kalerkantho

সীতাকুণ্ড থানা প্রাথমিক বিদ্যালয় চট্টগ্রামের সেরা

সৌমিত্র চক্রবর্তী, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সীতাকুণ্ড থানা প্রাথমিক বিদ্যালয় চট্টগ্রামের সেরা

ধারাবাহিক ভালো ফলাফল এবং শিক্ষার চমৎকার পরিবেশ সৃষ্টির মধ্য দিয়ে উপজেলা পর্যায়ে বারবার শ্রেষ্ঠ স্থান অর্জনের পর এবার চট্টগ্রাম জেলা পর্যায়েও সেরা প্রাথমিক স্কুলের স্বীকৃতি কেড়ে নিল সীতাকুণ্ড পৌরসদরে থানা সরকারি প্রাইমারি বিদ্যালয়।

জানা যায়, সীতাকুণ্ড পৌরসদরের প্রাণকেন্দ্রে ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে ৩৮ শতক ভূমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় থানা প্রাইমারি স্কুল। শুরুতে ছোট আকৃতির ঘর থাকলেও সময়ের সাথে এর অবকাঠামোর উন্নয়নে বর্তমানে দুটি দ্বিতল স্কুলভবনে চলে সরকারি এ বিদ্যালয়ের কার্যক্রম। এখানে রয়েছে ৮টি শ্রেণিকক্ষ। শিক্ষক রয়েছেন ১০ জন, দপ্তরীকাম প্রহরী ১ জন। আর এই স্বল্প জনবলের বিপরীতে বর্তমান ছাত্রছাত্রী ৮৫৩ জন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, জনবল তুলনামূলক কম হলেও পরিচালনা কমিটি, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার কারণে উপজেলার সমস্ত স্কুলকে পেছনে ফেলে বারবার ঈর্ষণীয় ফলাফল ধরে রেখেছে বিদ্যালয়টি। বিশেষত বিগত একদশক ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি সমাপনী পরীক্ষায় বিপুলসংখ্যক ছাত্রছাত্রী নিয়ে শতভাগ পাস, উপজেলা পর্যায়ে সর্বোচ্চসংখ্যক শিক্ষার্থীর বৃত্তিলাভসহ সব বিভাগে বিশেষ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে বারবার উপজেলার শ্রেষ্ঠ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্বীকৃতি পেয়েছে। এছাড়া ২০১৭ সালে এটি চট্টগ্রাম জেলার মধ্যেও শ্রেষ্ঠ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মর্যাদা লাভ করে। এর ফলে চারদিকে এ বিদ্যালয়ের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, সীতাকুণ্ড সদর কলেজ রোড সংলগ্ন এলাকায় সুন্দর মনোরম পরিবেশে থানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি গড়ে ওঠেছে। বিদ্যালয়ের সামনে নানারকম গাছপালা ও পেছনে একটি পুকুরের প্রাকৃতিক পরিবেশের নির্মলতার মধ্যে অধ্যয়ন করে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা।

দেখা গেছে, শিশুদের লেখাপড়ায় উদ্বুদ্ধ, উত্সাহী ও শিক্ষামুখী মনোভাব গড়ে তুলতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখেনি। প্রতিটি শ্রেণিকক্ষের দেয়াল ও বারান্দায় সুন্দরভাবে আঁকা হয়েছে নানা শিক্ষামূলক চিত্র, বাংলা-ইংরেজি বর্ণমালা, ছবিসহ ছড়া, কবিতা, কার্টুন, নানা পশু-পাখি, মাছ, ফল-ফুল, শরীরের নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের নাম সবই রয়েছে শিশুশ্রেণির দেয়ালজুড়ে। এছাড়া বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আঁকা নানান রঙের ছবি স্থান পেয়েছে সেখানে। যা অন্য শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করছে। স্কুলের বারান্দায় রকমারি ডিজাইনের  আকর্ষণীয় সারি সারি ঝুলন্ত টবে নানাজাতের ফুলগাছ ও স্কুলচত্বরের ছোট্ট জায়গাতেও ঘেরাও দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ফুলের বাগান। এসব বাহ্যিক বহুমুখী সৃজনশীল চিত্র বিদ্যালয়টিকে আলাদা বৈশিষ্ট্যময় করে তোলেছে।

সব মিলিয়ে থানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে নিঃসন্দেহে একটি আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয় বললে কোনো ভুল হয় না। পরিদর্শনকালে এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বললে ছোট শিশুরা এখানে পড়াশোনা করতে পেরে খুবই উত্সাহ প্রকাশ করে ভালো লাগার কথা জানায়।

বিদ্যালয়টির সুনামের কারণেই এখানে সন্তান ভর্তি করাতে দারুণ আগ্রহী বলে স্বীকার করেন অভিভাবকরা। সীতাকুণ্ডের ভোলাগিরি এলাকার বাসিন্দা গৃহবধূ মনি মজুমদার জানান, তাঁর বাড়ির পাশে আরো প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। কিন্তু তাঁর দুই মেয়ে অহনা ও অয়ন্তিকে সেখানে ভর্তি না করিয়ে তিনি থানা প্রাইমারি বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছেন। কারণ, এ বিদ্যালয়ে পড়াশোনার মান অত্যন্ত ভালো। এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগই নেই। তাঁর বিশ্বাস এখান থেকে তাঁর সন্তানরাও ভালো ফলাফল নিয়ে বের হয়ে আসবে।

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. রফিকুল আলম বলেন, ‘এখানে পড়াশোনার পরিবেশ এককথায় চমৎকার। সম্প্রতি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ইলিয়াস হোসেনও এটি পরিদর্শনে এসে মুগ্ধ হন। তিনি শিক্ষার পরিবেশের খুবই প্রশংসা করেছেন।’

বিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র শামীম আল-রাজী বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব। তাঁর মা এ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। তিনি বলেন, ‘এখানকার শিক্ষকরা সবাই খুবই আন্তরিকভাবে পাঠদান করেন। সবার সম্মিলিত চেষ্টায় স্কুলটির আজকের এ অবস্থান। তবে এ বিদ্যালয়ের পশ্চিম পার্শ্বস্থ দ্বিতল ভবনটির অবকাঠানো কিছুটা নড়বড়ে হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে এটি কেঁপে উঠে। তাই এটি ভেঙে পুনঃনির্মাণ করা খুবই জরুরি।’ তাহলে পরিবেশ আরো অনেক সুন্দর ও শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ হবে বলে তিনি মনে করেন।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক দীপক ভট্টাচার্য বলেন, ‘ভালো ফলাফলের পেছনে স্কুল কমিটি, শিক্ষক, শিক্ষা অফিসার, ইউএনও, এসি ল্যান্ডসহ সংশ্লিষ্ট সবার অবদান আছে। তাঁরা আমাদের স্কুল বারবার ভিজিট করে দিক নির্দেশনা দেন। আমরা তা বাস্তবায়ন করি। সবার সার্বিক সহযোগিতা ও শিক্ষকদের আন্তরিকতাতেই স্কুলের শিক্ষা ও উন্নয়ন অব্যাহত আছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘ইতোমধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক, সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সীতাকুণ্ড সহকারী কমিশনার (ভূমি), সহকারী জেলা  প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, পিটিআই চট্টগ্রামের সুপারিনটেনডেন্ট, ইন্সট্রাক্টর ও সীতাকুণ্ড উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে বিদ্যালয়টিতে পরিদর্শনে এসে পড়াশোনার মান ও শিক্ষা-কার্যক্রম সন্তোষজনক বলে উল্লেখ করেছেন। এসব আমাদের বাড়তি প্রেরণা দিচ্ছে। এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে চাই।’

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুলতানা ইয়াসমিন বলেন, ‘২০০৭ খ্রিস্টাব্দের ২৭ মে আমি যখন যোগদান করি তখন এ বিদ্যালয়ের অবস্থা ছিল খুবই জরাজীর্ণ। শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষের স্বল্পতা, আসবাবপত্রের তীব্র সংকট, ছিল না বিদ্যুৎ। এতসব সংকটের মধ্যেও পড়ালেখার ব্যাঘাত ঘটতে দিইনি। একটানা এক দশকের বেশি সময় ধরে উপজেলা পর্যায়ে সবচেয়ে ভালো ফল লাভ করে আসছি। ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহ উপলক্ষে ২২০৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে বিদ্যালয়টি চট্টগ্রাম জেলাপর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচিত হয়।’

তিনি বলেন, ‘এভাবে ভালো ফলাফলের পেছনে আমাদের অনেক পরিকল্পনা কাজ করে। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় গতিশীলতা এবং  আরো  মনোযোগী করে তুলতে অভিভাবকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের জন্য নিয়মিত আয়োজন করি মা ও  অভিভাবক সমাবেশ। শ্রেণিপাঠদান ফলপ্রসূ করার জন্যে সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও সমাধান এবং মানসম্মত-শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্যে শিক্ষকদের নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয় পাক্ষিক সভা। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত হয়েছে কুইজ ক্লাব, বিতর্ক ক্লাব, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। প্রতিটি দিবস পালন ও এর তাৎপর্য গুরুত্বের সাথে শিক্ষার্থীদের বোঝানো হয়। তাদের ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করার জন্যে করা হয়েছে আলোকিত আচরণ সংগ্রহশালা এবং  বিখ্যাত ব্যক্তিদের  উক্তি ও নীতিবাক্য লিখন প্রভৃতি। এ ছাড়া  সরকারি সকল প্রকার নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্যে নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয় স্টাফ মিটিং। সরকারি সহযোগিতা, এসএমসি, পিটিএ, অভিভাবক, স্থানীয় হিতাকাঙ্ক্ষীদের আন্তরিকতায় বিদ্যালয়ের অনেক সমস্যা দূর হয়েছে। তবে অতিরিক্ত ভর্তির চাপ ও ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা দিনদিন বাড়তে থাকায় শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষের সংকট রয়েই গেছে। এখনও পার্শ্ববর্তী হাইস্কুল থেকে শ্রেণিকক্ষ ধার নিয়ে পরীক্ষাকার্যক্রম সম্পন্ন করতে হয়। এসব সঙ্কটের লাঘব হলে ভবিষ্যতে আরো ভালো ফল লাভ করতে পারবো।’

উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো. নুরুচ্ছাফা বলেন, ‘থানা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টির পড়াশোনার মান, শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষকদের আন্তরিকতা সব কিছুই চমৎকার। এ কারণে তারা ধারাবাহিকভাবে ভালো ফলাফল করে যাচ্ছে। থানা ছাড়িয়ে জেলা পর্যায়েও সেরা প্রাথমিক বিদ্যালয় হয়েছে এটি। এখানে শিক্ষার্থীদের বহুমুখী জ্ঞানের অধিকারী করতে তুলতে নানামুখী পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছেন শিক্ষকরা। এসব কারণে আমরা তাদের সার্বিক পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করি।’

 

মন্তব্য