kalerkantho


সীতাকুণ্ডের ‘লাল পেয়ারা’

এই পেয়ারার বাইরের রং সবুজ বা হলদে হলেও ভেতরের অংশ লালচে। স্বাদও ভিন্ন। পাশাপাশি অন্য পেয়ারায় ভিটামিন সি থাকলেও সীতাকুণ্ডের লাল পেয়ারায় ভিটামিন সি-এর সঙ্গে ভিটামিন এ রয়েছে বলে জানান কৃষিবিদরা।

সৌমিত্র চক্রবর্তী, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)   

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



সীতাকুণ্ডের ‘লাল পেয়ারা’

সীতাকুণ্ডের লাল পেয়ারার জনপ্রিয়তা এখন দেশজুড়ে। আকর্ষণীয় রং ও স্বাদের কারণে এ পেয়ারা সর্বত্র সমাদৃত। চাহিদাও ব্যাপক। ফলে এই মৌসুমে লাল পেয়ারা বিক্রি করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন এখানকার হাজার হাজার কৃষক। যা অনুপ্রাণিত করেছে কৃষি বিভাগকেও।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বর্ষা মৌসুমে সীতাকুণ্ডে উত্পাদিত অন্যতম ফল হচ্ছে পেয়ারা। সমগ্র উপজেলায় পেয়ারাচাষ হয়। তবে পৌরসদর চন্দ্রনাথ পাহাড় ও বাড়বকুণ্ড পাহাড়ে পেয়ারার চাষ সর্বাধিক। এখানে উত্পাদিত পেয়ারাকে বলা হয় ‘লাল পেয়ারা’। আবার আকর্ষণীয় রং ও স্বাদের কারণে এই পেয়ারা ‘বাংলার আপেল’ নামেও খ্যাত।

কৃষিবিদদের মতে, সাধারণ পেয়ারার বাইরের রং সবুজ আর ভেতরের মাংসল অংশ সাদা রংয়ের হয়ে থাকে। কিন্তু সীতাকুণ্ডের লাল পেয়ারার বাইরের রংটা সবুজ বা হলদে হলেও ভেতরের মাংসল অংশ লালচে। ফলে স্বাদও ভিন্ন। যা সাধারণ মানুষের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতাও বাড়িয়েছে। পাশাপাশি সবুজ রংয়ের কারণে অন্য পেয়ারায় ভিটামিন সি থাকলেও সীতাকুণ্ডের লাল পেয়ারায় ভিটামিন সি এর সাথে রয়েছে ভিটামিন এ। যা স্বাস্থ্যের জন্য অধিক উপকারী। ফলে এলাকার কৃষকরা এই পেয়ারাকে আপেলের সঙ্গে তুলনা করে বাংলার আপেল নামে অভিহিত করেছেন।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন স্থানে মোট ৯৫ হেক্টর পাহাড়ি ভূমিতে লাল পেয়ারার চাষ করেছেন ৯৫২ জন কৃষক। এবার ফলনও হয়েছে বেশ ভালো। কৃষকরা গত এক মাস আগে থেকে নিজের ক্ষেতের পেয়ারা বিক্রি শুরু করেছেন।

সরেজমিনে পৌরসদর চন্দ্রনাথ পাহাড় ও বাড়বকুণ্ড পেয়ারা বাগানে দেখা যায়, দুই পাহাড়েই গাছে গাছে থোকা থোকা পেয়ারা ঝুলছে। চাষিরা পেয়ারা তুলে প্রতিদিন স্থানীয় বাজারে নিয়ে বিক্রি করছে।

চন্দ্রনাথ পাহাড়ের এক পেয়ারাচাষি মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘আমরা বংশানুক্রমে কয়েক যুগ ধরে পেয়ারা চাষ করে আসছি। এখানে পেয়ারার ফলনও বেশ ভালো। এবারও ফলন ভালো হয়েছে। আমরা গাছ থেকে পেয়ারা তুলে ঝুড়িতে বা ঝাঁকা (স্থানীয় ভাষায় লাই) করে বিক্রি করছি। এক ঝাঁকায় ২২-২৫ কেজি পেয়ারা ধরে। এই এক ঝুড়ি পেয়ারা পাইকারি দরে ৪-৫শ টাকায় বিক্রি হয়। আর পাইকারি ব্যবসায়ীরা আমাদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে প্রতিকেজি ৫০-৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেন।’

এই চাষি আরো বলেন, ‘এক মৌসুমে শুধু পেয়ারা বিক্রি করেই আমি দেড় থেকে দুই লাখ টাকা আয় করি। উপজেলার বাড়বকুণ্ড পাহাড়ের সুপরিচিত পেয়ারাচাষি মো. শাহীন বলেন, ‘আশপাশের প্রত্যেক উপজেলায় পেয়ারাচাষ হয়। কিন্তু আমাদের লাল পেয়ারা গর্ব করার মতোই। এগুলো দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি খেতেও সুস্বাদু। এ কারণে এ মৌসুমে যাঁরা সীতাকুণ্ডে বেড়াতে আসেন তাঁরা সবাই কিছু না কিছু পেয়ারা কিনে খান এবং নিয়ে যান।’

শাহীন বলেন, ‘এই পেয়ারা গুণে আপেলের চেয়েও ভালো। তাই আমরা বাংলার আপেল বলি।’

প্রতিবছর এই পেয়ারা বিক্রি করে তিনিও কয়েক লাখ টাকা লাভ করেন জানিয়ে চাষি শাহীন আরো বলেন, ‘আমি এবার প্রতি ঝাঁকা পেয়ারা সাড়ে ৪ শ থেকে সাড়ে ৫ শ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেছি।’

ইতোমধ্যে তিনি ৪০ হাজার টাকার পেয়ারা বিক্রি করেছেন। স্থানীয় বাজারে এখন লাল পেয়ারা প্রতি কেজি ৫০-৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আগামী আরো এক-দেড় মাস পেয়ারা বিক্রি করা সম্ভব হবে। এতে তিনি আরো দেড় লাখ টাকার মতো পেয়ারা বিক্রি করতে পারবেন বলে ধারণা করছেন।

এ দুই  চাষি জানান, স্বাদে ও গুণে অতুলনীয় সীতাকুণ্ডের লাল পেয়ারা এখন পাইকারদের হাত ধরে ফেনী, কুমিল্লা হয়ে রাজধানীতেও চলে যাচ্ছে। আত্মীয়-স্বজনদের মাধ্যমে যাচ্ছে অন্যান্য অঞ্চলেও।

সীতাকুণ্ড কৃষি বিভাগের উপ-সহকারী কৃষি ও উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা সুভাষ চন্দ্র নাথ বলেন, ‘পেয়ারাচাষে সীতাকুণ্ডের ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। এ বছর মোট ৯৫ হেক্টর পাহাড়ি ভূমিতে লাল পেয়ারার চাষ করেছেন ৯৫২ জন কৃষক। এছাড়া গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে আরো কিছু মানুষ পেয়ারাচাষ করে থাকেন। এই পেয়ারা পাইকারদের হাত ধরে কুমিল্লা, ফেনীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যায়।’

এ কৃষি কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘অন্য পেয়ারায় শুধুমাত্র ভিটামিন সি থাকে। কিন্তু বাংলার আপেল খ্যাত সীতাকুণ্ডের লাল পেয়ারায় লালচে মাংসল অংশের কারণে অতিরিক্ত হিসেবে আছে ভিটামিন এ’ও। ফলে এটি অধিক স্বাস্থ্যকর।’

তিনি বলেন, ‘এবার পেয়ারার ফলন গত বছরের চেয়ে ভালো হয়েছে। ব্যাপক চাহিদা থাকায় প্রতিবছর এই পেয়ারা বিক্রি করে অনেকেই লাখপতি হয়ে থাকেন।’ এবারও তাঁরা ভালো লাভবান হবে বলে মনে করেন এ কৃষিবিদ।

 

 



মন্তব্য