kalerkantho


সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়ায় বেড়িবাঁধ নির্মাণ

বসানোর আগেই ভেঙে যাচ্ছে সিসি ব্লক

সৌমিত্র চক্রবর্তী, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)   

৩০ মে, ২০১৮ ০০:০০



বসানোর আগেই ভেঙে যাচ্ছে সিসি ব্লক

সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়ায় কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ ভাঙা বেড়িবাঁধের সংস্কারে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠেছে।

নিম্নমানের নুড়িপাথর, সিমেন্টও বালু ব্যবহারের ফলে বাঁধ রক্ষায় নির্মিত সিসি ব্লকগুলো স্থাপনের আগেই ভেঙে যাচ্ছে। ফলে ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দেও বাঁধটি টেকসই হবে না বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।

জানা যায়, সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের আকিলপুর, জমাদারপাড়া, বোয়ালিয়াকূল, আকিলপুর, সত্যপাড়া, মাঝামাঝি পাড়া গ্রামের সাগর উপকূলে ২.১৫ কি.মি দীর্ঘ উপকূল রক্ষা বেড়িবাঁধ গত দেড় যুগ ধরে ভাঙতে ভাঙতে সাগরে বিলীন হয়ে যায়। এতে ওই এলাকার শত শত একর ফসলি জমিতে লোনা পানি ঢুকে ফসল উৎপাদন বন্ধসহ জোয়ারের সময় বাড়ি ঘরে রান্না বন্ধ হয়ে যেত।

ফলে বাঁধ সংস্কারের দাবিতে মহাসড়কে মানববন্ধন, মিছিল, সমাবেশসহ নানা কর্মসূচি পালন করে হাজার হাজার

নর-নারী। এভাবে দীর্ঘ

আন্দোলন-সংগ্রামের পর স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের অনুরোধে এলাকার সংসদ সদস্য দিদারুল আলম পানি সম্পদমন্ত্রীকে বারবার সমস্যাটি অবগত করলে তিনি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এখানে স্থায়ী ও মজবুত বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ‘বেড়িবাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ অংশে তীর সংরক্ষণ’ প্রকল্পের মাধ্যমে বেড়িবাঁধ সংস্কারও শুরু হয়। জয়েন্ট ভেঞ্চার লি., রহমান ইঞ্জিনিয়ারিং ও ইউনুছ ব্রাদার্স নামক তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়।

পানিসম্পদমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন। এ সময় মন্ত্রী বলেন, ‘স্থানীয় এমপি দিদারুল আলমের ব্যাপক তদবিরে এলাকার মানুষের প্রাণের দাবি বেড়িবাঁধটির জন্য ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছি। কাজটি যেন ভালো ও টেকসই হয় তা সবাইকে দেখতে হবে।’

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদেরও এ বিষয়ে নির্দেশনা দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘সংস্কার কাজ যেন উত্কৃষ্ট মানের হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।’

জানা যায়, কাজের ধরনে বাঁধটি প্রথমে মাটি দিয়ে ভরাট করে পরে এর চারপাশে সিসি ব্লক স্থাপন করা হবে। যাতে সামুদ্রিক ঢেউ ও জলোচ্ছ্বাসে বাঁধের কোনো ক্ষতি না হয়। কিন্তু এলাকাবাসীর অভিযোগ, ব্লক দিয়ে বাঁধ রক্ষা করা হবে সেই ব্লকই তৈরি হচ্ছে অত্যন্ত নিম্নমানের সরঞ্জাম দিয়ে। পাথর ও বালু ময়লাযুক্ত। ব্যবহারের আগে এগুলো ঠিকভাবে পরিষ্কারও করা হয় না। ব্লকে পাথরের সাইজ হবে ৪০ এমএম আর বালু হবে মোটা ২.৫ এফএম আয়তনের। বিধি মোতাবেক প্রতি ব্লক তৈরির নিয়ম ৬টি পাথর, ৩টি মোটা বালু, ১ বস্তা সিমেন্ট দেয়ার কথা থাকলেও নিম্নমানের ৩ বালতি পাথর, ৯ থেকে ১৩ বালতি স্থানীয় ১.২০ এফএম মাপের বালু, আর ১ বস্তা সিমেন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানা যায়। ফলে এসব ব্লক ধাক্কা দিলেই ভেঙে যাচ্ছে। যে সিসি ব্লক নিজেই দুর্বল সেগুলো দিয়ে বাঁধ রক্ষা হবে কীভাবে-এ প্রশ্ন এলাকাবাসীর।

সরেজমিনে বাঁশবাড়িয়ায় নির্মাণাধীন বেড়িবাঁধ এলাকায় দেখা যায়, ভাঙা বাঁধে মাটি ভরাটের কাজের পাশাপাশি প্রচুর সিসি ব্লক নির্মাণ করা হয়েছে। কিছু শ্রমিক কাজ করছেন। তবে অনেক সিসি ব্লক ভাঙা দেখা গেছে।

পরিদর্শনকালে স্থানীয়রা বলেন, ‘ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো নিম্নমানের বালু, পাথর ব্যবহার করে ব্লক তৈরি করছে। ব্লক তৈরিতে নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহার করায় স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানসহ স্থানীয় বাসিন্দারা বার বার অভিযোগ দিলেও পাউবো ও

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন বিভাগ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। ব্লক তৈরিতে পাউবোর সিডিউল অনুযায়ী সিলেটের পাথর, বালু, পানি ও সিমেন্ট সংমিশ্রণ করা হয়নি মোটেও। যেখানে ব্লকগুলো রাখা হয়েছে, বেড়িবাঁধে নেওয়ার সময় কিছু কিছু ব্লক ভেঙেও যাচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাঁশবাড়িয়ার ইউপি চেয়ারম্যান মো. শওকত আলী জাহাঙ্গীর বলেন, ‘এখানে বাঁধটি তৈরি নিয়ে নানান অভিযোগ রয়েছে। যেসব পাথর, বালু ও সিমেন্ট ব্যবহারের কথা সেসব ব্যবহার না করে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার হচ্ছে। ফলে যে সিসি ব্লকগুলো বাঁধ রক্ষা করবে সেগুলোই ভেঙে যাচ্ছে। আমি গিয়ে একাধিকবার ব্লকগুলো না বসিয়ে ভালো ব্লক তৈরির পরামর্শ দিয়েছি। তাঁরাও উন্নতমানের ব্লকগুলো বসানোর আশ্বাস দেন আমাকে। কিন্তু পরে দেখা গেছে ব্লকগুলোই বসানো হচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘অনেক শ্রমিককে এ ধরনের ব্লক তৈরি না করতেও বলেছিলাম। কিন্তু তারা বলে ঠিকাদাররা যেমন চাইবে আমরা তেমনই বানাবে তারা। তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠানের কাজে কিছুটা গতি আছে। অন্যগুলো খুবই ধীর গতিতে কাজ করছে।

কথা ছিলো শুকনো মৌসুমেই ব্লক বসানো শেষ করা হবে। কারণ, ব্লক না বসিয়ে শুধু মাটি দিয়ে বাঁধ তৈরি করলে আসন্ন বর্ষায় সেই মাটির বাঁধ আবারও সাগরে বিলীন হবে এটা নিশ্চিত। কিন্তু বিষয়টি ঠিকাদারদের মাথায় নেই। বর্ষা প্রায় এসে গেছে। এখনো বেশির ভাগ ব্লক বসানো হয়নি। ফলে এই বর্ষায় বাঁধ আবার ভেঙে গেলে তারা অজুহাত দেখিয়ে বরাদ্দ আরো বাড়ানোর দাবি জানাবে। এতে তাদের লাভ হলেও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সরকার।’

এদিকে নিম্নমানের কাজের কথা অস্বীকার করে জয়েন্ট ভেঞ্চার লি. এর ঠিকাদার ফারুক হোসেন ব্লক তৈরিতে কোনো ধরনের অনিয়ম হচ্ছে না দাবি করেন। তিনি জানান, সিডিউল অনুযায়ীই ঠিকঠাক মতো কাজ চলছে। স্থানীয়দের এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন। ঠিকাদার বলেন, ‘কিছু কুচক্রীমহল আমাদের বিরুদ্ধে

অপপ্রচার চালাচ্ছে। এখনও কাজ শেষ করিনি। এর আগে অভিযোগ তোলার কোনো সুযোগ নেই। আমরা কাজ শেষ করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবশ্যই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সিডিউল অনুযায়ী কাজ বুঝে নেবে।’

চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জুলফিকার তারেক বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব টাস্কফোর্স বুয়েটের মাধ্যমে তৈরিকৃত ব্লক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বেড়িবাঁধে ফেলা হয়। তাই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো শতভাগ কাজের মান নিশ্চিত করবে। টাস্কফোর্সের কাছে অনিয়ম ধরা পড়লে ব্লকগুলো বাতিল করা হবে।’

বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা পাউবোর উপ-সহকারী প্রকৌশলী আব্দুল আজিম বলেন, ‘ঠিকাদাররা যদি কাজ খারাপ করে তাহলে তাদের কপালই পুড়বে। প্রতিটি

কাজের বিল দেয়া হবে কাজের গুণগত মান যাচাই-বাছাই করে। বুয়েট টেস্টে যদি টিকে যায়, তাহলেই ঠিকাদার কাজের বিল পাবে। আর কোনো ত্রুটি ধরা পড়লে সে কাজের বিল বন্ধ থাকবে।’

স্থানীয় সংসদ সদস্য দিদারুল আলম বলেন, ‘বাঁধটি সংস্কারের জন্য আমি বারবার পানিসম্পদমন্ত্রীকে

অনুরোধ করে ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ করিয়েছি। মন্ত্রী নিজে কাজ উদ্বোধন করেছিলেন। সেই কাজের মান নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠছে এখন। আমিও এর মধ্যে একবার বেড়িবাঁধ পরিদর্শন করব। যদি অনিয়ম চোখে পড়ে তাহলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’



মন্তব্য