kalerkantho

পাহাড়ের যমজ ফুটবলকন্যা

আবু দাউদ, খাগড়াছড়ি   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



পাহাড়ের যমজ ফুটবলকন্যা

ওরা দুই যমজ বোন। খুদে ফুটবলার। ফুটবল তাদের জীবন। ফুটবল নিয়েই তাদের যত ভাবনা। সামনে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় মনোবল। নাম তাদের আনাই মগিনী ও আনুচিং মগিনী। অনূর্ধ্ব-১৫ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে সাফল্য দেখিয়ে বাড়ি ফিরেছে তারা।

দুই যমজ বোন জানিয়েছে, স্বপ্নচূড়ায় না পৌঁছা পর্যন্ত তারা থামবে না। সুনাম ছড়িয়ে বাংলাদেশের ফুটবলকে বহুদূর নিয়ে যেতে তারা জীবনের সবটুকু বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত। অনূর্ধ্ব-১৫ ফুটবলে সাফল্যের পেছনে নান্দনিক ফুটবল খেলে অবদান রাখে পাহাড়ি জেলা খাগড়াছড়ির দুই বোন আনুচিং মগিনী ও আনাই মগিনী। গ্রামের মেঠো মাঠ থেকে আন্তর্জাতিক মানের মাঠ পর্যন্ত ফুটবল নিয়ে কাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে তারা। তাদের সাফল্যের কথা অনেকের জানা থাকলেও জানা নেই তাদের জীবনযুদ্ধের গল্পগাথা কাহিনি।

যেভাবে উঠে আসা

২০১১ সালে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা ফুটবল টুর্নামেন্ট শুরু হয়। আরো অনেকের মতো তারাও সাতভাইয়াপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হয়ে অংশ নেয় ওই টুর্নামেন্টে। যমজ দুই বোনের হাত ধরে জেলা চ্যাম্পিয়ন হয়ে চট্টগ্রামে বিভাগীয় পর্যায়ে খেলার সুযোগ হয় সেবার।

ওই বছরেই পাহাড়ের আরেক জেলা রাঙামাটির মগাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চট্টগ্রাম বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হয়ে জাতীয় পর্যায়ে ওঠে। চট্টগ্রামে নজরকাড়া ফুটবলে মুগ্ধ হয়ে আনাই ও আনুচিংকে তার দলে খেলার অফার করে মগাছড়ি

বিদ্যালয়ের শিক্ষক বীরসেন চাকমা। দুজনের ভালো খেলায় বিদ্যালয়টি জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়নও হয়। তখন ফুটবল সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি কাড়ে দুই বোন।

২০১৫ সালে বাছাই শেষে তাদেরকে টেনে নেয় ফুটবল ফেডারেশন। বদলে যেতে শুরু আনাই আনুচিংদের জীবন কাহিনি। স্বপ্নযাত্রার সূচনা। একের পর এক বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্টে ভালো করতে থাকা যমজ বোন জাতীয় দলে সুযোগ পেয়ে যায়। বর্তমানে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের কোচ গোলাম রব্বানী ছোটনের অধীনেই তারা রয়েছে। গেল কয়েকটি টুর্নামেন্টে তারা ঈর্ষণীয় সাফল্যও দেখিয়েছে।

গত বছর সাফ চ্যাম্পিয়ন দলের গর্বিত সদস্য যমজ দুই বোন। এবারও পাকিস্তানকে ১৪-০ গোলে, নেপালকে ৩-০ গোলে আর ভুটানকে ৫-০ গোলে হারাতে ভূমিকা রাখে তারা। দুজন ৪টি গোলও করেছে। ফুটবল মাঠে আনাই মগিনীর পছন্দের পজিশন ডিফেন্স। সে প্রতিপক্ষের ফরোয়ার্ডদের রুখে দিতেই সদা প্রস্তুত। স্টপার বা রাইট ব্যাকেও তাকে খেলিয়ে থাকেন কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন। অন্যদিকে আনুচিং মগিনী ফরোয়ার্ডে খেলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। আত্মবিশ্বাসই তাদের দুজনের ভরসা বলে জানায়।

 

জাম্বুরা দিয়েই ফুটবল শেখা

এতটা সহজ ছিল না তাদের পথচলা। অভাবের ঘরে ফুটবল খেলা নিয়ে কিছুটা বাধা এসেছিল প্রথমদিকে। তবু ফুটবলের প্রতি ছিল দুই যমজ বোনের অপার আগ্রহ। ছেলেদের সাথেই মাঠে নেমে পড়তো তারা। তখনও বুঝে উঠার বয়স হয়নি তাদের। সাতভাইয়াপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠেই হাতেখড়ি ফুটবলের।

আনাই আর আনুচিং বলেছে, ‘ফুটবল কেনার সামর্থ্য ছিল না। জাম্বুরা দিয়েই খেলতাম। স্কুল মাঠ না পেলে ধান তুলে নেওয়ার পর ওই জমিতেই ফুটবল খেলতাম ছেলে বন্ধুদের সাথে।’

আনাই মগিনী বলল, ‘খেলতে খেলতে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলে মা-বাবার বকুনি খেতে হতো। অবশ্য বঙ্গমাতা ফুটবলে ভালো করার পর থেকে মা-বাবাও খেলায় উত্সাহ দিতে থাকে।’ তখনও ফুটবলের প্রতি তাদের বিশেষ আকর্ষণ ছিল। ঘরে টিভি না থাকায় ফুটবল খেলা হলেই তারা ছুটে যেতো পাশের বাড়িতে। গেল বিশ্বকাপের আগের বিশ্বকাপের সময় অন্য বাড়ির জানালার ফাঁক দিয়েই খেলা দেখতো তারা। এছাড়া ফুটবলের কলাকৌশল শেখার পেছনে ফুপাতো ভাই চাইহ্লা মারমার অবদান ছিল। বর্তমানে ঢাকায় বেসরকারি কম্পানির চাকুরে ফুপাতো ভাই এখনো সময় পেলে বল পাস করা, রিসিভ করা বা হেডিং শেখান। চাইহ্লা মারমাই তাদের অগ্রজ জাতীয় দলের ফুটবলার অংম্রাচিং মারমাকে নিয়ে প্রকাশিত সংবাদপত্রের রিপোর্ট দেখিয়ে উত্সাহ দিতেন। আনুচিং-এর প্রিয় দেশ ব্রাজিল আর প্রিয় খেলোয়াড় নেইমার। আর আনাই এর প্রিয় খেলোয়াড় মেসি, সেরা দেশ আর্জেন্টিনা।

 

স্বপ্ন অনেক দূর

যমজ দুই বোনের স্বপ্ন অনেক দূর। নিজেকে নিয়ে যেমনটা স্বপ্ন বুনে চলছে তারা। বাংলাদেশকে নিয়েও অনেক চিন্তা। দেশের ফুটবলকে বিশ্বমানে নিয়ে যেতে তারা দুজনেই অঙ্গীকারবদ্ধ। নিজেরা খেলতে চায় ক্লাব পর্যায়ের ফুটবল। পেশা হিসেবে ফুটবলকেই তারা বেছে নিতে আগ্রহী। আনুচিং এর কণ্ঠে তাই আশার বাণী। সে জানায়, ইচ্ছা আছে আরো ভালো খেলে বাংলাদেশকে বহু দূর এগিয়ে নেওয়া। ঠিক পথেই ফুটবল চলছে বলে জানিয়েছে সে। তবে, ফুটবলকে আরো বেশি যত্ন নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে আনুচিং। আরেক বোন আনাই মগিনী বলেছে, ‘কেবল খাগড়াছড়ির সুনামই নয়; বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করতে চাই। যেন আমরা বিশ্বকাপেও খেলতে পারি, সেই চেষ্টা করব।’

 

যাঁর অনুপ্রেরণায়

খাগড়াছড়ির দুই অহংকার যমজ কন্যা আনুচিং আর আনাইকে ফুটবলের প্রতি আকৃষ্ট করার নেপথ্যে ছিলেন একই গ্রামের চাইহ্লা মারমা এবং তাঁর বাবা আথোয়াই মারমা। দুই ফুটবল কন্যার ফুপা হন আথোয়াই মারমা। চাইহ্লা মারমা হলো তাদের ফুপাতো ভাই।

বর্তমানে গাজীপুরে ফারমেস্ট গ্রুপের সিনিয়র প্রোডাকশন অফিসার চাইহ্লা মারমা বললেন, ‘পরিবারে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে যমজ দুই বোন পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত অনেকটা সময় আমাদের বাড়িতেই ছিল। আমার বাবাই তাদেরকে সযত্নে লালন করত। বাজার থেকে ফিরলেই চকলেট, চিপস নিয়ে আসত। খেলার খবর এলেই দুই বোনকে কোলে নিয়ে বাবা মাঠে ছুটে যেতেন। মূলত ওই শিশু বয়স থেকেই বাবার সংস্পর্শে তারা ফুটবলের প্রতি অনুরাগী হয়ে উঠে।’

চাইহ্লা মারমা বলেন, ‘গ্রামের একমাত্র ছোট্ট মাঠ সাতভাইয়াপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে ফুটবল খেলতাম। সাথে চলে আসতো যমজ বোনরাও। তারা প্রথম দিকে শুধু খেলা দেখতো। ওরা তখন ওয়ান টুতে পড়তো ওই স্কুলেই। তারা জাম্বুরাকে ফুটবল বানিয়েও খেলতে দেখতাম। পরে তাদেরকে খেলতে দিতাম। বড় বল বা ডিয়ার বল দিয়ে খেলতে কষ্ট হত। তবুও খেলতে দিতাম। আমি তাদেরকে শিশু বয়সেই ফুটবল শেখাতাম। তাদেরও বেশ আগ্রহ দেখে আমি বেশি অনুপ্রাণিত হই। এখনো বাড়ি ফিরলেই তাদের ডেকে এনে খেলার কৌশল রপ্ত করানোর চেষ্টা করি। টিপস দিই। কীভাবে খেলার স্পিড বাড়াতে হয় তা দেখিয়ে দেই।’

 

দারিদ্র্যের সাথেও যুদ্ধ

২০১০ সালের সহিংসতায় সব হারিয়েছিল তার পরিবার। মানবসৃষ্ট সেই ঘটনার শিকার হয়ে বাড়িটিও পুড়ে ছাই হয়। পাহাড়ি জেলা খাগড়াছড়ির সেই দুর্গম অজপাড়াগাঁ সাতভাইয়াপাড়া গ্রামে তাদের জন্ম ও বেড়ে উঠা। জেলা শহর থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরবর্তী হলেও সেই গ্রামে আনাই, আনুচিংদের বাড়িতে পৌঁছাতে কষ্ট আছে। সাতভাইয়াপাড়া ছড়ার ওপর বাঁশের সাঁকো পার হয়ে যেতে হয়। গোলাবাড়ি ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে তাদের বাড়িটি খুব ভাঙাচোরা। বাবা রিপ্রু মগ একসময় বনাজি ওষুধ বানিয়েই কোনো রকমে সংসার চালাতেন। এখন তাও সম্ভব হচ্ছে না। অন্যের পাহাড়ে জুমচাষ করেই চলছে জোড়াতালির সংসার।

 

ভাঙাঘরে লজ্জা লাগে

অনেক কষ্টে অর্জন করা বিভিন্ন পুরস্কারগুলো সংরক্ষণ করতে পারছে না আনাই, আনুচিং। অত্যন্ত নড়বড়ে  ঘরটিতে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি পড়ে। যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়ার আশঙ্কাও আছে। বৃষ্টির পানিতে ভিজে যাওয়ার ভয়ে খেলে পাওয়া পুরস্কার, ট্রফি ও উপহার সামগ্রীগুলো বড় ভাইয়ের বাড়িতে নিয়ে রেখেছেন। ফুটবল খেলে দেশের জন্য অনেক সন্মান বয়ে আনা দু’বোনের এখন লজ্জা লাগে তাদের ঘরটির দুরবস্থায়। কেউ বাড়িতে গেলেই মুখ লুকিয়ে রাখে তারা।

 

কথা রেখেছেন তিনি

কথা রেখেছেন খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী। তাদের বাড়িটি নির্মাণের দায়িত্ব নিয়েছেন তিনি। গত ২৬ আগস্ট ঢাকায় ফেরার আগেই ফুটবলার দুই বোনকে বাসায় ডেকে নিয়ে অভিনন্দিত করেছেন। তিনি সদ্যসমাপ্ত সাফ ফুটবলে ভালো খেলার জন্য দুজনকে শুভেচ্ছা জানান। তাদের ভাঙা ঘরটির পরিবর্তে একটি ভালো ঘর তুলে দেওয়ার দায়িত্ব নেওয়ার কথা জানান। এ সময় তিনি তাদের হাতে দুই লাখ টাকাও তুলে দেন।

 

 

মন্তব্য