমার এলাকার সাধারণ নারী এবং দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের আগ্রহের কারণেই নির্বাচনে অংশ নিয়েছি।’ নির্বাচনকালীন সময়ে দলের নেতাকর্মীসহ মাটিরাঙা উপজেলাবাসীর প্রতি দেওয়া ওয়াদার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘জনগণের দেওয়া দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের চেষ্টা করেছি।’

অতীতেও নারী কল্যাণে নিজের ভূমিকা রাখার কথা তুলে ধরে হাসিনা বেগম বলেন, ‘আগামীতেও নারীদের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রাখব।’

তিনি নারী নির্যাতন রোধসহ নারী সমাজের উন্নয়নে সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের নারীদের সংগঠিত করতে কাজ করছেন বলেন জানান।

তিনি বলেন, ‘২০১৪ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি মাটিরাঙা উপজেলা পরিষদের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর পাঁচ বছরে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নই নয়, মাটিরাঙায় নারী শিক্ষার প্রসার ঘটিয়েছি। পিছিয়ে পড়া নারী সমাজের জন্য সম্ভব সবকিছু করতে না পারলেও কিছুটা হলেও প্রসার করেছি।’

মাটিরাঙাকে তাঁর ‘সংসার’ উল্লেখ করে হাসিনা বেগম বলেন, ‘সামনে উপজেলা নির্বাচন। তাই আবারও নারী সমাজের উন্নয়নে সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের নারীদের সাথে কাজ করার জন্য এলাকার সুশীল সমাজের সহযোগিতা ও পরামর্শ প্রত্যাশা করছি।’

মাটিরাঙা পৌরসভা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও প্যানেল মেয়র মো. আলাউদ্দিন লিটন বলেন, ‘হাসিনা বেগম গত ১০ বছর সময় ধরে মাটিরাঙা উপজেলা আওয়ামী মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে নারী সমাজের উন্নয়নে সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করছেন তিনি। তাঁর কর্মকাণ্ড সত্যিই প্রশংসনীয়।’



মন্তব্য