kalerkantho


২৩৫ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প

বান্দরবান-কেরানিহাট সড়ক বদলে যাচ্ছে

মনু ইসলাম, বান্দরবান   

৩১ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



বান্দরবান-কেরানিহাট সড়ক বদলে যাচ্ছে

বদলে যাচ্ছে বান্দরবান-কেরানিহাট সড়কের অবস্থা। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে সড়ক প্লাবিত হয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা কাটাতে সড়কের কয়েকটি অংশ উঁচু করা, সড়ক প্রশস্তকরণ এবং বিদ্যমান কয়েকটি পুরনো ব্রিজ ও কালভার্ট ভেঙে আরো প্রশস্ত করে নির্মাণ এবং ২১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কের বাঁক কমিয়ে বড় বড় যানবাহন চলাচল উপযোগী করে তোলার প্রস্তুতি শুরু করেছে বান্দরবান সড়ক ও জনপথ বিভাগ।

বান্দরবান সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সজীব আহমদ জানান, দীর্ঘদিন প্রতীক্ষার পর গত ২৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (একনেক) সভায় এই সড়ক উন্নয়নে ২৩৫ কোটি টাকার প্রকল্প সরকারের অনুমোদন পেয়েছে। সরকারি অনুমোদন পাওয়ার পর এখন মাঠ পর্যায়ে এর বাস্তবায়নে বাড়তি কারিগরি তথ্য-উপাত্ত নিশ্চিতকরণ ও ডিজাইন চূড়ান্ত করতে হচ্ছে।

নির্বাহী প্রকৌশলী সজীব আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রথম দিকে আমরা ২১০ কোটি টাকার পরিকল্পনা প্রস্তাব পাঠিয়েছিলাম। পরে ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলীদের পরামর্শে এটি  সংশোধন করে ২৩৫ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। সংশোধিত ডিটেইলস প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) ২১টি নতুন পাকা সেতু নির্মাণ করা হবে। পানি নিষ্কাশন সহজতর করার জন্যে বিদ্যমান বক্স কালভার্টের পাশাপাশি আরো ১২টি বড় কালভার্ট স্থাপনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।’

ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারসহ সারাদেশের সঙ্গে বান্দরবানে প্রবেশের একমাত্র মাধ্যম বান্দরবান-কেরানিহাট সড়ক। আঁকা-বাঁকা ছাড়াও অনেক পয়েন্টে বিপজ্জনক মোড় থাকায় মাঝে মধ্যে বড় ধরনের সড়ক দুর্ঘটনা জানমালের ক্ষতির পাশাপাশি পর্যটন শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে আসছিল।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়ক উঁচুকরণের ফলে গত দেড় দশক যাবত পানি নিষ্কাশিত হতে না পেরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে এবং সামান্য বৃষ্টি হলেই বাজালিয়া এলাকায় দুটি পয়েন্টের প্রায় ৩০০ মিটার রাস্তা ৩/৪ ফুট পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে বান্দরবানকে সারাদেশের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে একটি পয়েন্টের সড়ক উঁচু করা হলেও অপর অংশ ডুবে যাওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্তি পাচ্ছিল না পর্যটন সম্ভাবনার এই জেলা। একনেকে অনুমোদিত নতুন প্রকল্প প্রস্তাবে বাজালিয়া পয়েন্টের এই অংশসহ আরো কিছু অংশ উঁচু করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানালেন নির্বাহী প্রকৌশলী সজীব আহমদ।

বান্দরবান সড়ক বিভাগের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, প্রথম অংশটি উঁচু করার কাজ পরিদর্শনের সময় বান্দরবান থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে এই সড়কের সার্বিক উন্নয়নে কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানান। এ সময় সড়ক ও সেতুমন্ত্রী বান্দরবান-কেরানিহাট সড়ক উন্নয়নে বড় ধরনের একটি প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানোর জন্যে সড়ক বিভাগকে নির্দেশ দেন।

নির্বাহী প্রকৌশলী সজীব আহমদ জানান, এবারও একনেকে প্রকল্পটি অনুমোদন প্রক্রিয়ায় সড়ক ও সেতুমন্ত্রী এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়েছেন।

বান্দরবান-কেরানিহাট সড়কের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী প্রকৌশলী মংশৈ প্রু মারমা বলেন, ‘জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদে প্রকল্পটি অনুমোদিত হওয়ায় এখন আমরা সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরুর খণ্ড খণ্ড পরিকল্পনা সাজাচ্ছি।

সড়ক অবকাঠামো যুগোপযোগী করার জন্যে প্রণীত ডিজাইনের আলোকে কিছু কিছু অংশে কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে।’

এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং এমপি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বান্দরবান জেলার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে গত এক দশকে অনেকগুলো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছে। চলমান রয়েছে আরো কয়েকটি বড় প্রকল্প। ইতোমধ্যে বানের পানিতে তলিয়ে যাওয়া বান্দরবান রাঙামাটি সড়কের পুলপাড়া বেইলি ব্রিজ ভেঙে ফেলে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা বাড়িয়ে আরসিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ করা হয়েছে।’

প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, ‘বান্দরবান-রোয়াংছড়ি সড়কের রামজাদি মন্দির সংলগ্ন বেইলি ব্রিজটিও প্রতিবছর জলমগ্ন হয়ে বিশাল এলাকাকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে। এই বেইলি ব্রিজের পরিবর্তে আরো উঁচু অবস্থানে একটি আরসিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণের প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে।’ বীর বাহাদুর জানান, বিকল্প সড়ক নেটওয়ার্ক স্থাপন ও দূরত্ব কমাতে সদর উপজেলার গোয়ালিয়া খোলায় শঙ্খ নদীর উপর আরো একটি বড় ব্রিজ নির্মাণের কাজও শেষের পথে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে নির্মাণাধীন ব্রিজটি চালু হলে বান্দরবান থেকে চট্টগ্রাম যেতে সড়কপথ ১৫ কিলোমিটার কমে যাবে। এর ফলে বিকল্প সড়কে বান্দরবান যাতায়াতে সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং অর্থ ও সময় ব্যয় অনেক কমে যাবে। সড়ক বিভাগের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, শঙ্খ নদীর উপর রুমা ও থানচি ব্রিজ নির্মাণের ফলে সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা পর্যটনসমৃদ্ধ এই দুটি এলাকায় এখন গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু হয়েছে। আধুনিক যানবাহন ব্যবহার করেও সরাসরি পৌঁছা যাচ্ছে থানচি এবং রুমা। সূত্র জানায়, সেনাবাহিনীর নির্মাণ প্রকৌশল বিভাগের তত্ত্বাবধানে (ইসিবি) থানচি থেকে আলীকদম পর্যন্ত ২৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়ক তৈরি হওয়ায় পর্যটকরা দেশের সবচেয়ে উঁচু এই সড়ক পথ ব্যবহার করে বিস্তীর্ণ প্রাকৃতিক এলাকা দেখার সুযোগ পাচ্ছেন।

সরকারি পরিকল্পনায় নাইক্ষ্যংছড়ি থেকে আরো একটি সড়ক থানচি-আলীকদম সড়কের সাথে সংযুক্ত হলে পুরো বান্দরবান একটি সার্কুলার সড়ক নেটওয়ার্কের আওতায় চলে আসবে। রুমা থেকে বগালেক পর্যন্ত সড়কের নির্মাণ কাজও প্রায় শেষের দিকে। ইসিবির প্রকল্প ব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরে শেষ হতে পাওে এই সড়কের নির্মাণকাজ। এদিকে এগিয়ে চলছে আলীকদম-পোয়ামুহুরী সড়ক নির্মাণের কাজও। এটিও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে সেনাবাহিনীর নির্মাণ প্রকৌশল বিভাগের তত্ত্বাবধানে।

স্থানীয় জনগণ আশা করছেন, চলমান প্রকল্পগুলো সম্পন্ন হলে কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি পর্যটন খাতে নিজেদের সম্পৃক্ত করার মধ্য দিয়ে আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।



মন্তব্য