kalerkantho


‘মাদকহাট’ জোরারগঞ্জে বইছে সুবাতাস

স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন অনেকে

এনায়েত হোসেন মিঠু মিরসরাই (চট্টগ্রাম)   

১৬ মে, ২০১৮ ০০:০০



‘মাদকহাট’ জোরারগঞ্জে বইছে সুবাতাস

ভারত সীমান্ত, মহাসড়ক আর দুর্গম পাহাড়ের কারণে ‘মাদকহাটে’ পরিণত হওয়া জোরারগঞ্জ থানা এলাকায় বইতে শুরু করেছে সুবাতাস। টানা দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে পুলিশ-র‌্যাবের টানা অভিযানে মাদক কারবারিদের কেউ কেউ এলাকা ছাড়া আবার অনেকে কারাগারের অন্তরীণে।

জোরারগঞ্জ থানা পুলিশ জানায়, ২০১৭ সালের দিকে বেশ কয়েকজন চিহ্নিত মাদক কারবারি মরণঘাতী এ অবৈধ ব্যবসা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন। তাঁদের মধ্যে একজন করেরহাট ইউনিয়নের শুভপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকার শিমুল।

করেরহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এনায়েত হোসেন নয়ন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শিমুল স্বাভাবিক পথে ফিরে আসেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে ৭০ হাজার টাকা মূল্যের একটি বালু উত্তোলনের শ্যালো মেশিন কিনে দিই। বর্তমানে তিনি ফেনী নদী থেকে বালু উত্তোলন করে পরিবার পরিজন নিয়ে বেশ ভালো আছেন।’

জোরারগঞ্জ থানার সেকেন্ড অফিসার (এসআই) বিপুল চন্দ্র দেবনাথ জানান, একই বছর করেরহাট ইউনিয়নের অলিনগর লিচুবাগান এলাকার মো. নুরুজ্জামানের ছেলে মোহাম্মদ সুমন মাদক কারবার ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। তাঁকে করেরহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সুলতান গিয়াস উদ্দিন জসিম তাঁর বালুমহালে চাকরি দিলে তিনি পরিবার পরিজন নিয়ে ভালোভাবে দিন কাটাচ্ছেন।

জানা যায়, ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জোরারগঞ্জ থানায় পরিদর্শক পদে যোগ দেন জাহিদুল কবির। তিনি থানায় যোগদানের পর পর স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত মতবিনিময় সভায় মাদকের বিরুদ্ধে তাঁর জিরো টলারেন্স নীতির কথা তুলে ধরেন। ওই সময় তিনি সাংবাদিকদের সামনে মাদকের বিরুদ্ধে টানা অভিযান চালানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে চলতি বছরের গত এপ্রিল মাস পর্যন্ত জোরারগঞ্জ থানার নথিভুক্ত মামলার তথ্য অনুযায়ী, থানা এলাকার আটটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় পুলিশ মাদক নির্মূলে কয়েক শ অভিযান চালায়। এসব অভিযানে গ্রেপ্তার হয় ৮৫৪ জন মাদক কারবারি ও সেবনকারী। অভিযানে পুলিশ বাদী হয়ে ৬২৫টি মামলা দায়ের করে।

মামলাগুলোর বেশির ভাগ তদন্ত শেষে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে পুলিশ। বাকি মামলাগুলোরও তদন্তের কাজ চলছে।

এদিকে ২০১৩ সালের ১৯ মে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর উদ্বোধন করেন জোরারগঞ্জ নামে এ নতুন থানা। মিরসরাই থানা এলাকার উত্তরাঞ্চলকে ভাগ করে  ৮টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা এলাকা নিয়ে গঠিত হয় নতুন এ থানা। প্রথমদিকে এ থানা ঘিরে পুলিশের কার্যক্রম সন্তোষজনক না থাকলে বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক রয়েছে বলে দাবি পুলিশের।

থানার তথ্য-উপাত্তের আলোকে জানা যায়, ২০১৩ সালের ১৯ মে থেকে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় আড়াই বছর সময়ে জোরারগঞ্জ থানা এলাকায় মাদকের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য কোনো অভিযান ছিল না। এ সময় পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয় মাত্র ১২৬ জন মাদক কারবারি ও সেবনকারী। মামলা দায়ের হয় ২৪২টি। মাদক আটক বা উদ্ধারের পরিমাণও তুলনামূলক কম।

জোরারগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাদক সর্বগ্রাসী। এর বিরুদ্ধে পুলিশকে সবসময় সোচ্চার থাকতে হয়। আমরা শুধু অভিযান-গ্রেপ্তার আর মাদকদ্রব্য আটকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকিনি, বরং মাদকসেবী ও কারবারিদের সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে কাজ করছি। মাননীয় গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন স্যার আমাকে মাদক নির্মূলে সবরকম পরামর্শ-সহায়তা দিয়ে থাকেন। আমার ডিপার্টমেন্ট থেকেও ভালো সাপোর্ট পাচ্ছি।’ 

মিরসরাই উপজেলার মাদকবিরোধী একমাত্র সংগঠন মিরসরাই মুক্তি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শেখ আতাউর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শুধু পুলিশ-র‌্যাবের অভিযানে মাদক নির্মূল করা যাবে না। এ জন্য প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন। আর এ সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে মাদক কারবারিদের নির্মূল এবং মাদকসেবীদের সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।’


মন্তব্য