kalerkantho


বিদেশে নারীকর্মীদের আত্মমর্যাদার চাকরি এবং বীরের বেশে দেশে ফেরা

২৭ জুন, ২০১৮ ০০:০০



বিদেশে নারীকর্মীদের আত্মমর্যাদার চাকরি এবং বীরের বেশে দেশে ফেরা

বেগম রোকেয়া তাঁর ‘নিরীহ বাঙালি’ প্রবন্ধে বাঙালি নারী সম্পর্কে লিখেছেন, ‘তাহারা অতিশয় সুকুমারী ললিতা লজ্জাবতী লতিকা’। কিন্তু সেই বাঙালি নারী এখন আর পরনির্ভরশীল হয়ে থাকতে চান না। চাকরির প্রয়োজনে তাঁরা বিদেশেও পাড়ি দিচ্ছেন। উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় নারীরা আজ দেশ-বিদেশে নিজের কর্মসংস্থান তৈরি করতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখছেন। যা অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে সুদূরপ্রসারী প্রভাবও ফেলছে। ১৯৯১ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন প্রায় ৬ লাখেরও বেশি নারী। নারীরা বিদেশে গিয়ে তাঁদের ভাগ্য বদলাতে পেরেছেন। আবার সংখ্যায় কম হলেও অনেক নারী খালি হাতে দেশে ফিরে এসেছেন!

বিদেশ গমনেচ্ছুদের সার্বিক সহযোগিতা করছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের নারী শ্রমিকরা নিজের ভাগ্য বদলাতে চাকরি করতে বিদেশ যান। দেশের জন্য বয়ে আনেন বৈদেশিক মুদ্রা। আর অনেকে দালালের খপ্পরে পড়ে বিদেশে পাড়ি দিয়ে হয়েছেন নিঃস্ব। অনেকে শারীরিক, মানসিক এবং সম্ভ্রম হারানোর শিকারও হয়ে থাকেন। অভিবাসী নারী শ্রমিকের কর্মসংস্থান এভাবে নানা রকম চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে কাজ করতে হয়। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া নারীরা আরও সচ্ছল জীবন তৈরি করার তাগিদে সহায়-সম্পদ বিক্রি করে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে বিশেষ করে সৌদি আরবে তাঁদের রুজি-রোজগারের ব্যবস্থা করছেন।

অভিযোগ রয়েছে, গৃহশ্রমিকের কাজ নিয়ে যেসব নারী বিদেশে পাড়ি দেন তাঁদের কেউ কেউ কর্মস্থলে যৌন নিপীড়নেরও শিকার হন। তাঁরা শ্রমের মূল্য অনুযায়ী মজুরি পান না। অনেকে স্বেচ্ছায় বিদেশে পাড়ি জমালেও অনেক নারী পাচারের শিকার হন। পুরুষতান্ত্রিক এই পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় যতই নারী অধিকারের কথা বলা হোক না কেন দেশে-বিদেশে এবং পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তেই অনেক পুঁজিপতি নারীকে ভোগ্যপণ্য এবং ব্যবসায়িক পণ্য হিসেবে দেখেন। পুঁজিবাদী অর্থনীতি মুনাফা লাভের চিন্তা থেকে নারীর শ্রম এবং তাঁদের সৌন্দর্যকে মুনাফার অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে গণ্য করে। তাই সোনা-দানা, মাদকদ্রব্যের মতো নারীও পাচারের শিকার হন। দরিদ্র নারীরা প্রলোভনে পড়ে ভিটেমাটি বিক্রি করে বা ঋণ করে লক্ষ লক্ষ টাকা দালালদের হাতে তুলে দিয়ে বিদেশে পাড়ি জমান। গৃহকর্মী, হাসপাতালের আয়া, নার্স, গার্মেন্ট শ্রমিক বা অন্যান্য শ্রমজীবী পেশায়, এমনকি বিয়ের প্রলোভনে ফেলেও নারীদের পাচার করা হচ্ছে। এসব নারীকে যৌনকাজেও বাধ্য করা হয়। আর যাঁরা শ্রমিক হিসেবে কর্মরত তাঁরাও নানাভাবে শোষণের শিকার হচ্ছেন।

দেশে ফিরে আসা কয়েকজন নারীকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিদেশে অনেক গৃহকর্মীকে বন্দী জীবনযাপনও করতে হয়। তাঁদের ঘরের বাইরে একাকী যেতে দেওয়া হয় না। বাংলাদেশি অন্য শ্রমিকদের সাথে কথা বলতে দেওয়া হয় না। গৃহমালিকরা বাড়ির বাইরে যাওয়ার সময় ঘরে তালা লাগিয়ে যান যেন তাঁরা পালাতে না পারেন। তাঁদের দিয়ে অমানুষিক ও অতিরিক্ত কাজ করানো হয়। অনেকে শারীরিক নির্যাতনেরও শিকার হন এবং ইচ্ছা করলে চাকরি পরিবর্তন করতে পারেন না।

অভিবাসী নারী শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষায় শক্তিশালী অবলম্বন হিসেবে কাজ করতে পারে নারী মানবাধিকার ও ক্ষমতায়ন বিষয়ক সব কনভেনশন। নারীদের মানবাধিকার এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ার মতো সংকটজনক অবস্থা বিরাজ করছে প্রতিনিয়ত। অভিবাসী নারী শ্রমিকদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হওয়ার কারণে তাঁরা জেন্ডারভিত্তিক বৈষম্য আর সহিংসতার শিকার হন। যে দেশে অভিবাসী নারী শ্রমিক গৃহকর্মী হিসেবে যান তাঁদের সামাজিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ধারণা না থাকায় নানা সমস্যায় পড়েন এবং মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হন।

অভিবাসী নারী শ্রমিকরা তাঁদের উপার্জিত বৈদেশিক মুদ্রার ৯০ শতাংশ দেশে পাঠিয়ে দেন যা তাঁদের আয়ের প্রায় পুরোটা। এই নারীরা বিদেশে নিপীড়িত হওয়া খুবই অমানবিক। এই সমস্যা সমাধানে বিদেশ যাওয়ার আগেই একজন নারীকে মুঠোফোন দেওয়া উচিত যেন তিনি পরিবারের সাথে সর্বক্ষণ যোগাযোগ রাখতে পারেন। দূতাবাস থেকেও নিয়মিত নজরদারি করা উচিত। বিদেশে পাঠানোর আগে কর্মীকে যথাযথ প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তাঁদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা থাকা জরুরি।

গৃহকর্ম পেশায় বিদেশে পাড়ি দেওয়ার আগে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নারীরা স্বল্প সময়ের প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন। তাঁদের প্রশিক্ষণের মান ও মেয়াদ বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে। বিদেশগামী নারী শ্রমিকদের অধিক হারে নির্যাতনের অন্যতম কারণ হলো, দালালের মাধ্যমে বিদেশ গমন এবং অসচেতনতা। বিশেষ করে নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্তরাই নিজেদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য বিদেশে পাড়ি জমান। অনেক সময় তাঁরা বিদেশ যাওয়ার আগে লাভক্ষতি বিচার না করেই অপরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকেন। ফলে তাঁরা বিভিন্ন সময় নানা সমস্যা ও প্রতারণার মুখোমুখি হন। বিদেশে গমনের মাত্রা আগের তুলনায় বাড়ায় আমরা এই ধরনের ইস্যু সামনে দেখতে পাচ্ছি বেশি। বিদেশগামী নারীরা পুরুষের তুলনায় অরক্ষিত ও অসহায় অবস্থায় থাকেন। স্বাভাবিকভাবে যেকোনো পেশায় বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় নারীদের বিপদগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি।

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি নারী শ্রমিকের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালানোর খবর শুনতে পাওয়া যায়। একটি চক্র বাংলাদেশি নারীকর্মীদের ভালো কাজ দেওয়ার কথা বলে দুবাই পাঠায়। এসব নারী শ্রমিক নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করেন। তাঁরা ঠিকমতো খাবার পান না, নিয়মিত বেতন পান না। এমনকি অনেককে সম্ভ্রম লুণ্ঠনের হাত থেকে রক্ষা পেতে স্বেচ্ছায় কারাবরণ করে নিতে বাধ্য হন। স্বেচ্ছায় কারাবরণ ছাড়াও নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে প্রতিবছর হাজার হাজার নারী শ্রমিক শূন্যহাতে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন।

দীর্ঘদিন বিদেশে থাকা নারী শ্রমিকরা নিয়োগকর্তার হাতে কোনো না কোনো প্রকার নির্যাতনের শিকার হন। তাদের মধ্যে যাঁরা গৃহশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন তাঁরা বেশি মাত্রায় শোষণ, শারীরিক, মানসিক ও সম্ভ্রম হারানোর ঘটনার শিকার হন। গৃহকর্মে অন্তরীণ পরিবেশে থাকার কারণে নির্যাতনের অনেক ঘটনা প্রকাশিত হয় না। নির্যাতিত নারী শ্রমিকরা সব অন্যায় আচরণ সহ্য করতে বাধ্য হন।

নির্যাতনের শিকার হওয়ার যতগুলো কারণ রয়েছে এর মধ্যে আর একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হলো জীবনদক্ষতার ওপর প্রশিক্ষণ না থাকা। তাছাড়া এজেন্সি, লেবার উইংস ও দূতাবাসগুলোর গাফিলতির কারণেও বিদেশগামী নারীরা নির্যাতনের শিকার হন। ভাগ্যান্বেষণে অসচেতনতার কারণে লাভক্ষতির বিচার না করে দূরদেশে যাওয়ার অপরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করে নারীরা। ফলে বিভিন্ন সময় নানা সমস্যা ও প্রতারণার মুখোমুখি হন তাঁরা। অপরিকল্পিত উপায়ে ও নিয়ম না মেনে বিদেশে গেলে প্রতিটি ধাপেই ঝুঁকি রয়ে যায়। সঠিক ও প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবে নারীরা সঠিক পেশা নির্ধারণ এবং নিরাপদ বাসস্থান বা অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করতে পারেন না।

দিন যতই যাচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নারী শ্রম অভিবাসীর সংখ্যা বাড়ছে। অনেক অসহায়, দরিদ্র পরিবারের মেয়েই এখন বিদেশে শ্রমে নিযুক্ত হয়ে নিজ পরিবারে অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য আনতে পেরেছেন। নারী অভিবাসনের অগ্রগতি অবশ্যই আমাদের অর্থনীতিতে নতুন শক্তির সঞ্চার করছে। আমাদের দেশ থেকে সবচেয়ে বেশি নারী গৃহকর্মী পাঠানো হচ্ছে সৌদি আরবে। এ উদ্দেশ্যে সরকারি উদ্যেগে ৬৪টি সেন্টারে নারীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। গৃহকর্মী ভিসায় জনশক্তি রপ্তানি করে বাংলাদেশ। বর্তমানে সৌদি সরকার অভিবাসী নারী কর্মীদের নিরাপত্তায় ‘গেস্ট হাউস’ নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন যা নারীর কল্যাণে যাবতীয় সুরক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখবে। কর্মরত অভিবাসী নারীরা যেকোনো সমস্যায় পড়লে এই ভবনের সাহায্য নিয়ে ১৫ দিন সেখানে থেকে নিরাপত্তার সব ধরনের সাহায্য পাবেন। এমনকি চাইলে দেশে ফিরে আসার ব্যবস্থাও করে দেবে এই প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ সরকার বিদেশে কর্মসংস্থানে নিয়োজিত নারীদের হয়রানির ব্যাপারে সব ধরনের অধিকার প্রদানের ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয় জানিয়েছে। বাংলাদেশে বিদেশ থেকে আসা রেমিটেন্সের একটি প্রয়োজনীয় অংশ যুক্ত হয় নারী কর্মীদের বিশেষ ভূমিকায়। দেশের সার্বিক উন্নয়ন তথা নারী ক্ষমতায়নের পথ প্রশস্ত করতে বিদেশে নারীর কর্মসংস্থান একটি যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত। এক্ষেত্রে নারীবান্ধব নীতিমালা ও আইন প্রণয়ন করা হলে নারীরা নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে কাজের সুযোগ গ্রহণ করতে পারেন। সুতরাং তাঁদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা যেমন সরকারের দায়িত্ব একইভাবে বিদেশেও তাঁদের কর্মজীবন নির্বিঘ্ন করতে সেখানেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করাও বিশেষ জরুরি। নারী অভিবাসীদের বিদেশ গমন বৈধ, স্বচ্ছ ও নিয়মমাফিক হওয়া বাঞ্ছনীয়। নারীরা যাতে দালাল ও পাচারচক্রের ফাঁদে পড়ে নিজ দেশে হয়রানির শিকার হয়ে বিদেশে পাড়ি দিয়ে সেখানে বিপরীত ঘটনার মুখোমুখি না হন এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে সজাগ এবং সতর্ক থাকতে হবে। পেশাগত দক্ষতার প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি অভিবাসন দেশের ভাষা জানা ও জীবন দক্ষতার ওপর প্রশিক্ষণ নিয়ে নারীদের বিদেশ গমন করতে হবে যেন প্রতিদিন বিভিন্ন পরিবর্তনশীল অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারেন। গৃহকর্মের ভিসায় নারীদের নিয়োগদানের আগে সম্ভব হলে এজেন্সির মাধ্যমে নিয়োগকর্তা সম্পর্কে পূর্বে খোঁজ-খবর নিতে হবে। চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাঁদের জন্য কর্মঘণ্টা ও বেতন পর্যালোচনা করা উচিত। সব কর্মীর জরুরি প্রয়োজনে সাড়া দিতে এজেন্সি, লেবার উইংস ও দূতাবাসগুলো আন্তরিক হয়ে সেবা দেওয়া জরুরি।

আমরা চাই, আমাদের নারীকর্মীরা নিরাপদ উপায়ে এবং ন্যায্য খরচে বিদেশে যাবেন। আর আত্মমর্যাদা নিয়ে চাকরি শেষ করে বীরের মতো দেশে ফিরে আসবেন।

 ফেরদৌস আরা রীনু

জ্যেষ্ঠ শিক্ষক

সরকারি কলেজিয়েট স্কুল, চট্টগ্রাম



মন্তব্য