kalerkantho

কিশোর ভয়ঙ্কর!

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



প্রতিদিন সকালে কাজে যেতে বাসে উঠার জন্য গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মানুষ দেখি। আর দেখি গাড়ি। নানান রকমের মানুষ। এর চাইতে বেশি রকমের গাড়ি। স্কুলগামীদের সংখ্যাই বেশি। নানান স্কুলের পোশাক পরা ছোট ছোট ছেলেমেয়ে, সঙ্গে মা কিংবা বাবা, বা অন্য অন্য অভিভাবক। একটু বড়দের সঙ্গে অভিভাবক নেই। ওরা একাই চলে। কেউ চলে দলবেঁধে, ঝাঁকে ঝাঁকে। ছোট স্কুল, মেজ স্কুল, সেজ স্কুল, বড় স্কুল পানে ছুটছে সবাই। মনের কোনে স্বপ্ন উঁকি মারে-বদলে যাবে দেশটা। শিগগিরই।

হঠাৎ ধাক্কা খেয়ে স্বপ্নভঙ্গ। ধাক্কাটা লাগে বুকের ভেতর। স্কুলের ধবধবে পোশাক পরা এক কিশোর দ্রুতগতিতে এগিয়ে যায়। হেঁটে কিংবা রিকশায় চেপে নয়। সে যায় মোটরবাইক হাঁকিয়ে। চুল তার হাওয়ায় উড়ে। কতোইবা বয়স! পনের কি ষোল।

অনিয়ম, অশোভন, অসুন্দর, অশুভ...হাজার রকমের ‘অ’ জড়ানো কর্মকাণ্ড দেখে দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেলেও মোটরসাইকেলের চালকের আসনে বসে এক কিশোর ব্যস্তসড়ক পাড়ি দিয়ে স্কুলে যায়। এই ‘অস্বাভাবিক’ ব্যাপারটা মেনে নিতে পারি না। শহরতলির এই ব্যস্ত মোড়ে পুলিশের উপস্থিতি লক্ষণীয়। জলপাই রঙের জংলি ছাপার পোশাকপরা কর্মীও মাঝেমধ্যে দেখা যায়। কারও চোখেই দৃশটা বেমানান ঠেকে না। সবার সামনে দিয়ে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যায় কিশোর আরোহী তার গন্তব্যে। ন্যূনতম প্রতিরক্ষা বর্ম থাকে না তার অঙ্গে। স্কুল ছুটির পর নিশ্চয় একইভাবে বাড়ি ফেরে সে। আমার তা দেখা হয় না। গলির দোকানির কাছে শুনেছি দুয়েকজন বন্ধুকেও মাঝে মধ্যে পেছনে ঝুলিয়ে কৃতার্থ করে গর্বিত সেই কিশোর বাইকচালক।

সেই দুর্দান্ত কিশোরকে আমি চিনি না। তবু মন থেকে মুছে ফেলতে পারি না তার বিপজ্জনকভাবে পথচলার সেই ভয়জাগানিয়া দৃশ্য। অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠে অন্তরাত্মা। অন্যরা কীভাবে বিষয়টা দেখছেন আমি জানি না। কিন্তু ওর

বাবা মায়ের কথা ভাবছি। ওঁরা কেমন করে কিশোর ছেলেকে মোটরবাইকে বসিয়ে স্কুলে পাঠিয়ে দেন? সেটা অনেক পরের কথা। পনের কি ষোল বছরের ছেলেকে মোটরবাইক কিনেই বা দেন কেমন করে? নিজের হাতে সন্তানের মৃত্যুর দরজা খুলে দেন; কেমন বাবা মা? প্রতিদিন সকালে দেখা সেই কিশোর ছাড়া অসংখ্য কিশোর, যুবক মোটরবাইক হাঁকিয়ে  রাজপথ কাঁপায়। এক বাহনে তিনজন-যখন তখন দেখা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়েগুলোতে অতি পরিচিত, কুৎসিত এক দৃশ্য নিত্যদিনের। শহর, শহরতলি, মফস্বল হয়ে গ্রামদেশেও এই দৃশ্যের ব্যাপক বিস্তার ঘটছে আজকাল।

এই দ্বি-চক্রযানের কর্তৃত্ব কোনো কিশোরের হাতে এলে সে নিজেকে অতিনায়ক (সুপার হিরো) কি অতিমানব (সুপারম্যান) ভাবতে শুরু করে। গতির কাঁটা ওঠাতেই তার আনন্দ, সার্থকতা। নওগাঁর নিলয়ও তেমনি করে আনন্দ ও সার্থকতা খুঁজতে গতির কাঁটা উপরের ঘরে নিয়ে গিয়েছিল। গেল মে মাসের তিন কি চার তারিখে। সঙ্গে ছিল দুই বন্ধু। উন্মাদনা চরমে। ভটভটি নামক এক স্বল্পমূল্যের দুর্বল বাহনের সঙ্গে লেগে ছিটকে যায় তিন কিশোর। পেছনের দুজন অল্পতে রক্ষা পেলেও চালকের আসনে বসা নিলয়কে মূল্যটা দিতে হয়েছে চড়া দামে, পা হারিয়ে। কাকে দোষারোপ করব আমরা? ভটভটিকে, না সড়ক কে? দায় কি আমাদের নেই? অবিবেচক বাবা মায়েদের?

গেল ২ আগস্ট ঢাকার দোহারে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র রেশাদ প্রাণ হারায় ট্রাকের নিচে পড়ে। সেও মোটরবাইক হাঁকিয়ে স্কুলে যাচ্ছিল। হন্তারক ট্রাকচালকের প্রতি ধিক্কার ঘৃণা। শাস্তির প্রশ্নে কোনো আপস করা চলবে না। কিন্তু বারো বছরের ছেলেকে মোটরবাইক চালাবার অনুমতি, অধিকার আর সুযোগ করে দেওয়ার দায় এড়াবেন কি করে রেশাদের বাবা মা? সে কি তবে তাদের অগোচরে বাইক নিয়ে স্কুলে যাচ্ছিল ব্যস্ত সড়ক পাড়ি দিয়ে? কে জানাবে তাদের সমবেদনা? এ কেবল একজন নিলয় কিংবা একজন রেশাদের কথা নয়। নিলয়দের রেশাদদের মর্মান্তিক পরিণতির কথা প্রতিদিন কানে আসে। তবু হুঁশ আসছে না আমাদের। আমরা বাবা মায়েরা কি একটু সচেতন হব? নিলয়ের অঙ্গহানি, রেশাদের প্রাণের বিনিময়ে? দেশের আনাচে কানাচে যত কিশোর চালক আছে ওদের চাবিগুলো কি নিয়ে নেব? ওদেরকে কি আমরা একটু সংযত হতে বলব? আমার গলির মোড়ে দেখা সেই অচেনা কিশোরের  বাবা-মা কি ওর বাইকের চাবিটা লুকিয়ে রাখবেন?

তাই যেন হয় খোদা। আর নয় অঙ্গহানি, প্রাণদান। আর কোনো কিশোর যেন এভাবে বেঘোরে হারিয়ে না যায় জীবন থেকে।

 

ড. সালমা বিনতে শফিক

সহকারী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়



মন্তব্য

palash commented 21 days ago
ধন্যবাদ ম্যাম সত্য কথা গুলো লিখার জন্য। ভাবতেই কষ্ট হয় আমাদের পরিবার গুলোই বা কেমন ছেলে মেয়ে যা আবদার করে তাই কি দিতে হবে ? কোনটা তার জন্য উপর্যুক্ত তার পরিবার দেখবে নাতো কে দেখবে। দোষটা আসলে কাকে দিবো বুঝে উঠতে পারছি না :(