kalerkantho


রাউজানে মাল্টাচাষ

২৩ মে, ২০১৮ ০০:০০



রাউজানে মাল্টাচাষ

৬ বছর ধরে লাল গোলাপসহ নানা জাতের ফল-ফুলের বাগান এবং গরুর খামার করে সাফল্যের পর এবার মালটা উৎপাদনে নেমেছেন রাউজানের প্রেমতোষ বড়ুয়া (৫০)। উপজেলার রাউজান ইউনিয়নের পূর্ব রাউজানের জয়নগর গ্রামের মৃত রাজেন্দ্র লাল বড়ুয়ার ছেলে প্রেমতোষ। একসময় প্রবাসে থাকলেও দেশে ফিরে তিনি এখন পুরোদস্তুর কৃষক। ধানচাষ, ফল আর ফুলবাগানেই তিনি খুঁজে পান প্রশান্তি। পাশাপাশি পরিবারে এনেছেন আর্থিক সচ্ছলতা। প্রতিবেদন : জাহেদুল আলম, রাউজান (চট্টগ্রাম)

 

প্রেমতোষ বড়ুয়া বাড়ির পাশেই বিশাল জমিতে গড়ে তোলেছেন ‘পূর্ব রাউজান অ্যাগ্রোভেট ফার্ম’ নামে কৃষিখামার। সেখানে একের পর এক সাফল্যের ধারাবাহিকতায় মালটাচাষে ব্যাপক সাফল্যের স্বপ্নে বিভোর তিনি। এ লক্ষ্যে চারমাস আগে তিনি দেড় একর উঁচু জমিতে রোপণ করেছেন ৩০০ মালটা চারা। ইতোমধ্যে ওই চারা বড় হয়ে আড়াই ফুট উঁচু হয়েছে। উর্বর মাটি হিসেবে চারার ‘গ্রোথ’ ভালো হওয়ায় তিনি মাল্টা চাষে বিপুল সম্ভাবনা দেখছেন তাঁর বাগানে। আগামীবছর এই বাগানে মাল্টা ধরার ভালো সম্ভাবনা দেখছেন এই চাষি। আগামী চারমাসে ওই চারাগুলো আরো ৫ ফুট বড় হবে। তাছাড়া প্রথমবার একটি চারায় ৫০টি তথা আট কেজি তথা মোট দেড় টন ফল পাওয়ার আশা করা করছেন তিনি। জানালেন, ২০২১ সালে প্রতি গাছে ৩৫০টি করে মাল্টা পাবেন। প্রেমতোষ বলেন, ‘চারমাস আগে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে প্রতিচারা ৬০ টাকা দরে কিনে এনে পাশাপাশি দুটি পৃথক উঁচু জমিতে লাগানো হয় ৩০০ মাল্টা চারা। প্রতিটি চারার জন্য আড়াই ফুট গর্ত করা হয়। এরপর প্রচুর পরিমাণে জৈব ও রাসায়ানিক সার দেওয়া হয় চারায়। মালটা চাষে সর্বসাকুল্যে এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে এক লাখ ৩২ হাজার টাকা। সারি সারি করে লাগানো এসব মালটা চারা এখন দৃশ্যমান। গরু, ছাগল ও পশুপাখি থেকে চারা রক্ষার জন্য বাগানের চতুর্পাশে বাঁশের ঘেরা দেওয়া হয়েছে।’

তিনি জানান, বাড়ির পাশে বাগান হওয়ায় সবসময় নিজেই বাগানের পরিচর্যা ও দেখাশোনা করতে পারছেন। তবে দেখাশোনার জন্য একজন শ্রমিক রাখা হয়েছে। মাঝে মধ্যে ৪-৫ জন শ্রমিক রেখে অন্তঃবর্তীকালীন বাগান পরিচর্যা করতে হয়। প্রেমতোষ মাল্টা বাগান করার আগে এক একর (আড়াই কানি) জমিতে বিপুল পরিমাণ গোলাপ ফুলচাষ করেন। ২০১১ সাল থেকে শুরু করা এই ফুলচাষে তিনি আশাতীত মুনাফা অর্জন করেন বলে জানালেন। টানা ছয়বছর তিনি গোলাপ ফুলের চাষ করেন। তাঁর ওই বাগান ছিল স্থানীয় গোলাপ ফুল ক্রেতাদের জন্য বড় বাজার। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোলাপ বাগান উপজেলার কিছু কিছু এলাকায় থাকলেও প্রেমতোষের ফুলবাগান ছিল উপজেলায় সবচেয়ে বড়। ফুলবাগানের পাশাপাশি তিনি তাঁর জমিতে লাগান সুস্বাদু আম, লেবু, জলপাই, বড়ই, লিচু, আপেলকুল, সফেদা, বাউকুল, জামরুলসহ নানা ফলের চারা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লাগানো হয় বাউকুল, আপেলকুল। অন্য ফল থেকেও তিনি বেশ মুনাফা অর্জন করেন বলে জানান। তবে তাঁর বিশেষ আগ্রহ এখন মাল্টা চাষে। উপজেলায় মাল্টা বিপ্লব ঘটানোর স্বপ্নে তিনি বাগান থেকে বাউকুল ও আপেলকুলের ৮০টি চারা তুলে নিয়ে এবং গোলাপ ফুলচাষ বাদ দিয়ে ছয়মাস আগে লাগিয়েছেন ৩০০ মালটা। উপজেলা কৃষি অফিসারদের পরামর্শে গড়া এই মাল্টাবাগানে তিনি এখন বর্ণিল স্বপ্নের কাছাকাছি পৌঁছার আশা করছেন।

এদিকে প্রেমতোষ মাল্টা চাষের আগে ফুলের বাগানের পাশাপাশি একই জায়গায় গড়ে তোলেন দেশি গরুর খামার। গতবছর কোরবানির সময় দেশে গরুর নিম্নমুখী দামের কারণে অনেক ব্যবসায়ী লোকসানের শিকার হলেও তিনি স্থানীয় বেপারিদের কাছে আগেভাগে গরু বিক্রি করে ৯ লাখ টাকা আয় করেছেন বলে জানান। পাশাপাশি নিজের আট কানি জমিতে করছেন ধানচাষ। তিনি জানান, গোলাপ ফুলচাষ বাদ দেওয়ার পর কিছুদিন ওই জমিতে ধান, খিরা, আলু, মরিচ, বেগুন ও নানাজাতের সবজিচাষ করা হয়। এরপর ওই জমিতে পুরোদমে চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে সুস্বাদু মাল্টা চাষ শুরু করেন।

প্রেমতোষ বলেন, ‘প্রকৃতি ও মাটিকে আমার বেশি ভালো লাগে। এজন্য এগুলো নিয়েই এখন আমার দিনকাল। বিভিন্ন জাতের ফলের বাগান দেখলে আমার মন জুড়ায়। তাছাড়া ফলের বাগান, ধানচাষসহ কৃষিকাজ আমার উপার্জনের মূল চালিকাশক্তিও।’

রাউজান উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সিকু বড়ুয়া ও উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সৌরভ মুত্সুদ্দী বলেন, প্রেমতোষ বড়ুয়ার জমিগুলো মাল্টা চাষের উপযোগী। বাগানের প্রতি তিনি অধিক মনযোগী ও যত্নবান। নিজে সবকিছু সবসময় তদারকি করেন। তাঁর বাগানে লাগানো মাল্টা চারাগুলো তিনবছর থেকে একটানা ১৫ বছর প্রচুর ফল দেবে। মিষ্টিও হবে খুব বেশি।’

 


মন্তব্য