kalerkantho


চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমা বাড়ছে সাড়ে ছয় গুণ

৩১ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমা বাড়ছে সাড়ে ছয় গুণ

ছবি : রবি শংকর

দেশের প্রধান চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের জলসীমা বাড়ছে। বহির্নোঙরে সাগরের সীমানা সীতাকুণ্ড থেকে বেড়ে মহেশখালীর মাতারবাড়ি, কুতুবদিয়া হয়ে সোনাদিয়া পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে। এ সংক্রান্ত বন্দরের একটি প্রস্তাবনা নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর আইন মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। এর পর রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে বিজ্ঞপ্তি বা এসআরও জারির পর এটি কার্যকর হবে। বিস্তারিত জানাচ্ছেন : আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম

 

চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের জলসীমা সাড়ে সাত নটিক্যাল মাইল থেকে সাড়ে ছয় গুণ বেড়ে ৫০ নটিক্যাল মাইলে উন্নীত হবে। কয়েক বছর ধরে পণ্যবাহী জাহাজ আসা ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় চাপ সামাল দিতে বন্দরের সীমানা বাড়ানো হচ্ছে। একই সঙ্গে মাতারবাড়ি ঘিরে এলএনজি টার্মিনাল, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) নির্মিতব্য মাতারবাড়ি সমুদ্রবন্দর এবং কুতুবদিয়ার গভীর সাগর; আনোয়ারা অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘিরে পণ্যবাহী জাহাজ ভিড়ানোর সুবিধার্থে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ সীমানা বাড়ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

২০১১ সালের পর বাড়ছে সীমানা : চট্টগ্রাম বন্দরের জলসীমা আগে ছিল বহির্নোঙরের পাঁচ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত। বন্দরে জাহাজের চাপ বাড়ায় ২০১১ সালে সেটি বাড়িয়ে সাত নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এখন সেখানে তিনটি অ্যাংকেরজ বা নোঙর এলাকা আছে। চট্টগ্রাম বন্দর বলতে পতেঙ্গা উপকূল থেকে সাত নটিক্যাল মাইল বোঝানো হচ্ছে। সীমানা বাড়লে পতেঙ্গা সাগরের উত্তরে কাট্টলী থেকে সীতাকুণ্ড পর্যন্ত এবং দক্ষিণে আনোয়ারার গহিরা সাগর থেকে সোনাদিয়া সাগর পর্যন্ত হবে।

দিনে বন্দরে আয় বাড়বে কোটি টাকা : সাড়ে ১২ মিটার ড্রাফট বা গভীরতার বেশি পণ্যবাহী জাহাজ সাধারণত চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে আসে না। কুতুবদিয়া সাগরের গভীরতা বেশি বলে কুুতুবদিয়া এলাকার গভীর সাগরে ছোট জাহাজে পণ্য নামিয়ে ফেরত যায়। এই জাহাজগুলো কুতুবদিয়া সাগরে পণ্য নামালেও চট্টগ্রাম বন্দর কোনো মাসুল পায় না। প্রতিদিন অন্তত ২২টি বিদেশি জাহাজ সেখানে পণ্য নামিয়ে চলে যায়। সীমানা বাড়লে এসব জাহাজ থেকে মাসুল পাবে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

জলসীমা সাড়ে ছয় গুণ বাড়লে চট্টগ্রাম বন্দরের রাজস্ব আয় দিনে এক কোটি টাকার বেশি হবে। বর্তমানে কুতুবদিয়া গভীর সাগরে আসা জাহাজগুলো থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষ কোনো মাসুল পায় না। বন্দরে আওতাভুক্ত হওয়ার কারণে পোর্ট ডিউস রিভার ডিউস পাবে বন্দর। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার কক্সবাজার-চট্টগ্রাম ঘিরে যে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সেই প্রকল্পে বিপুলসংখ্যক জাহাজ আসা শুরু হবে। ইতোমধ্যে এলএনজি নিয়ে জাহাজ আসা শুরু হয়েছে। ফলে কয়েক বছর পর জাহাজ দুই থেকে তিন গুণ বাড়বে। তাই বন্দরের আয়ের পরিমাণও বিপুল বাড়বে।

ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউটের প্রিন্সিপাল ও বিদেশি জাহাজ পরিচালনায় অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেন ফয়সাল আজিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অনেক আগে থেকেই এই সীমানা বাড়ানোর দাবি ছিল। কুতুবদিয়া পর্যন্ত বন্দরের সীমানা না থাকায় বিদেশি জাহাজগুলো পণ্য নামিয়েই চলে যেত। এতে বন্দর মাসুল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আর সেখানে কোনো চুরি ডাকাতির ঘটনা ঘটলে দায়ভার বন্দরের ওপর পড়ে।’

সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে এখন সীমানা বাড়ানো অপরিহার্য হয়ে পড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সীমানা বাড়িয়ে জনবল নিয়োগ করে দ্রুত এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে হবে দেশের স্বার্থেই।’

বহির্নোঙরে অ্যাংকরেজের তুলনায় জাহাজ বেশি : বন্দরের কর্মকর্তারা বলেন, বর্তমানে বিদেশ থেকে আসা পণ্যবাহী কন্টেইনার, ট্যাংকার ও খোলা জাহাজ সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে ঢুকতে পারে না। সাড়ে নয় মিটার গভীরতা ও ১৯০ মিটার দীর্ঘ জাহাজই কেবল জেটিতে ঢোকার অনুমতি পায়। এর বড় জাহাজগুলো কুতুবদিয়া কিংবা বহির্নোঙরে এসে অপেক্ষায় থাকতে হয়। বহির্নোঙর তিনটি অ্যাংকরেজে (আলফা, ব্রেভো ও চার্লি) সর্বমোট ৯৩টি জাহাজ ভিড়তে পারে। এর মধ্যে চার্লি অ্যাংকরেজে ৮ থেকে ৯ মিটার গভীরতার জাহাজ, ব্রেভো অ্যাংকরেজে ৯ থেকে সাড়ে ১০ মিটার গভীরতার জাহাজ এবং আলফা অ্যাংকরেজে সাড়ে ১০ থেকে সাড়ে ১২ মিটার গভীরতার জাহাজ ভিড়ানো হয়। কিন্তু বেশির ভাগ জাহাজের ক্যাপ্টেন আলফা অ্যাংকরেজকে বেছে নেয়।

এর কারণ জানতে চাইলে জাহাজের এক ক্যাপ্টেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কুতুবদিয়া গভীর সাগরে সবচেয়ে বড় গভীরতার জাহাজ ভিড়ে। সেখানে ১৩-১৫ মিটার গভীরতার একটি জাহাজ নোঙর করার পর ছোট বা লাইটার জাহাজে কিছু পণ্য নামিয়ে জাহাজের গভীরতা হাল্কা করা হয়। এর পর জাহাজটি বন্দর জলসীমায় পৌঁছে। গভীরতা সাড়ে ১২ মিটার থাকায় ক্যাপ্টেনরা সরাসরি আলফা অ্যাংকরেজে গিয়ে নোঙর করে। আলফা অ্যাংকরেজে জাহাজ নোঙর করা যায় সর্বোচ্চ ৩০টি। কিন্তু সেখানে নোঙর করে ৪০টির বেশি জাহাজ। আর এলোপাতাড়ি নোঙর করতে গিয়ে পরস্পর দুর্ঘটনায় পড়ে। কিন্তু সীমানা বাড়লে এই বাড়তি জাহাজ ভিড়তে পারত।

বহির্নোঙরে খালাস হয় দুই কোটি টন পণ্য : সর্বশেষ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৩ হাজার ৬৬৪টি পণ্যবাহী জাহাজ বন্দর জেটিতে ভিড়েছে। এর মধ্যে কন্টেইনার, সাধারণ পণ্যবাহী এবং তেলবাহী ট্যাংকার জাহাজও রয়েছে। এর আগের অর্থবছর ২০১৬-১৭ সালে জাহাজ এসেছিল ৩ হাজার ৯২টি। একবছরে জাহাজ বেশি বেড়েছে ৫৭২টি। এছাড়া বহির্নোঙর ও কুতুবদিয়া সাগরে বছরে দুই কোটি টনের বেশি খোলা পণ্য জাহাজ থেকে নামানো হয়। এই দুরূহ কাজটি করে থাকে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটররা। মহেশখালী ও চট্টগ্রাম ঘিরে সরকারের মেগা উন্নয়ন প্রকল্প ঘিরে বিপুল জাহাজ আসছে। এগুলো ভবিষ্যতে পণ্য উঠানামায় যুক্ত হবে।

চোরাচালান কমবে, তদারকি বাড়বে : বর্তমানে পণ্যবাহী বড় জাহাজ কুতুবদিয়া সাগরে নোঙর করার পর ছোট জাহাজে পণ্য নামিয়ে সেখান থেকেই ফেরত চলে যায়। এজন্য বন্দরকে কোনো মাসুল দিতে হয় না। কিন্তু কিছু শিপিং এজেন্ট বহির্নোঙরে জাহাজ নোঙরের নামে বাড়তি বিল দেখিয়ে সেগুলো বিদেশি প্রিন্সিপাল থেকে আদায় করে নেয়। সীমানা বাড়লে সেই শিপিং এজেন্টরা বিপাকে পড়বেন। শুধু তাই নয়, বন্দর সীমানার বাইরে থাকা জাহাজে যে চোরাচালান হতো সেগুলো নজরদারির মধ্যে আসবে।

 



মন্তব্য