kalerkantho


একটি বেড়িবাঁধে বদলে যাবে ১০ গ্রাম

ছোটন কান্তি নাথ চকরিয়া (কক্সবাজার)   

১৬ মে, ২০১৮ ০০:০০



একটি বেড়িবাঁধে বদলে যাবে ১০ গ্রাম

... বর্ষা এলে চিরিঙ্গা ইউনিয়নবাসীর দুর্ভোগের সীমা থাকে না। পাহাড়ি ঢল সব ভেসে নিয়ে যায়। এ সমস্যা থেকে বাসিন্দাদের মুক্তি দিতে চরণদ্বীপের ঠাণ্ডা মিয়ার বাড়ি থেকে সাতদরজা স্লুইস গেট পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে বেড়িবাঁধের কাজ ৯০ শতাংশ শেষ হয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যে বাকি কাজও শেষ হওয়ার কথা ...

 

প্রতিবছর বর্ষা এলেই কক্সবাজারের চকরিয়ার চিরিঙ্গা ইউনিয়নের দুর্গম এলাকা চরণদ্বীপের কয়েকটি গ্রামের অন্তত ৩০ হাজার মানুষের দুর্ভোগের সীমা থাকে না। বিভিন্ন ছড়া দিয়ে পাহাড়ের উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানিতে সবই ভেসে যায়। বসতবাড়ি তলিয়ে যাওয়া ছাড়াও মাসের পর মাস বানের পানিতে ভাসতে হয় এখানকার বাসিন্দাদের। ঢলের পানির তীব্রতায় ভেসে যায় হালের বলদ, মহিষ, ভেড়াসহ বিভিন্ন পোষা প্রাণীও। যুগ যুগ ধরে এই অবস্থা বিরাজমান থাকলেও একটি বেড়িবাঁধ এসব সমস্যা থেকে রেহাই দিচ্ছে সহসা। ইউনিয়নের চরণদ্বীপের ঠাণ্ডা মিয়ার বাড়ি থেকে সাতদরজা স্লুইস গেট পর্যন্ত ৬৬ চেইন তথা প্রায় দুই কিলোমিটারের একটি বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ দ্রুতই এগিয়ে চলছে। ইতোমধ্যে নির্মিতব্য এই বেড়িবাঁধের কাজ ৯০ শতাংশ শেষ হয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যে বাকি কাজও সমাপ্ত হলেই পুরোপুরি দুঃখ লাঘব হবে এখানকার মানুষের। এতে যুগ যুগ ধরে বিপদাপন্ন এসব মানুষের মাঝে এই বেড়িবাঁধ নিয়ে আশা-আকাঙ্ক্ষার কমতি নেই।

বেড়িবাঁধের উপকারভোগী বাসিন্দারা বলছেন, এই পর্যন্ত বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ টেকসই এবং যথাযথভাবেই চলেছে। অসম্পূর্ণ থাকা বাঁধের বাকি কাজও যেন ঠিকঠাক মতো চলে। যাতে অনেক কষ্টেসৃষ্টে পেতে যাওয়া এই বেড়িবাঁধ যেন এক বন্যাতেই আশায় গুঁড়োবালিতে পরিণত না হয়। কারণ এই বেড়িবাঁধ হয়ে ওঠবে এখানকার মানুষের ভাগ্য তথা অর্থনৈতিক পরিবর্তনের একটি মাধ্যম।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে বহুল প্রতীক্ষিত বেড়িবাঁধটির নির্মাণকাজ চলছে। কাজটি বাস্তবায়ন করছে চকরিয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার দপ্তর। এজন্য চিরিঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য (মেম্বার) আলী হোসেনকে প্রকল্প সভাপতি করে ইতোপূর্বে একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা পাঠানো হয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে। পরবর্তীতে অনেক দেন-দরবার করে প্রকল্পটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদন এবং প্রকল্পের বিপরীতে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা কার্যালয়ের প্রধান সহকারী বাবুল পাল কালের কণ্ঠকে জানান, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে চকরিয়া উপজেলার চিরিঙ্গা ইউনিয়নের চরণদ্বীপে দুই কিলোমিটার তথা ৬৬ চেইন বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে। এজন্য ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় অর্থ হিসেবে ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়।

দুর্গম চরণদ্বীপের ঠাণ্ডা মিয়ার বাড়ি থেকে সাতদরজা স্লুইস গেট পর্যন্ত বেড়িবাঁধ নির্মাণকাজ বাস্তবায়নে গঠিত প্রকল্পের সভাপতি ও চিরিঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আলী হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পার্বত্য বান্দরবানের লামা উপজেলা হয়ে চকরিয়ার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ফাঁসিয়াখালী ছড়াখালসহ আশপাশের কয়েকটি ছড়াখাল দিয়ে প্রতিবছর বর্যামৌসুমে ভাটির দিকে নেমে আসে পাহাড়ি ঢলের পানি। এতে ইউনিয়নের চরণদ্বীপ এলাকার ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তত ৩০ হাজার মানুষ বানের পানিতে ভাসতে থাকে মাসের পর মাস। একেবারে ভেঙে পড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা। কোথাও চিলতে পরিমাণ জায়গা খালি পাওয়া যায়না মাথা গোঁজার জন্য। এমনকি বানের পানিতে বসতবাড়ি তলিয়ে যাওয়া ছাড়াও হালের বলদ, মহিষ, ভেড়াসহ বিভিন্ন পোষা প্রাণীও ভেসে যায়। এতে প্রতিবছর বর্ষামৌসুমে মানুষের জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘অনুন্নত এলাকার এসব মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা মাথায় রেখে চিরিঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. জসীম উদ্দিন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে মুক্তি দিতে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জাফর আলমের কাছে বেড়িবাঁধ নির্মাণের প্রস্তাবনা দেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা চেয়ারম্যান সেই আবেদন নিয়ে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রকল্পটি অনুমোদন করান। এর ফলে বহুল প্রতীক্ষিত এই বেড়িবাঁধটির নির্মাণকাজ এখন চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়নের পথে।’

চিরিঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জসীম উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নের মধ্যে আমার ইউনিয়ন যোগাযোগ, শিক্ষাসহ নানা ক্ষেত্রে একেবারেই পিছিয়ে। গেল ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আগে ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মানুষের কাছে আমার প্রতিশ্রুতিও ছিল এই বেড়িবাঁধটি নির্মাণ করে প্রতিবছর বর্ষামৌসুমে ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে আসা মানুষকে মুক্তি দেওয়ার। অবশেষে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বেড়িবাঁধটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হতে যাওয়ায়।’

চেয়ারম্যান আরো বলেন, ‘আমাদের উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাফর আলম ভাইয়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় আজ চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়নের পথে ২ কিলোমিটারের এই বেড়িবাঁধ। এটির নির্মাণকাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হতে যাচ্ছে আর মাত্র কয়েকদিন পর। এই বেড়িবাঁধটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলেই পাল্টে যাবে ইউনিয়নের দুর্গম চরণদ্বীপের দুটি ওয়ার্ডের অন্তত ১০ গ্রামের চিত্র। প্রতিবছর বর্ষা ও ভয়াবহ বন্যায় যেখানে জনগণ ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে আসছিল, এবার সেই চিত্র আর থাকবে না।’

সংশ্লিষ্টরা আরো জানান, চলতি বছরের বর্ষামৌসুম ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। তাই দ্রুত এই বেড়িবাঁধের কাজ চূড়ান্তভাবে সম্পন্ন করতে তাদের জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এজন্য বিপুল শ্রমিক নিয়োগের পাশাপাশি বড় বড় অংশে সহায়তা নেওয়া হচ্ছে স্কেভেটররা।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. জুবায়ের হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চিরিঙ্গা ইউনিয়নের চরণদ্বীপের বেড়িবাঁধটির কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে আমাদের চেষ্টার কমতি নেই। এজন্য আমার দপ্তরের লোকজন প্রতিনিয়ত কাজ তদারকি করছে। আমিও নিয়মিত পরিদর্শন করছি কাজের মান ঠিক রাখতে।’

তিনি আরো বলেন, ‘ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণ শুরু হওয়ার আগেই এই বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করতে প্রকল্প সভাপতিকে বার বার তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। আশা করছি, কয়েকদিনের মধ্যেই এই বেড়িবাঁধের অসম্পূর্ণ কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হয়ে যাবে। এতে সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাবে অবহেলিত থাকা এখানকার বাসিন্দাদের।’

এ প্রসঙ্গে উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি সবসময় মানুষের সুখ-দুঃখের সাথী হয়ে বেঁচে থাকতে চাই। কারণ জনগণই আমার একমাত্র ভরসাস্থল। কে কোন দল করে বা কোন এলাকার মানুষ কোন দলকে ভোট দেয় সেদিকে নজর না দিয়ে এলাকার উন্নয়নকেই প্রাধান্য দিয়ে আসছি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে চিরিঙ্গা ইউনিয়নের দুর্গম এবং অবহেলিত চরণদ্বীপের ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মানুষকে ভয়াবহ বন্যার ক্ষয়ক্ষতি থেকে পরিত্রাণ দিতে বেড়িবাঁধটি নির্মাণ করা হচ্ছে। এজন্য ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী এবং সচিব মহোদয় যথেষ্ট আন্তরিকতা দেখিয়ে বেড়িবাঁধটি নির্মাণে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিয়েছেন।’

 

 


মন্তব্য