kalerkantho


দেওদিঘি কে এম উচ্চ বিদ্যালয়ের গৌরবময় ৬৪ বছর

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০




দেওদিঘি কে এম উচ্চ বিদ্যালয়ের গৌরবময় ৬৪ বছর

রবীন্দ্রনাথের কথাটি সত্য হলো। কবি সেই কবে বলেছিলেন, ‘ওরে প্রাণের বাসনা, প্রাণের আবেগ রুধিয়া রাখিতে নারি’। না। রোধ করে রাখার নয়। ঠিকই উদ্ভাসিত। ৬৪ বছর পর হলেও এলো ফিরে। এতটা বছর মিলনমেলা না হওয়ার করুণ ফসল বয়ে গেল। কত প্রতিষ্ঠানে এমন হরদম হচ্ছে। কত রথী-মহারথী তাতে অংশ নিচ্ছেন। তবে ঐতিহ্যবাহী দেওদিঘি কে এম উচ্চ বিদ্যালয়ের হলো না। অপূর্ব প্রকৃতির কোলে পোড়ামনে পড়ে রইলো। তবে এবারের মতো পুনর্মিলনী বছর বছর হবে, সকলে মিলাবে-মিলিবে-এমন আশা সবার।

পশ্চিম সাতকানিয়ায় সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠিত দুটি বিদ্যালয়ের একটি দেওদিঘি কে এম উচ্চ বিদ্যালয়। মাদার্শা-এওচিয়া এই দুই ইউনিয়নের একমাত্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এটি ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৯৫৬ সনে প্রথম সরকারি স্বীকৃতি লাভ করে।

বিদ্যালয়ের নিকটবর্তী ভূমি অফিসের তত্কালীন ভূমি কর্মকর্তা স্থানীয় কয়েকজন বিদ্যুোৎসাহীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় বিদ্যালয়টি স্থাপন করেন। স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক মরহুম মুন্সি নজির আহমদ চৌধুরী দেওদিঘি কে এম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। পরবর্তী পর্যায়ে জমি দান করেন দানু মিয়া সওদাগর, ফোরক আহমদ, হাজি নুর বকসু, ফয়েজুর রহমান, সিরাজউদ্দীন, মোক্তার আহমদ, আশুতোষ দেব, সুধাংশু বিমল দাশ, প্রফুল্ল কুমার প্রমুখ।

বিদ্যালয়টি ছিল প্রথমে মাটির ঘর। ১৯৯১ সনে ঘূর্ণিঝড়ে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়। এরপর থেকে পাকা ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিদ্যালয় তহবিল, জনগণের সহযোগিতায় একটি সরকারি ভবনসহ বর্তমানে দুটি পাকা ও দুটি আধা পাকা ভবন আছে। পর্যাপ্ত টয়লেট ও পানীয় জলের সুব্যবস্থা রয়েছে। বিদ্যালয়ে সুদীর্ঘকাল থেকে ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত দুটি করে শাখা এবং নবম-দশম শ্রেণিতে মানবিক, বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা চালু আছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর ড. আলমগীর মোহাম্মদ সিরাজ উদ্দীন স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর কিছুদিন অত্র প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতায় নিয়োজিত ছিলেন। এছাড়া এখানে শিক্ষকতা করেছেন প্রয়াত রানা রঞ্জন সেনগুপ্তের মতো সর্বজন শ্রদ্ধেয় শিক্ষক, প্রয়াত নিখিল রতন দাশের মতো জ্ঞানী ব্যক্তি, মরহুম আহমদ হোছাইন ভুলুর মতো গুণীজন।

দেওদিঘি কে এম উচ্চ বিদ্যালয়ে বর্তমানে প্রায় ৮০০ ছাত্রছাত্রীকে প্রায় ১৫জন শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়মিত পাঠদান করে আসছেন। বিদ্যালয়ে লেখাপড়ার মান ও এসএসসি ফলাফল সন্তোষজনক। এতে সহ পাঠক্রমিক কার্যাবলি, স্কাউটিং যথারীতি চালু আছে। জোনাল ফুটবল খেলায় অনেকবার বিদ্যালয়টি কৃতিত্ব লাভ করেছে।

দেওদিঘি কে এম উচ্চ বিদ্যালয়ে পাকিস্তান আমলে দেশের প্রথম অস্থায়ী প্রেসিডেন্টসহ অনেক সরকারি পদস্থ সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের আগমন ঘটে। বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন পদে দেশে ও বিদেশে কর্মরত আছেন।

কিংবদন্তির সঙ্গে

চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া উপজেলার পশ্চিমভাগে দেওদিঘি কে এম উচ্চ বিদ্যালয়ের অবস্থান। এলাকাটির অনেক ঐতিহাসিক তাত্পর্য রয়েছে। প্রাচীন হাট-বাজার, বিচারালয়, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অফিস/সংস্থার দপ্তর প্রভৃতি মিলে এলাকাটির ব্যাপক পরিচিত সকলের কাছে। চট্টগ্রাম-সাতকানিয়া হয়ে বাঁশখালী গমনাগমন হতো এই স্কুলের পাশ দিয়ে। এখনো এটি চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান আন্ত:উপজেলা সড়ক। এই উচ্চ বিদ্যালয়ের সাথে জড়িয়ে আছে একটি দিঘির নাম। যেটিকে ঘিরে আছে অনেক কিংবদন্তি। এটি ‘দেও’ মানে জিন-পরিরা খনন করেছে, তিন পাশে তিন কুলা মাটি ফেলেছে বলে তিনটি পাড় আর অন্য পাড়টি খোলা এমন কিংবদন্তি শতাব্দীর পর শতাব্দী চালু আছে। সেখানেই দাঁড়িয়ে নতুন এক কিংবদন্তী- ‘দেওদিঘি কে এম উচ্চ বিদ্যালয়’।

অপূর্ব প্রকৃতির কোলে অবস্থান

দেওদিঘি কে এম উচ্চ বিদ্যালয় এর অবস্থান অপূর্ব প্রকৃতির কোলে। ছায়া সুনিবিড়, পাখি ডাকা পরিবেশে এটির অগ্রযাত্রা চলমান। পাশে আছে বিশাল এক দিঘি। এখানকার বিপুল জলরাশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে। এছাড়া আশে-পাশে সবুজের বিপুল সমারোহ, বিরাট সব বটবৃক্ষ মিলে এক অনিন্দ্য সুন্দর পরিবেশ রচনা করেছে। যা এখানকার প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের স্মৃতিতে সবসময় উজ্জ্বল থাকে।

৬ অক্টোবর প্রাণের মেলা

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার ঐতিহ্যবাহী দেওদিঘি কে এম উচ্চ বিদ্যালয়ের ৬৪ বছর পূর্তি উদযাপন ও পুনর্মিলনী আগামী ৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে। পুনর্মিলনীতে প্রত্যেক ছাত্র-ছাত্রীর জন্য রেজিস্ট্রেশন খরচ ৫০০ টাকা। এতে ২৫০০ ছাত্রছাত্রী অংশগ্রহণ করতে পারেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়। পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি। এ উপলক্ষে আয়োজিত দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার মধ্যে রয়েছে আনন্দ র্যালি, আলোচনাসভা, স্মৃতিচারণ, আনন্দ আড্ডা, ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সংবর্ধনা, মেজবান ইত্যাদি।

প্রাক্তনরা কে কী বলছেন

দেওদিঘি কে এম উচ্চ বিদ্যালয়-এর প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীরা আছেন বিশ্বময় ছড়িয়ে। তাঁরা হূদয়ে ধারণ করে আছেন এই বিদ্যালয়কে। আসন্ন পুনর্মিলনী ও ৬৪ বর্ষপূর্তি উপলক্ষে এসএসসি ১৯৯১ ব্যাচের ছাত্র এবং বাংলাদেশ জুট গুড্স এক্সপোটার্স অ্যাসোসিয়েশনের ডিরেক্টর মুরিদুল আলম চৌধুরী বলেন, ‘এই স্কুল আমাদের ক্যারিয়ারের সূতিকাগার। এখান থেকে নিয়েছি জীবন সাজানোর নানা পাঠ। আমরা এখান থেকে বিশ্বময় ছড়িয়ে আছি। এখন এই প্রিয় প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার পালা। সৌভাগ্য এই যে, প্রাক্তনরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিপুল সাড়া দিচ্ছেন।’

‘৮৮ ব্যাচের ছাত্র এবং বিশিষ্ট উদ্যোক্তা মোস্তফা ইকবাল চৌধুরী মুকুল বলেন, ‘এই প্রতিষ্ঠানের প্রতি আমাদের আত্মার সম্পর্ক। এখন এই সম্পর্কটাকে নিবিড় বন্ধনে আনতে আমরা একটা সুদৃঢ় প্ল্যাটফরম রচনা করেছি। যার নাম-দেওদিঘি কে এম উচ্চ বিদ্যালয় প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রী পরিষদ।’

‘৯৩ ব্যাচের ছাত্র এবং বিশিষ্ট আইটি এক্সপার্ট মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন বলেন, ‘আমরা পুনর্মিলনীর কাজে নেমেই সকলের বিপুল সহযোগিতা ও উৎসাহ পাচ্ছি। এ থেকেই বোঝা যায়, এটি অব্যাহত রাখতে হবে।’ একই ব্যাচের ছাত্র এবং এলজিইডির সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী মো. হাছান আলী বলেন, ‘আমরা যে যেখানে থাকি না কেন, একতাবদ্ধ হয়ে আছি। আমরা শক্ত বাঁধন গড়ে তুলেছি।’

‘৯৫ ব্যাচের হাবিবা নাজনীন চৌধুরী মুন্নী বলেন, ‘অনেক বছর ধরে অপেক্ষা করেছিলাম। এই অপেক্ষার দিন শেষ দেখতে পেয়ে আমরা আনন্দিত।’

২০০৮ ব্যাচের আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী বলেন, ‘আসন্ন পুনর্মিলনী সিনিয়র-জুনিয়রদের এক জায়গায় এনেছে। আমরা অগ্রজদের অবস্থান ও উৎসাহ দেখে আনন্দিত ও উৎসাহিত।’

২০০৭ ব্যাচের জুনাইদ বিন হোছাইন বলেন, ‘এই প্রিয় প্রতিষ্ঠানকে আরো অনেক দূর এগিয়ে নিতে আমরা নতুন করে স্বপ্ন দেখছি। অনেক উদ্যোগও দেখছি, যেসব আমাদের খুব আশান্বিত করছে।’

এখন সময় পুরনোকে নতুন করে ফিরে পাওয়ার। নতুনকে পুরনোর সমন্বয়ে আরো এগিয়ে নেওয়ার দিন সমাগত। ৬ অক্টোবর আসন্ন পুনর্মিলনীকে ঘিরে সেজে উঠছে ঐতিহ্যমণ্ডিত বিদ্যাপীঠ দেওদীঘি কে এম উচ্চ বিদ্যালয়। এখান থেকে আরো সৌরভ ছড়াবে বিশ্বময়-এই প্রত্যাশা সকলের।

প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন : ফজলুর রহমান, এসএসসি ১৯৯৫ ব্যাচ দেওদিঘি কে এম উচ্চ বিদ্যালয় এবং সহকারী রেজিস্ট্রার, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)।



মন্তব্য