kalerkantho


‘অনুকরণই সাংস্কৃতিক অঙ্গন গিলে খাচ্ছে’

১ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



‘অনুকরণই সাংস্কৃতিক অঙ্গন গিলে খাচ্ছে’

খুলনার মেয়ে নাহিদ নেওয়াজ পপি। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজতত্ত্ব বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্রী। পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন স্টেজ শো ও টেলিভিশনে আবৃত্তি, উপস্থাপনা, অভিনয় নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। বিজ্ঞাপনে কণ্ঠও দেন। পাশাপাশি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের দায়িত্বে আছেন। সম্প্রতি তাঁর ‘পরিচয়’ নামে আবৃত্তির অ্যালবাম বের  হয়েছে। লিখেছেন : মোবারক আজাদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর পরই নাহিদ ও তাঁর বন্ধুরা মিলে ‘উন্মীলন শিল্প ও সাহিত্য ভুবন’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন করেন। এখানে চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন সংগঠন থেকে প্রশিক্ষক এসে ক্লাস নিতেন। তারপর তাঁরা ভাবলেন, নিজেরাই কিছু করার। সে লক্ষ্যে নাহিদ শহরের ‘শব্দ নোঙ্গর’ আবৃত্তি সংগঠনে আবৃত্তিতে হাতেখড়ির মাধ্যমে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড শুরু করেন এবং আবৃত্তি অঙ্গনে নিজের দক্ষতা প্রমাণ করেন। এখান থেকে উপস্থাপনাও শুরু করেন। পাশাপাশি নিজেদের গড়া সংগঠনটি ছাড়াও বিভিন্ন সংগঠনের বিভিন্ন কর্মশালায় তিনি আবৃত্তি ও উপস্থাপনার ওপর ক্লাস নেন।

জানালেন, চার ভাইবোনের মধ্যে নাহিদ পরিবারের দ্বিতীয় সন্তান। বাবা মোস্তফা ঢালী ও মা সুলতানা বেগম সব সময় পড়াশোনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করেছেন। স্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণি থেকেই লেখালেখি ও আবৃত্তি শুরু। তারপর খুলনা ডিবেটিং সোসাইটি থেকে সাংগঠনিকভাবে বিতর্ক শুরু করেন এবং জাতীয় বির্তক প্রতিযোগিতায় তিনি শ্রেষ্ঠ বক্তার পুরস্কার পান। অন্যদিকে শিশু একাডেমির বাৎসরিক রচনা প্রতিযোগিতায় তিনি টানা তিনবার চ্যাম্পিয়ন হন। ক্লাস নাইনে পড়ার সময় স্কুলশিক্ষক খাদিজার অনুপ্রেরণায় খুলনা লেখিকা সংঘে যুক্ত হন নাহিদ। লেখালেখি তাঁর ভালো লাগে। তখন গানের প্রতিও আগ্রহ ছিল। তবে পরিবার চায়নি বলে সেভাবে গান করা হয়নি। শেষে বন্ধুদের সহযোগিতায় খুলনা গণসংগীত ভবনে রবীন্দ্র সংগীত শেখা শুরু করেন। এখনও রবীন্দ্র সংগীত নিয়মিত করার চেষ্টা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর সংগীতের গুরু চট্টগ্রাম বেতারের সৈয়দুল ইসলামের কাছ তিনি তালিম নেন।

নাহিদ এসএসসি পাস করেন খুলনার এইচ আর এইচ প্রিন্স আগাখান মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ও এইচএসসি করেন খুলনা কলেজ থেকে। কলেজে পড়ার সময়ও আবৃত্তিতে সময় দিয়েছেন।

বর্তমানে তিনি টেলিভিশন, মঞ্চ ও বিভিন্ন স্টেজ প্রোগ্রামে আবৃত্তি ও উপস্থাপনা করেন। নানা ধরনের বিজ্ঞাপনেও কণ্ঠ দিচ্ছেন। নাটকের দল ‘থিয়েটার ওয়ার্কশপ চট্টগ্রাম’-এর প্রযোজনায় তিনি তিনটি নাটকের মূল চরিত্রে কাজ করেছেন। তিনি বাংলাদেশ বেতার রাঙামাটি কেন্দ্রে অনুষ্ঠান উপস্থাপক হিসেবে এ বছর জুন থেকে নিযুক্ত হয়েছেন।

চলতি বছরই ‘পরিচয়’ নামে তাঁর একটি আবৃত্তির অ্যালবাম বের হয়েছে। ক্যাম্পাসের কেন্দ্রীয় সব অনুষ্ঠানের উপস্থাপনাও নাহিদ করতেন। সাংস্কৃতিক সংসদের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। এ সংসদে  বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া প্রায় ৮০/৯০ জন শিক্ষার্থী আছেন। তিনি চট্টগ্রাম নগরীর আস্থা একাডেমির সাংগঠনিক সম্পাদক। উন্মীলনে প্রশিক্ষক হিসেবে ক্লাস নেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিশেষ করে শিশু বিভাগের আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় বিচারক হিসেবে কাজ করতে বেশি আনন্দ পান।

বিভিন্ন একাডেমিক গবেষণামূলক কাজে নাহিদের উপস্থিতি রয়েছে। জনজীবন ও পরিবেশ বিষয়ক গবেষণায় তাঁর আগ্রহ বেশি। সম্প্রতি দুটি ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্সে তিনি গবেষণা প্রবন্ধ পাঠ করেন। একটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ও অন্যটি এশিয়াটিক সোসাইটিতে।

সাংস্কৃতিক জগতে কাজের স্বীকৃতি কী পেয়েছেন?-জানতে চাইলে নাহিদ কালের কণ্ঠকে জানান, স্কুল থেকে কলেজ পর্যন্ত সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় বরাবরই তিনি অদ্বিতীয় হতেন। লেখিকা সংঘে লেখালেখি প্রতিযোগিতায়ও পুরস্কার পান। কিন্তু একটা সময় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ ছেড়ে দেন।

তিনি সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কোনো প্রতিযোগিতায় বিশ্বাসী নন। কেননা, এ ধরনের প্রতিযোগিতায় একধরনের অহংবোধ ও দ্বান্দ্বিকতার জন্ম দেয়, সঙ্গত কারণে তিনি কোনো প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণও করেন না। কোনো কোনো সময় প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ে যেতে হয়। এ বছর প্রথম আলো বন্ধুৃসভার বন্ধু সম্মেলনে আবৃত্তিতে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার পান। শাটল ট্রেনে ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করার ঘটনায় সাহসী ও প্রতিবাদী ভূমিকা রাখার কারণে বন্ধুসভার সাবেক সভাপতি ‘নিরাপদ নগরী ও নিরাপদ নারী’ বিষয়ক একটি অনুষ্ঠানে বন্ধুসভার সভাপতি, ফলিত ও পরিবেশ রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সুমন গাঙ্গুলি তাঁকে ‘সাহসিকা জননী’ উপাধিতে ভূষিত করেন। এটা থেকেও তিনি অন্যয়ের প্রতিবাদ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অনুপ্রেরণা পেয়েছেন বলে জানান।

সামনে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে কী ধরনের কাজ করার ইচ্ছা আছে জানতে চাইলে নাহিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সংস্কৃতির সুস্থধারা বজায় রাখতে তিনি বদ্ধপরিকর। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বাচ্চাদের নিয়ে কাজ করার প্রবল ইচ্ছা।’ তিনি অত্যন্ত দুঃখের সাথেই বলেন, ‘বর্তমানে সাংস্কৃতিক চর্চায় অনুকরণ বেড়ে গেছে, যা সৃজনশীলতার পরিপন্থী। ফলে বলা যায়, অনুসরণের চাইতে অনুকরণ বা নকলই আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে গিলে ফেলছে। তবে এটা না করে নিজে থেকে কিছু সৃষ্টি করার প্রচেষ্টায় আমাদের সজাগ থাকা উচিত।’

চট্টগ্রামের সংস্কৃতি চর্চা নিয়ে নাহিদ জানালেন, সুস্থ ধারার সংস্কৃতি চর্চায় প্রয়োজন সুস্থ মানসিকতার মানুষ। দুঃখজনক হলেও বলতে হয়, বর্তমানে সংস্কৃতি চর্চার মানুষগুলো দিন দিন অসুস্থ মানসিকতায় পরিণত হচ্ছে।

তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক চর্চা প্রসঙ্গে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়েই সব থেকে সুস্থ ধারার সাংস্কৃতিক চর্চা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কর্মীদের যথাযথ সম্মান ও মূল্যায়ন করার প্রবণতা কম। আমরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে আছি তারা সুস্থ ধারার সাংস্কৃতিক চর্চা বজায় রাখতে সর্বদাই সচেষ্ট।’ তিনি আবৃত্তি, উপস্থাপনা, নাটক ও সংগীত নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চান। যেসব সংগঠনে তিনি যুক্ত সেসব সংগঠনের সুস্থ ধারার সাংস্কৃতিক চর্চার প্রত্যাশা করেন। কর্মজীবনে শিক্ষকতা তাঁর প্রথম পছন্দ।

নাহিদের বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হানিফ মিয়া বলেন, ‘বিভিন্নমুখী সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও শিক্ষা-গবেষণায় তাঁর যে ভারসাম্যমূলক পদচারণা তা আমাকে সত্যিই বিস্মিত করে। দুটো বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিয়ে দক্ষতার যে স্বাক্ষর সে রেখে যাচ্ছে তা সমসাময়িক শিক্ষার্থীদের মাঝে বিরল। এদিক থেকে আমি বলবো নাহিদ একজন দক্ষ, সফল ও সুস্থ মানসিকতার সাংস্কৃতিক কর্মী ও একই সাথে একজন সফল শিক্ষার্থীও বটে।

 



মন্তব্য