kalerkantho


২০ কোটি টাকার জেটি জলে!

চট্টগ্রাম-সন্দ্বীপ নৌপথে বাড়ছে দুর্ভোগ-দুর্ঘটনার ঝুঁকি

রহিম মোহাম্মদ, সন্দ্বীপ (চট্টগ্রাম)   

৩১ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



২০ কোটি টাকার জেটি জলে!

সন্দ্বীপ গুপ্তছড়া ফেরিঘাটে নির্মিত জেটি যাত্রীদের কোনো কাজে আসছে না। প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে বিআইডব্লিউটিএ ২০১৩ সনে জেটিটি নির্মাণকাজ শেষ করে সাধারণ যাত্রীদের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। নির্মাণের ৩/৪ বছরের মাথায় কয়েক দফায় এটির ২০০ মিটার নদীগর্ভে তলিয়ে যায়। প্রায় ৮০০ মিটার দীর্ঘ জেটির বাকি অংশও এখন ঝুঁকির মুখে।

জানা গেছে, ডিজাইন ত্রুটি ও ঠিকাদারের কাজে অনিয়মের কারণে নির্মাণের কিছু দিনের মধ্যে জেটির অবকাঠামোগত বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। নৌযানগুলোতে যাত্রীদের উঠানামা সম্ভব হচ্ছে না বিধায় বাড়ছে দুর্ভোগ ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি।

জীবন-জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন শত শত মানুষ সন্দ্বীপ থেকে জেলা শহর চট্টগ্রাম এবং দেশের অন্যান্য স্থানে যাতায়াতের উদ্দেশ্যে চ্যানেল পাড়ি দিতে গুপ্তছড়া ফেরিঘাটকে অধিকতর পছন্দ করেন। প্রকৃতপক্ষে যাত্রীদের নৌযানে উঠানামার সুবিধার্থে দ্বীপবাসীর দীর্ঘদিনের অসুবিধার কথা বিবেচনা করে এখানে ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে জেটি নির্মাণ করা হয়েছিল। শুরুতে জেটি দিয়ে যাত্রীরা সরাসরি নৌযানে উঠানামার সুযোগ পেত। কিন্তু ছয় মাস না যেতেই অগ্রভাগের দুটি খুঁটি ভেঙে যাওয়ায় সরাসরি নৌযানে উঠানামার সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, জেটির খুঁটির পাইলিং গভীরতা কম থাকায় এবং নির্মাণকাজে যথাযথ মান রক্ষা না করায় বছরের মাথায় স্রোতের তোড়ে খুঁটিসহ এর অগ্রভাগের কিছু অংশ ভেঙে যায়। পরে বিভিন্ন সময় সাগরের উত্তাল ঢেউয়ে জেটির  বিশাল অংশ বিলীন হয়ে যায়। বর্তমানে স্পিডবোট, স্টিমার বা অন্য নৌযানে যাত্রীদের কাদা ও কোমর পানি মাড়িয়ে উঠানামা করতে হয়। এতে শিশু ও নারীদের ভোগান্তি চরমে ওঠে। তবে জেলা পরিষদ কর্তৃক নির্বাচিত ইজারাদারের ব্যক্তিগত উদ্যোগে এখানে একটি কাঠের সাঁকো নির্মাণ করা হয়েছে যা দিয়ে যাত্রীরা ছোট নৌযানে কোনোমতে উঠানামা করেন। কিন্তু ভাটার সময় সরাসরি নৌযানে উঠানামা সম্ভব হয় না। অনেক সময় বৃদ্ধ ও নারীদের কোলে চড়ে নৌযানে উঠানামা করতে হয়। এ সময় নারীরা বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়েন। রোগীদের উঠানামা করার সময় দুর্ভোগের সীমা থাকে না। জেটি ত্রুটিপূর্ণ থাকায় বড় নৌযানগুলো জেটিতে ভিড়ানোর মাধ্যমে যাত্রী উঠানামা করা সম্ভব হচ্ছে না বিধায় বাড়ছে দুর্ভোগ ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি। দুর্ঘটনার মুখোমুখি হয়ে অনেককে ইতোমধ্যে পঙ্গুত্ববরণ করতে হয়েছে। আবার কারো সাগরে সলিল সমাধি ঘটেছে। গত বছরেরর ২ এপ্রিল নৌকা দিয়ে জাহাজ থেকে যাত্রী নামাতে গিয়ে অকালে প্রাণ হারিয়েছেন ১৮ জন যাত্রী।

সরেজমিনে গুপ্তছড়া ফেরীঘাটে দেখা গেছে, যাত্রীদের উপকারে এলেও অস্থায়ীভাবে নির্মিত সাঁকোটি কেওড়া গাছের কাঠ দিয়ে তৈরি এবং এটির নড়বড়ে অবস্থা। ঝুঁকি নিয়ে নারী-শিশু ও বৃদ্ধ পুরুষ যাত্রীরা স্পিডবোটে উঠানামা করছেন। নাজুক কাঠের সাঁকোটি যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। অস্থায়ী সাঁকোটি মাঝে মাঝে জোয়ারের তোড়ে ভেঙে যায়।

কলেজছাত্রী নাছিমা বলেন, ‘সরকারি বিভাগ কোটি কোটি টাকা গচ্ছা দিয়েও আমাদের জন্য নিরাপদ উঠানামার ব্যবস্থা করতে পারেনি। দুর্ভাগ্য! এভাবে আর কতকাল চলবে?’

গুপ্তছড়া ফেরিঘাটের জেলা পরিষদ ইজারাদার এস এম আনোয়ার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কোনো বরাদ্দ না থাকা সত্ত্বেও যাত্রীদের সুবিধার জন্য আমি ব্যক্তিগতভাবে কাঠ দিয়ে সাঁকো তৈরি করে দিয়েছি। ঘাটের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য জেলা পরিষদ প্রতি বছর বিআইডব্লিউটিএকে ১০ লক্ষ টাকা পরিশোধ করে। যাত্রীদের সুবিধার জন্য জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে শিগগিরই একটি উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।’

সন্দ্বীপ থেকে নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতা বলেন, ‘যাত্রী ওঠানামায় জেটিটি কাজে না লাগায় আমি বিআইডব্লিউটিএর সাথে যোগাযোগ করে ৪৬ কোটি টাকা ব্যয় বরাদ্দের ব্যবস্থা করেছি। সেই বরাদ্দের মাধ্যমে আরো একটি আধুনিক জেটি নির্মাণের কাজ চলছে। আশা করা যাচ্ছে, এ জেটি দিয়ে সাধারণ যাত্রীদের নিরাপদ উঠানামা সম্ভব হবে।’

 



মন্তব্য