kalerkantho


শত বাধা পেরিয়ে
রাঙ্গুনিয়ার সনি নাথ

মায়ের শীতল পাটির টাকায় এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫

৩০ মে, ২০১৮ ০০:০০



মায়ের শীতল পাটির টাকায় এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫

সনি ডাক্তার হতে চায়। কিন্তু তার এই ইচ্ছাপূরণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দারিদ্র্য। প্রতিবেদনে

তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন : জিগারুল ইসলাম জিগার, রাঙ্গুনিয়া (চট্টগ্রাম)

 

সনি নাথ। রাঙ্গুনিয়ার একজন মেধাবী গরিব শিক্ষার্থী। উত্তর রাঙ্গুনিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় একমাত্র গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে সে। চতুর্থ শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় তার ভ্যানচালক বাবা মারা যাওয়ার পর দিনের পর দিন দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে এগিয়ে চলেছে সনি। বাবার মৃত্যুর পর মা শীতল পাটি বানিয়ে সংসার চালালেও মেয়েকে কখনো কোনো কাজ করতে দেননি। শেষপর্যন্ত মায়ের শীতল পাটি বানানোর টাকায় জীবনে বড় সাফল্য আসে সনি নাথের। বিদ্যালয়টিতে ৭ জন এ প্লাস পেলেও একমাত্র গোল্ডেন জিপিএ-৫ সনি নাথের দখলে। বড় হয়ে সনি ডাক্তার হতে চায়। কিন্তু মেয়ের ইচ্ছাটা তার মেধার কাছে কোনো ব্যাপার না হলেও দারিদ্র্য এই ইচ্ছেটা বাস্তবায়ন করতে দেবে কিনা তা নিয়ে মায়ের দুচোখে চরম হতাশা কাজ করছে।

সনি নাথের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দুর্গম সড়ক পার হয়ে টিন আর বেড়ার তৈরি ঘরটিতে ছাউনি ও বেড়ার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো অনায়াসে প্রবেশ করছে ঘরে। নড়বড়ে ছোট তিন কক্ষের এই ঘরে সামনের লম্বা বারান্দায় মা শীতল পাটি বানিয়ে সারা দিনরাত কষ্ট করে চলেছেন। আর ভেতরের একটি কক্ষে পড়ার টেবিল না থাকলেও খাটে বসে নিয়মিত অধ্যয়ন করে চলেছে শিক্ষার্থী সনি নাথ। আর এই অধ্যয়নের ফলস্বরূপ জীবনের পিইসি, জেএসসি ও এসএসসি তিন পরীক্ষাতেই সে জিপিএ-৫ নিয়ে পাস করেছে। এছাড়া শ্রেণির সবচেয়ে ভালো ফলাফলটাও তার দখলে থাকত বলে তার শিক্ষকরা জানান।

কথা হয় সনি নাথের মা রুনু নাথের সঙ্গে। কথা বলতে বলতে বার বার চোখ ভিজে যাচ্ছিল তাঁর। একদিকে মেয়ের পাসের আনন্দ অন্যদিকে মেয়ের স্বপ্ন পূরণের পথে দারিদ্র্যের হতাশা। তিনি বলেন, ‘আমার এক ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে সনি নাথ বড়। সনির বাবা সুভাষ নাথ মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁর ভ্যান চালানোর টাকা দিয়ে চলত সংসার। ২০১১ সালে তখন সনি চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। একদিন তার বাবার খুব অসুখ হয়। হাসপাতালে ভর্তি করানো হলেও বাঁচানো যায়নি তাকে। তখন থেকেই গৃহস্থালি কাজের পাশাপাশি শুরু করি সন্তানদের মানুষ করার কাজ। শখের বসে শেখা শীতল পাটি বানানোর কাজকে জীবনে বেঁচে থাকার অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করি। রাতদিন পাটি বানাই। পাশাপাশি আশপাশের গ্রামের যেকোনো গৃহস্থালি কাজে যে যেখানে ডাকেন সেখানেই গিয়ে শ্রম বিক্রি করে সন্তানদের পড়ালেখার খরচ চালিয়ে যাই। গত দীর্ঘ ৭ বছর সন্তানদের মানুষ করতে এভাবেই কষ্ট করে চলেছি।’

তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে বড় হয়ে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। আমাকে তার এই ইচ্ছের কথা বার বার বললেও তাকে আশ্বস্ত করি। কিন্তু আমি জানি না তার স্বপ্ন বাস্তবায়নে তাকে শেষ পর্যন্ত সহায়তা করতে পারব কিনা।’ তিনি তাঁর মেয়ের স্বপ্ন বাঁচাতে সকলের সহযোগিতা কামনা করেছেন।

শিক্ষার্থী সনি নাথ বলে, ‘বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই দেখছি মা দিনরাত পরিশ্রম করছেন। কিন্তু তিনি কোনোদিন আমাদের কোনো কাজে পাঠাননি এবং করতেও দেননি। শুধু পড়ালেখা করে যেতে তিনি সবসময় উৎসাহ জুগিয়েছেন। আমি পিইসি পরীক্ষায় উত্তর রাঙ্গুনিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পাই। এ সময় বিদ্যালয়ের কাদের স্যার আমাকে সবদিক থেকে সহায়তা করতেন। এরপর উত্তর রাঙ্গুনিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে টানা তিন বছর খুব কষ্ট করে পড়ালেখা করি। সেখানে জেএসসি পরীক্ষাতেও জিপিএ-৫ অর্জন করি।

এরপর বিদ্যালয়ের স্যারদের পরামর্শে এবং নিজের ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছেকে বাস্তবায়ন করতে নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে পড়ালেখা শুরু করি। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিদ্যালয়ের মঈনুল স্যার আমাকে ফ্রিতে গণিত ও বিজ্ঞান বিভাগের বিষয়গুলো এবং পার্শ্ববর্তী উত্তর রাঙ্গুনিয়া ডিগ্রি কলেজের মো. আলমগীর স্যার আমাকে ইংরেজি পড়াতেন। এভাবে সবার সহযোগিতায় কঠোর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে এসএসসিতেও গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করি। আমার জন্য দোয়া করবেন যেন ভবিষ্যতে একজন ডাক্তার হয়ে মায়ের দুঃখ ঘোচাতে পারি।’ 

উত্তর রাঙ্গুনিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘সনি নাথ ২০১৮ সালে বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ভালো ফলাফল করে বিদ্যালয়ের সুনাম বৃদ্ধি করেছে। আমাদের প্রতিষ্ঠানে অনেক ধনী ঘরের শিক্ষার্থী থাকলেও সনি ছিল সম্ভবত সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের সন্তান। কিন্তু এই সনি ছিল মেধার দিক দিয়ে সবার চেয়ে এগিয়ে। আমরা বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাকে সার্বিক সহযোগিতা করেছি। তার উচ্চ শিক্ষায় সকলের সার্বিক সহযোগিতা প্রয়োজন।’

স্থানীয় ইউপি সদস্য কাজী মঈন বলেন, ‘সনি নাথ আমার গ্রামের গর্ব। আমি অনেক আগে থেকেই তার পড়ালেখার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করে চলেছি। তার মা বিধবা ভাতা পান। সমাজের সকলে যদি এগিয়ে আসেন একজন মেধাবী শিক্ষার্থী সনি অকালে ঝরে যাবে না।’

রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, ‘সনি নাথ দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে বড় সাফল্য পেয়েছে। তার জীবনে এগিয়ে যাওয়ার পথে উপজেলা প্রশাসন থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করা হবে।’

সনির পাশে নাথ কল্যাণ সমিতি : সনি নাথের লেখাপড়ার দায়িত্ব নিল নাথ কল্যাণ সমিতি চট্টগ্রাম বিভাগ। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় উত্তর রাঙ্গুনিয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছে সনি। গত শুক্রবার নগরের আকবর শাহ্ রেলওয়ে হাউজিং সোসাইটি জীবনকুঞ্জ ভবনে নাথ কল্যাণ সমিতির চট্টগ্রাম বিভাগের অস্থায়ী কার্যালয়ে মেধাবী শিক্ষার্থী সনি নাথকে সংবর্ধনা দেওয় হয়। অনুষ্ঠানে সনির মা রুনু নাথকে মেয়ের লেখাপড়ার খরচ চালাতে প্রাথমিকভাবে নগদ ১০ হাজার টাকার আর্থিক অনুদান, শিক্ষাসামগ্রী ও সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়। প্রকৌশলী হরেন্দ্র কুমার নাথের সভাপতিত্বে এবং পরিতোষ নাথ ও মাস্টার বেল্টন নাথের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন মাস্টার তপন কুমার নাথ। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত ডিজিএম মথুরা মোহন নাথ, মাস্টার দুলাল কান্তি নাথ, পন্ডিত প্রবর শ্রী মিলন কান্তি নাথ, ব্যাংকার দুলাল ভৌমিক  ও শিক্ষক শিমুল কান্তি মহাজন। বক্তব্য দেন গৌরাঙ্গ মোহন নাথ, দেবাশীষ নাথ দেবু, সজল কান্তি নাথ, সুজন কান্তি নাথ প্রমুখ।

 



মন্তব্য