kalerkantho


জাহাজের পোড়া তেল লোকালয়ে দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ গ্রামবাসী

সৌমিত্র চক্রবর্তী, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)   

২৩ মে, ২০১৮ ০০:০০



জাহাজের পোড়া তেল লোকালয়ে দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ গ্রামবাসী

সীতাকুণ্ডে আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে কালো তেলের জমজমাট ব্যবসা চলছে। বিশেষত উপজেলার কুমিরা থেকে সলিমপুর পর্যন্ত শিপব্রেকিং এলাকায় এই তেল সহজলভ্য হওয়ায় বিষাক্ত কালো তেল কিনে ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়ে রাখেন বেশ কিছু ব্যবসায়ী। এতে সংশ্লিষ্ট এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে পরিবেশ মারাত্মক দূষণের শিকার হয়ে মানুষের জীবনযাত্রা অসহনীয় হয়ে ওঠেছে। কিন্তু এ নিয়ে মাথা ব্যথা নেই কারো। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দেশের একমাত্র জাহাজ ভাঙা শিল্পকে কেন্দ্র করে সীতাকুণ্ডে অসংখ্য পণ্যের ব্যবসা-বাণিজ্য বিস্তার লাভ করেছে। যার মধ্যে একটি হলো কালো তেল। মূলত জাহাজের জ্বালানি হিসেবে এই তেল ট্যাঙ্কে রাখা থাকে। কিন্তু দীর্ঘদিন উত্তপ্ত ইঞ্জিনের সংস্পর্শে থেকে এই তেলে কিছুটা পরিবর্তন হয়ে এটি তীব্র ঝাঁজালো দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে যায়। অনেক সময় তেলের ট্যাঙ্কে বিষাক্ত গ্যাসও জমে যায়। যার সান্নিধ্যে গেলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। আবার এই তেল প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে এ থেকে ডিজেল, মবিলসহ নানারকম দাহ্য পদার্থ পাওয়া যায়। ফলে শিপব্রেকিং ইয়ার্ডগুলোতে ভাঙার জন্য আমদানি করা জাহাজের এই তেল কিনে অনেক ব্যবসায়ী সেই কালো তেলকে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ডিজেল, মবিল প্রভৃতিতে রূপান্তর করে তা অনেক বেশি লাভে বিক্রি করেন। ফলে এই কালো তেলের চাহিদাও প্রচুর।

জাহাজ ভাঙা শিল্প এলাকার অসংখ্য যুবক স্ক্র্যাপ জাহাজের বিভিন্ন সরঞ্জামের সাথে কালো তেলের ব্যবসায়ও জড়িয়ে পড়েছে। এতে তারা অল্প সময়ে অনেক টাকার মালিক হলেও এই কালো তেলের ব্যবসার ওপর ক্ষুব্ধ অধিকাংশ সাধারণ মানুষ। কারণ, ব্যবসা সম্প্রসারণের সাথে সাথে এটি পাড়া-মহল্লায় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। আর তাতে অনেক এলাকায় এত প্রকট দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়েছে যে অনেকে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ছে। এলাকাবাসী জানান, সীতাকুণ্ড উপজেলার কুমিরা, সোনাইছড়ি, ভাটিয়ারী ও সলিমপুর এলাকায় প্রচুর কালো তেল ব্যবসায়ী রয়েছেন। এখানে সব গ্রামে কালো তেলের স্থায়ী-অস্থায়ী ডিপোর ছড়াছড়ি। এতে সাধারণ মানুষ অনেকরকম সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। উপজেলার শিপব্রেকিং এলাকার কুমিরা, সোনাইছড়ি, বারআউলিয়া, কদমরসুল, মাদামবিবিরহাট, ভাটিয়ারী ও ফৌজদারহাট এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, এসব এলাকায় যত্রতত্র কালো তেলের জমজমাট ব্যবসা চলছে। সবচেয়ে আশঙ্কার কথা অনেক ব্যবসায়ী আছেন যাঁরা কোনোরকম নিরাপত্তার মধ্যে না রেখে একেবারে খোলামেলা স্থানেই ফেলছেন দাহ্য এসব পদার্থ। সোনাইছড়ি ইউনিয়নের গামারীতল ক্রিস্টাল শিপার্স লিমিটেড নামক একটি শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের সামনে একটি ছোট্ট পুকুরে প্রচুর কালো তেল দেখা যায়। এ তেলের দুর্গন্ধ এত তীব্র যে পুকুর থেকে আরো অনেকটা দূরে থাকতেই ভয়ানক গন্ধ নাকে লাগে।

পুকুরটির আশপাশে অনেক বাড়িঘর আছে। পাশেই রয়েছে একটি চায়ের দোকান। এই দোকানের মালিক মো. জালাল উদ্দিন ও স্থানীয় স্ক্র্যাপ ব্যবসায়ী মো. জসীম উদ্দিন অভিযোগ করে বলেন, ‘বিগত কিছুদিন ধরে উপজেলার কদমরসুল এলাকার কালো তেল ব্যবসায়ী মো. ইউনুস অন্য কোনো স্থান থেকে কালো তেল কিনে জমা করছেন। তিনি এভাবে খোলা স্থানে দুর্গন্ধযুক্ত কালো তেল ফেলার কারণে এখানকার সবাই শারীরিক অসুস্থ বোধ করছেন। নিঃশ্বাস নিলেই মারাত্মক দুর্গন্ধ ভেতরে প্রবেশ করে বমি ভাব, মাথা ব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। তেলের একেবারে পাশেই আমাদের অবস্থান হওয়ায় সবচেয়ে কষ্টে আছি।’

তিনি জানান, গ্রামবাসী যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন রাতের আঁধারে এসব বর্জ্য তেল এখানে ফেলে যান ইউনুস। এরপরও এলাকাবাসী তাঁকে বাধা দিয়েছেন। এ নিয়ে উত্তেজনাও রয়েছে এলাকায়। অবশ্য সেখানে কালো তেল ফেলার কথা স্বীকারও করেছেন তৈল ব্যবসায়ী কদমরসুলের মো. ইউনুস। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন জাহাজ থেকে কালো তেল কিনে প্রক্রিয়া করে বিক্রি করি। অপ্রয়োজনীয় তেল কোথাও না কোথাও ফেলতে হয়। আমি সেখানে ফেলেছি। মাত্র ১০ ড্রাম তেল ফেলেছি। কিন্তু গ্রামবাসী আপত্তি করায় এখন আর ফেলছি না।’ সামনে তিনি আর সেখানে কোনো কালো তেল ফেলবেন না বলে জানান।  এদিকে শুধু সোনাইছড়িতে নয় যত্রতত্র কালো তেলের ডিপোর কারণে অতিষ্ঠ অন্য এলাকার মানুষও। ফৌজদারহাট জলিল স্টেশন এলাকার বাসিন্দা সাংবাদিক গিয়াস কামাল সাগর বলেন, ‘আমার বাড়ির আশপাশে বেশ কয়েকটি কালো তেলের অবৈধ ডিপো আছে। এসব ডিপোতে যখন তেলগুলো পোড়ানো (প্রক্রিয়াকরণ) শুরু হয়। তখন এর যে কি ভীষণ দুর্গন্ধ বের হয় তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝবে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘গ্রামের বাড়িঘরের মধ্যে এসব দাহ্য পদার্থ ও পরিবেশ বিধংসী কার্যক্রমের অনুমতি কীভাবে মেলে আমার বোধগম্য নয়। যদি একটু কোথাও অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয় তাহলে কালো তেলের সংস্পর্শে ভয়ানক ঘটনা ঘটে যায়। এর আগেও একবার অগ্নিকাণ্ডের পর কালো তেলের ভয়াবহতার কারণে ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিল না।’ এসব ব্যবসা লোকালয় থেকে দূরে সরিয়ে নেবার দাবি জানান তিনি।  স্থানীয়রা জানান, একসময় অবৈধ কালো তেলের ডিপো ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছিলেন সীতাকুণ্ডের সাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. রুহুল আমিন, সাবেক আরেক এসি ল্যান্ড মো.

মাহবুব আলম। তাঁরা অনেক ডিপোকে জরিমানা ও সিলগালা করে বন্ধ করে দিয়েছিলেন। পরে আইনগত প্রক্রিয়া শেষে সেগুলো আবার চালু হয়েছে। কিন্তু তাঁরা বদলি হয়ে যাওয়ার পর এসব অভিযান একেবারেই থেমে গেছে। ফলে ধীরে ধীরে আবারো লোকালয়ে বিস্তার লাভ করছে অবৈধ ডিপোগুলো।

ভাটিয়ারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘এসব কালো তেলে ব্যবসায়ীদের ইউনিয়ন পরিষদ থেকে যে লাইসেন্স দেওয়া হয় তাতে স্পষ্টতই বেশ কিছু নিয়ম ও নির্দেশনা দেওয়া আছে। লোকালয়ে এসব ব্যবসা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আমি চেয়ারম্যান হওয়ার পর এ ধরনের কোনো প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দিইনি। এগুলো আগের লাইসেন্সের ওপরেই চলছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘সম্প্রতি এক ব্যক্তি আমার ৯ নম্বর ওয়ার্ডে  গ্রামের ভেতরে কালো তেলের ব্যবসার অনুমতি নিতে এসেছিলেন। কিন্তু আমি দিইনি। কারণ, একটি অগ্নিকাণ্ড ঘটলে চরম সর্বনাশ হয়ে যাবে।’ তাঁর মতে, ভ্রাম্যমাণ আদালত ছাড়া এগুলো বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘বিষয়টি আমিও জানতে পেরেছি। অতি শিগগিরই এসব অবৈধ ব্যবসার বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হবে।’

এদিকে পরিবেশ বিধ্বংসী এসব কালো তেলের ব্যবসার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা প্রসঙ্গে জানতে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের পরিচালক মো. মকবুলার রহমানের মোবাইলে বারবার ফোন করলেও তিনি ফোন ধরেননি।



মন্তব্য