kalerkantho


কালের সাক্ষী বড়উঠানের মিয়াবাড়ি

হুমায়ূন কবির শাহ্ সুমন, কর্ণফুলী (চট্টগ্রাম)   

৩১ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



কালের সাক্ষী বড়উঠানের মিয়াবাড়ি

কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে কয়েক কিলোমিটার দূরে উপজেলার বড়উঠান ইউনিয়নের মিয়ার হাট এলাকায় শত বছরের পুরাতন ঐতিহ্যবাহী জমিদার মনোহর আলী খানের সেই মিয়াবাড়ি এখন কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে ঐতিহ্য-ইতিহাস। ঝোপ জঙ্গলে ঘেরা ভবনটি স্থানীয়দের কাছে ‘ভুতুড়ে বাড়ি’ হিসেবে পরিচিত।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কয়েক শ বছর আগের জমিদারের ১৬তম প্রজন্ম জমিদার মনোহর আলী খান। ১৬৬৫  সালে তাঁদের পূর্বপুরুষ এখানে আসেন। কেউ কেউ বলে থাকেন রাজা শ্যামরায় তাঁদের পূর্বপুরুষ। তাঁরা মূলত শায়েস্তা খানের বংশধর।

শায়েস্তা খান তাঁর জমিদারির ২৫ শতাংশ দেওয়ান মনোহর আলী খানকে দান করেছিলেন। সেখান থেকেই তাঁদের জমিদারি শুরু। পাকিস্তান আমলে জমিদারি প্রথা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তাঁদের জমিদারির অবসান ঘটে।

জানা যায়, জমিদার বাড়ির সামনের ঘরে বাইরের অতিথিরা এসে বসতেন। সেখানে খাজনাও আদায় হত। বিচার-আচারও সেখানে হত। মাটির নির্মিত ওই ঘরের বিভিন্ন অংশ বর্তমানে ক্ষয় হয়ে গেছে। বাড়ির একপাশে ছিল ধানের বিশাল গোলা ও অপরপাশে ছিল বিনোদন স্থান। যেখানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হত। প্রায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া দ্বিতল ভবনটিতে ছিল উপরে ও নিচে তিনটি করে মোট ছয়টি কক্ষসহ দুই ফ্লোরে দুটি শৌচাগার। জমিদার বাড়ির ভবন নির্মাণে যে ইট ব্যবহার করা হয়েছে তা চার কোণা আকারের।

দেয়াঙ পাহাড়ের মাটি দিয়ে বিশেষভাবে ইটগুলো তৈরি করা হয়েছিল। এর সাথে চুন সুরকি দিয়ে স্থাপনাটি নির্মাণ করা হয়। স্থাপনার বয়স কয়েক শ বছর বলে ধারণা করা হচ্ছে। জমিদারের বংশধররা ষাটের দশক থেকে ভবনটিতে বসবাস করা বন্ধ করে দেন। সেই সময় বাড়ির পেছনে আরেকটি একতলা ভবন নির্মাণ করা হয়। সেটি এখনো বসবাসের উপযোগী। জমিদারের বংশধররা গ্রামের বাড়িতে গেলে সেখানে বসবাস করেন। পুরাতন ভবনটির কোনো সংস্কার না হওয়ায় তা এখন বিলুপ্তির পথে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বড়উঠান মিয়াবাড়িতে প্রবেশ করতেই আছে বড় একটি পুকুর। পুকুরটিতে দুটি ঘাট রয়েছে। একটি ঘাট নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর পুনরায় সংস্কার করা হয়। পুকুরের দক্ষিণ পশ্চিম পাশে রয়েছে মসজিদ। মসজিদের পাশের ঘাটটি এখনো অক্ষত আছে।

সেই আমলে নির্মিত মসজিদের কারুকাজ চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে বিশাল বিশাল দেয়ালের উপর নির্মিত মসজিদের ভেতরের দৃষ্টিনন্দন কারুকাজ ও ঠান্ডা পরিবেশ যেকোনো মুসল্লিকে প্রশান্তি দেয়। মসজিদের পাশেই কবরে শুয়ে আছেন জমিদারের বংশধররা। মূল বাড়ির সামনে রয়েছে লম্বা মাটির কাছারি ঘর। সামনে বড় বারান্দা। বারান্দায় দেওয়া হয়েছে মাটির পিলার। কাছারির মাঝে রয়েছে মূল বাড়িতে যাওয়ার পথ। মূল বাড়িটি এখন ঝোপঝাড়ে প্রায় আড়াল হয়ে গেছে। বাড়িটির আশপাশে অনেক পুরনো লিচুগাছ, বেলগাছসহ বিভিন্ন ফলদ ও বনজ গাছ। গাছগুলোর বয়সও বাড়ির চেয়ে কম নয়।

জমিদার মনোহর আলী খানের

১৯তম বংশধর হেলাল উদ্দিন খান বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষ ১৬৬৫ সাল থেকে জমিদারি শুরু করেন। সেই থেকে পূর্বপুরুষদের জমিদারি চলতে থাকে।

দীর্ঘ কয়েক শ বছর জমিদারি চলার পর তৎকালীন সময়ে এ কে ফজলুল হক ১৯৫৪ সালের দিকে আমাদের জমিদারি বন্ধ করে দেন। তার পর থেকে ধীরে-ধীরে জমিদারির অবসান ঘটে। এই জমিদার বাড়ির ইতিহাস আমরা জানলেও

বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা এ ইতিহাস জানে না। তাই এই জমিদার বাড়িটি সংস্কার করা খুবই প্রয়োজন যাতে করে আগামী

প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা এ জমিদার বাড়ির ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারে।’

স্থানীয় বড়উঠান ইউপি সদস্য সাজ্জাদ খান সুমন বলেন, ‘এটি অনেক পুরাতন জমিদার বাড়ি। আমাদের এলাকার জন্য গর্ব।

ভবনটি কয়েক শ বছরের পুরাতন হওয়ায় তা সংস্কারের অনুপযোগী হয়ে ওঠেছে। তবে এটি সংস্কার না হলেও মসজিদ, পুকুরের ঘাটসহ আশে-পাশের চলাচলের রাস্তা সংস্কার করা হয়েছে।’



মন্তব্য