kalerkantho


বীর মুক্তিযোদ্ধা বশর

স্বীকৃতি মেলেনি জীবদ্দশায়

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



স্বীকৃতি মেলেনি জীবদ্দশায়

রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং গার্ড অব অনার ছাড়াই চিরবিদায় নিলেন চন্দনাইশের বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল বায়েছ ওরফে আবুল বশর (৭০)। গত ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে তিনি নিজ বাড়িতে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। চন্দনাইশ উপজেলার হাশিমপুর ইউনিয়নের উত্তর হাশিমপুর এলাকার ভাইখলিফাপাড়ার বাসিন্দা তিনি। এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ১৯৭১ সালের রণাঙ্গনে না হারলেও দীর্ঘদিন ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ করে হেরে গেলেন। ১৬ সেপ্টেম্বর সকালে তাঁকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। তিনি স্ত্রী, তিন মেয়ে ও এক ছেলে রেখে গেছেন।

বিশিষ্ট গবেষক শামসুল আরেফীন জানান, মহান মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম দক্ষিণাঞ্চলে তিনি হাবিলদার আবু মো. ইসলাম গ্রুপের ডেপুটি কমান্ডার ছিলেন। অনেক অপারেশনে অংশগ্রহণ করেন। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অপারেশন হল সাতকানিয়া কলেজ অপারেশন, আনোয়ারা থানা অপারেশন, পাটানিপুল ব্রিজ অপারেশন, রশিদুজ্জামান হত্যা ও ১২টি রাইফেল সংগ্রহ (অর্থাৎ পটিয়া থানা শান্তি কমিটির হেড কোয়ার্টার অপারেশন), মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভেট্টা ডাকাত হত্যা ও চাইনিজ রিভলবার সংগ্রহ, উত্তর জোয়ারাভুক্ত নগরপাড়াপুল অপারেশন, গাছবাড়িয়াভুক্ত খানহাটপুল অপারেশন এবং উত্তর হাশিমপুর ডোমার বাড়ির রাজাকার লেদু অপারেশন প্রভৃতি।

আবদুল বায়েছের নেতৃত্বেও অনেক অপারেশন সংঘটিত হয়। এর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য হলো হাশিমপুর ইউনিয়নভুক্ত বাইন্যাপুকুরপাড়ে পাঞ্জাবি সৈন্যদেরকে আক্রমণ, বাইন্যাপুকুরপাড়ে মিলিশিয়া

বাহিনীর সাথে সম্মুখযুদ্ধ প্রভৃতি। তিনি ধোপাছড়ি শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান জামাল মেম্বারকে এক অপারেশনে গুলি করে হত্যা করেন। আরেক অপারেশনে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভেট্টা ডাকাতকে ফ্লাইট সার্জেন্ট মহিউল আলমের নির্দেশে তিনি গুলি করে হত্যা করে শঙ্খ নদীতে ফেলে দেন। তিনি সাতকানিয়া কলেজ অপারেশনে পায়ে গুলির স্প্লিন্টারবিদ্ধ হয়ে আহত হন। এছাড়া তিনি রাজাকারদের হাতে বন্দি হয়ে হাশিমপুর ইউনিয়ন কাউন্সিল কার্যালয়ে নির্যাতনের শিকার হন। সৌভাগ্যক্রমে তিনি সেখান থেকে পালাতে সক্ষম হয়ে বেঁচে যান।

শামসুল আরেফিনের মতে, মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ ৯ মাসে তিনি যে কাজগুলো করেন, তা একটি গ্রন্থ হওয়ার দাবি রাখে। তিনি মারা যাওয়ার পর তাঁকে কবরস্থানে নিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় অনেকে অবাক হন তাঁকে গার্ড অব অনার না দেওয়ায়। আসলে তাঁরা জানতেন না এই মুক্তিযোদ্ধা সরকারি তালিকায় নেই। কিছুদিন আগে চন্দনাইশ উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইয়ে তিনি পুত্র-কন্যাদের আগ্রহে আবেদনে অংশগ্রহণ করেন। এ সময় বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা, যেমন কমান্ডার হাবিলদার আবু মো. ইসলাম (আর্মি নং-৩৯৩৩২০০), মোহাম্মদ ইউছুপ ওরফে ইঞ্চিয়া, হারুন আল জাফর চৌধুরী, ইপিআর আইয়ুব আলী (ইপিআর নং-১৩৩৮৬), সিরাজুল ইসলাম (পিতা-কোরবান আলী), ল্যান্স নায়েক আবুল কালাম আজাদ (আর্মি নং-৩৯৩৮৪১৬) তাঁদের লিখিত প্রত্যয়ন পত্রে আবুল বশরকে একজন সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধা এবং একাত্তরের রণাঙ্গনে তাঁকে একজন অকুতোভয় সৈনিক হিসেবে আখ্যায়িত করে সাক্ষ্য দিলেও এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে তালিকাভুক্ত করা হয়নি।

কমান্ডার হাবিলদার আবু মো. ইসলাম তাঁর প্রদত্ত প্রত্যয়নপত্রে লিখেন, ‘আবুল বশর, পিতা মৃত মাওলানা মো. ইছহাক, মাতা মৃত মজলিশ খাতুন, গ্রাম উত্তর হাশিমপুর (ভাই খলিফাপাড়া), ইউনিয়ন হাশিমপুর, ডাকঘর গাছবাড়িয়া, উপজেলা চন্দনাইশ, জেলা চট্টগ্রাম, আমার গ্রুপের ডেপুটি কমান্ডার ছিলেন। আমার নেতৃত্বে তিনি আনোয়ারা থানা অপারেশন, সাতকানিয়া কলেজ অপারেশন, রশিদুজ্জামান হত্যা ও ১২টি রাইফেল সংগ্রহ প্রভৃতি অপারেশনসহ অনেক অপারেশনে অংশ নেন। এছাড়া তাঁর নেতৃত্বে হাশিমপুর ইউনিয়নভুক্ত বাইন্যাপুকুরপাড়ে পাঞ্জাবি সৈন্যদেরকে আক্রমণ প্রভৃতি সংঘটিত হয়।’

মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ ইউছুপ ওরফে ইঞ্চিয়া তাঁর প্রদত্ত প্রত্যয়ন পত্রে লিখেন, ‘আবুল বশর একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং হাবিলদার আবু মো. ইসলাম গ্রুপের ডেপুটি কমান্ডার ছিলেন। আবুল বশরের নেতৃত্বে আমি হাশিমপুর ইউনিয়নভুক্ত বাইন্যাপুকুরপাড়ে পাঞ্জাবি সৈন্যদেরকে আক্রমণ, বাইন্যাপুকুরপাড়ে মিলিশিয়া বাহিনীর সাথে সম্মুখযুদ্ধ প্রভৃতিতে অংশগ্রহণ করি। ভেট্টা ডাকাত হত্যা ও ১টি চাইনিজ রিভলবার সংগ্রহ অপারেশনেও আবুল বশর ও আমি এক সঙ্গে সমপৃক্ত ছিলাম। সার্জেন্ট মহিউল আলম, শাহজাহান ইসলামাবাদী ও মীর আহমদ চৌধুরীর নির্দেশে সংঘটিত এ অপারেশনে সার্জেন্ট মহিউল আলম উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁর নির্দেশে আবুল বশর ভেট্টা ডাকাতকে গুলি করে হত্যা করেন।’

মুক্তিযোদ্ধা হারুন আল জাফর চৌধুরী তাঁর প্রদত্ত প্রত্যয়ন পত্রে লিখেন, ‘আবুল বশর গ্রুপ নং-৫ এ (হাবিলদার আবু মো. ইসলাম গ্রুপ)-ভুক্ত ছিলেন। তিনি আমতলীপাড়া অপারেশন, ডলুছড়িপাড়া অপারেশন ও শান্তি কমিটির নেতা রেদা মেম্বার অপারেশনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।’

মুক্তিযোদ্ধা ইপিআর আইয়ুব আলী তাঁর প্রদত্ত প্রত্যয়ন পত্রে লিখেন, ‘আবুল বশর গ্রুপ নং-৫ এ (হাবিলদার আবু মো. ইসলাম গ্রুপ)-এর ডেপুটি কমান্ডার ছিলেন। আবু মো. ইসলামের নেতৃত্বে বিভিন্ন অপারেশনে তিনি এবং আমি এক সঙ্গে ছিলাম। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অপারেশন, আনোয়ারা থানা অপারেশন, সাতকানিয়া কলেজ অপারেশন, রশিদুজ্জামান হত্যা ও ১২টি রাইফেল সংগ্রহ।’

জানা গেছে, উক্ত যাচাই-বাছাইয়ে ছিলেন স্থানীয় এমপির প্রতিনিধি মুক্তিযোদ্ধা ফেরদৌস ইসলাম খান, চন্দনাইশ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের কমান্ডার জাফর আলী হিরু, মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মজিদ, তপন নামে একজন, উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রমুখ। রহস্যজনকভাবে এই যাচাই-বাছাইয়ে আবুল বশর বাদ পড়েন। তিনি পুত্র-কন্যাদের বলেছিলেন, ‘তোমাদের কারণে আবেদন করলাম। আমি তো দেশের জন্য যুদ্ধ করেছি। কিছু পাওয়ার জন্য নয়। এই আবেদন করে আজ আমি অপমানিত হলাম।-এসব বলতে বলতে সেদিন তাঁর চোখ দিয়ে টলটল করে অশ্রুবিন্দু ঝরে পড়েছিল।’-যোগ করেন শামসুল আরেফিন।

এদিকে চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক জামাল উদ্দিন মুক্তিযোদ্ধা আবদুল বায়েছ ওরফে আবুল বশরের মৃত্যুতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন এভাবে, ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার ছড়াছড়িতে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারাও মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায়। তেমনই একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল বশর। তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই। এই বীর যোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই দাফন করা হয়েছে। আমার গবেষণালব্ধ স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম গ্রন্থে এই বীর মুক্তিযোদ্ধার মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ নয় মাসের বীরত্বের অনেক ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান না জানানোর খবর শুনে আমি নিজেই বিস্মিত হলাম! কেন এমন হলো! চতুর্দিকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার ছড়াছড়ি, অথচ প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা তালিকা থেকে বাদ পড়ছে, রাষ্ট্রীয় সম্মান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই লজ্জা রাখি কোথায়?’

খ্যাতিমান মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ডা. মাহফুজুর রহমান মুক্তিযোদ্ধা আবুল বশরের মৃত্যুতে গার্ড অব অনার না মেলায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মন্তব্য করেছেন, ‘অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা সরকারের কথিত তালিকায় স্থান পাননি। গবেষণা কেন্দ্র ইতোমধ্যেই চালু করেছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধাদের নতুন প্রজন্মের মুক্তিযুদ্ধ অনুসারীরা তাঁদের গার্ড অব অনার দেবে। দক্ষিণ জেলার মুক্তিযোদ্ধাদের অনুরোধ আপনারা বশরের কবরে গিয়ে তাঁকে সালাম জানান। ডাকলে আমিও যাব।’

মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হাবিলদার আবু মো. ইসলাম এখনো জীবিত আছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমার গ্রুপের যোদ্ধারা এক এক করে চলে যাচ্ছে। ডেপুটি কমান্ডার আবুল বশরও চলে গেলো। আমি অসুস্থ, শয্যাশায়ী। জানি না, কোনিদন আমারও ডাক এসে যায়। তবে আমাকে এই দুঃখ নিয়ে মরতে হবে যে, আমার গ্রুপের আবুল বশরসহ কিছু যোদ্ধা সরকারি মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নেই।’

 

 



মন্তব্য