kalerkantho


ইছামতি থেকে বালু উত্তোলন

ভাঙছে ফসলি জমি ভাঙছে ঘরবাড়ি

দ্বিতীয় রাজধানী ডেস্ক   

১৬ মে, ২০১৮ ০০:০০



ভাঙছে ফসলি জমি ভাঙছে ঘরবাড়ি

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার ইছামতি নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলছে। এতে নদীর দুই তীরে শুরু হয়েছে ভাঙন। ফসলি জমি ও ঘরবাড়ি হুমকির মুখে। বালুবাহী ট্রাকের চলাচলে সড়ক হয়ে যাচ্ছে এবড়ো-খেবড়ো। প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন : জিগারুল ইসলাম, রাঙ্গুনিয়া (চট্টগ্রাম)

 

রাঙ্গুনিয়ার ইছামতি নদী থেকে নিয়ম-নীতি না মেনেই উত্তোলন করা হচ্ছে বালু। সরকারের ইজারাবিহীন বালুমহাল থেকে বিভিন্ন সময় এরা সরকারি দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পদ-পদবির দোহাই দিয়ে নিয়মিত বালু তোলছে। ইছামতি ছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন নদী ও খাল থেকে সিন্ডিকেট করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হয়। বালু উত্তোলনের কারণে ভেঙে যাচ্ছে তীরবর্তী বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি।

উপজেলার বিভিন্ন স্পটে নদীতে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বালুর ট্রাক চলাচলের কারণে ধেবে গিয়ে খানাখন্দকে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। কয়েকটি গ্রামীণ সড়ক ইতোমধ্যে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।

রাঙ্গুনিয়া উপজেলার শতাধিক স্পটে প্রতিনিয়ত ইজারাবিহীন স্থান থেকে বালু উত্তোলন চলছে। অন্যদিকে বালুদস্যুদের হুমকির কাছে অসহায় স্থানীয় জনসাধারণ। বালু উত্তোলন বন্ধে বিভিন্ন সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেও তাদের দমানো যাচ্ছে না বলে প্রশাসন সূত্র জানায়।

উপজেলার দক্ষিণ রাজানগর ইউনিয়নের ফুলবাগিচা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, এই গ্রামের সাথে ইছামতি নদীর উপর দিয়ে বাঁশের সাঁকো বানিয়ে চলাচল করে অপর পাড়ের রাজানগর ইউনিয়নের শিয়ালবুক্কা গ্রামের মানুষ। শিয়ালবুক্কা, ফুলবাগিচাসহ আশেপাশের এলাকার মানুষের প্রধান পেশা কৃষিকাজ। শুধু নদীর পাড়েই কৃষিকাজ করে দিনাতিপাত করছেন দুই গ্রামের অর্ধশতাধিক কৃষক। কিন্তু গ্রামের মানুষের নির্মিত বাঁশের সাঁকোর নিচ থেকেই বালু তোলছে সরকারি দলের রাজনৈতিক পরিচয়ে কয়েকজন ব্যক্তি। আধা কিলোমিটারের মধ্যেই দুটি আলাদা ড্রেজার মেশিনে তারা প্রতিনিয়ত বালু উত্তোলন করলেও ভয়ে কেউ এর প্রতিবাদ করতে পারছেন না। বালু উত্তোলনের কারণে ইছামতি নদীর এই স্পটে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় লায়লা বেগম (৪৫) বলেন, ‘নদীর পাড়ে আমি দুই কানি কাঁকরোল চাষ করেছি। ফসল উত্তোলনের সময়ে নদী থেকে বালু উত্তোলনের কারণে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনে ইতোমধ্যেই আমার ফসলি জমি নদীতে বিলীন হওয়া শুরু করেছে।’

শিয়ালবুক্কা গ্রামের আবুল বশর (৫৫) বলেন, ‘আমরা চলাচলের জন্য শিয়ালবুক্কা বাঁশের সাঁকো ব্যবহার করি। প্রতিবছর আমরা স্বেচ্ছাশ্রমে এই সাঁকো নির্মাণ করি। বালুদস্যুরা ড্রেজার বসিয়ে এই সাঁকোর নিচ থেকেই বালু তোলছে প্রতিদিন। এতে নড়বড়ে হয়ে পড়েছে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম সাঁকোটি। এলাকার কৃষক, স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরা ঝুঁকি নিয়ে নড়বড়ে সাঁকোর ওপর দিয়ে চলাচল করছে। এসব নিয়ে ভয়ে কেউ মুখ খুলছেন না।’

দক্ষিণ রাজানগর ইউপি সদস্য মো. আবদুল কাদের তালুকদার বলেন, ‘ফুলবাগিচা এলাকায় বালু উত্তোলনের কারণে এলাকার ফসলি জমি নদী ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। নদীতে প্রায়ই ভেঙে গেছে শিয়ালবুক্কা সংলগ্ন সর্দারপাড়া সড়ক। পারুয়া ডিসি সড়কও ইছামতি খালের ভাঙনে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। বেপরোয়া বালু উত্তোলন বন্ধে এলাকাবাসী জেলা প্রশাসন, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর অভিযোগ দিয়েছেন। কিন্তু এখনো এর কোনো ফল পাওয়া যায়নি।’

এলাকাবাসীর অভিযোগে জানা যায়, শিয়ালবুক্কা ব্রিজের নিচ থেকে বালু উত্তোলনের সাথে জড়িত রয়েছে শুভ, রেজাউল করিম, আইয়ুব আলী, মিজান নামে কয়েকজন যুবক। তারা সবাই সরকারি দলের অঙ্গ সংগঠনের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। দলের নাম বিক্রি করে তারা দীর্ঘদিন এই স্থানে বালু উত্তোলন করে আসছে। অন্যদিকে এর আধাকিলোমিটার দক্ষিণে বালু উত্তোলন করছে নজরুল ইসলাম ও নাছির উদ্দিন নামে দুই ভাই। তারা নিজেদের যুবলীগ নেতা বলে দাবি করেন এলাকায়। তাদের বেপরোয়া বালু উত্তোলনের কারণে ইছামতি নদীতে অনেক ফসলি জমি বিলীন হয়েছে গত কয়েক বছরে।  যোগাযোগ করা হলে নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা আগে বালু উত্তোলন করলেও এখন ড্রেজার মেশিন সরিয়ে ফেলেছি। আগের উত্তোলনকৃত বালু আমরা এখন বিক্রি করছি মাত্র।’ তবে তাঁর কথার সত্যতা পাওয়া যায়নি পরিদর্শনে গিয়ে। শিয়ালবুক্কা সাঁকোর নিচ থেকে নিয়মিত বালু উত্তোলন করার চিত্র এখনো দৃশ্যমান।

এদিকে পারুয়া ইউনিয়নের রাবারড্যাম সংলগ্ন ইছামতি নদী থেকেও বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। অথচ রাবার ড্যামের পানি ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি জহুরুল হক বলেন, ‘আইন অনুযায়ী রাবারড্যামের দুই পাশের দুই কিলোমিটার এলাকার মধ্যে বালু উত্তোলনের কোনো নিয়ম নেই। যারা এখানে বালি উত্তোলন করছে তাদের এটা বন্ধ করতে বলা হলেও শুনছে না কেউ।’

এভাবে শুধু ইছামতি নদীর রানিরহাট থেকে উপজেলা সদরের রোয়াজারহাট পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার জুড়ে বালুদস্যুদের কমপক্ষে অর্ধশত বালুর স্তূপ। তাদের বেপরোয়া আচরণে এলাকার মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। পারুয়া ইউনিয়ন ছাত্রলীগের দায়িত্বশীল এক নেতার বালুর স্তূপ কমপক্ষে ১০টি বলে দাবি করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইউপি সদস্য। 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, ‘অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত ইছামতি নদী থেকে ১০/১৫টি ড্রেজার মেশিন জব্দ করে পুড়িয়ে  দিয়েছি এবং জরিমানাও করেছি। ফুলবাগিচা ও রাবারড্যামসহ ইছামতি নদী থেকে বালু উত্তোলনের ব্যাপারে অভিযোগ পেয়েছি। এগুলোর বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে’

 

 

 



মন্তব্য