kalerkantho


সবুজ পাহাড় আবার রক্তে লাল



সবুজ পাহাড় আবার রক্তে লাল

ছবি : জাকির হোসেন

মাত্র দুই দিনে পাল্টে গেল পার্বত্য চট্টগ্রাম। আবারও ঝরল রক্ত সবুজ পাহাড়ে। ৩ মে রাঙামাটির নানিয়ারচরে উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমাকে

গুলি করে হত্যা করা হয়। পরদিন তাঁর দাহক্রিয়ায় যাওয়ার পথে ব্রাশফায়ারে ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক প্রধান তপনজ্যোতি চাকমা বর্মাসহ পাঁচজন নিহত হন।

এর পর থেকে ফের পাহাড় উত্তপ্ত ও অশান্ত। খুনোখুনিতে জনমনে বাসা বেঁধেছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা-ভয়। বিস্তারিত জানাচ্ছেন : ফজলে এলাহী, রাঙামাটি

 

পার্বত্য চট্টগ্রামে খুনের রাজনীতির সূচনা হয় ১৯৭৬ সালে শান্তিবাহিনীর আত্মপ্রকাশের পর। সেই থেকে ১৯৯৭ সালে পার্বত্য শান্তিচুক্তির আগ পর্যন্ত শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র হামলা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অ্যাকশন, বাঙালিদের পাল্টা হামলা আর নানান সংঘাত-সংঘর্ষ-লড়াইয়ে প্রাণ হারান প্রায় ১০ হাজার মানুষ। তাঁদের মধ্যে ছিলেন নিজেদেরই বিদ্রোহী পক্ষের হামলায় নিহত শান্তিবাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাও। নিহত হয়েছিলেন দুজন উপজেলা চেয়ারম্যান, একজন পত্রিকা সম্পাদকসহ অনেকে। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর আলোচিত চুক্তির মাধ্যমে সন্তু লারমার নেতৃত্বে প্রায় দুই হাজার গেরিলা অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করেন। ধারণা করা হয়েছিল, চুক্তির পর বন্ধ হবে হানাহানি আর হত্যা। কিন্তু বিধি বাম!

চুক্তির পর অস্ত্র সমর্পণের দিনই এর বিরোধিতা করে যাত্রা শুরু করে পাহাড়িদের নতুন সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। ইউপিডিএফ আর শান্তিবাহিনীর রাজনৈতিক সংগঠন জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র বিরোধে আবার অশান্ত হয়ে ওঠে পাহাড়। শুরু হয় পাল্টাপাল্টি খুন ও অপহরণ। দুপক্ষের বিরোধে ঝরে ৬৫০ প্রাণ। ২০১০ সালে সন্তু লারমার জনসংহতি সমিতি থেকে বেরিয়ে জন্ম নেয় আরেক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (এম এন লারমা)। তাতিন্দ্রলাল চাকমা পেলে, সুধাসিন্ধু খীসা ও রূপায়ন দেওয়ানের নেতৃত্বে গঠিত দলটিও জড়িয়ে পড়ে সংঘাত-সংঘর্ষে। গত আট বছরে এই দলের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন প্রতিপক্ষের হামলায়। যাঁদের মধ্যে রয়েছেন শীর্ষ নেতা অ্যাডভোকেট শক্তিমান, চন্দ্রশেখর চাকমা, সুদীর্ঘ চাকমাও। তিনদলের পারস্পরিক হামলার মধ্যেই ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে যাত্রা শুরু করে ইউপিডিএফের বিদ্রোহীদের আরেক সংগঠন ইউপিডিএফ (ডেমোক্রেটিক)। দলটির সাবেক সশস্ত্র প্রধান তপনজ্যোতি চাকমা বর্মার নেতৃত্বে নতুন দলের আত্মপ্রকাশের পর তাদের হামলায় ইউপিডিএফের গুরুত্বপূর্ণ নেতা মিঠুন চাকমা, অনাদি রঞ্জনসহ অন্তত ৭ জন গুরুত্বপূর্ণ নেতা খুন হন গত পাঁচ মাসে। এই চারদলের বিরোধে পার্বত্য শান্তিচুক্তির পর প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় এক হাজার নেতাকর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষ। নিহতদের প্রায় ৯০ ভাগই ওই পাহাড়ি চারদলের নেতাকর্মী ও সমর্থক। আর বাকি ১০ ভাগ অপহরণ, গুম ও খুনের স্বীকার হওয়া বাঙালি।

সর্বশেষ গত ৩ মে নানিয়ারচরে উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমাকে নিজ কার্যালয়ের কাছেই গুলি করে হত্যা এবং পরদিন তাঁর দাহক্রিয়ায় যাওয়ার পথে ব্রাশফায়ারে ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক প্রধান তপনজ্যোতি চাকমা বর্মাসহ ৫ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় আবার উত্তপ্ত ও অশান্ত হয়ে ওঠেছে পাহাড়।

হঠাৎ পাহাড়ে এমন হত্যা আর লাশের মিছিলে উদ্বিগ্ন সুশীল সমাজ ও রাজনীতিবিদরা। তাঁরা অনেকে এর পেছনের কারণ খুঁজে বের করার অনুরোধ জানিয়েছেন। আবার অনেকে নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কার কথাও বলেছেন।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরূপা দেওয়ান বলেন, ‘পাহাড়ের এসব ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত, আমরা কেউ এমন ঘটনা আশা করি না। আমরা পার্বত্য এলাকার মানুষ শান্তিকামী। তাই প্রায় দীর্ঘ দু্ই যুগের অধিক সময় ধরে পার্বত্য অঞ্চলে চলা অরাজকতাকে দূর করে ১৯৯৭ সালে পাহাড়ে শান্তিচুক্তি করেছিলাম। শান্তিচুক্তির মধ্য দিয়ে আশা করেছিলাম পাহাড়ে শান্তি ফিরে আসবে। কিন্তু পাহাড়ে আবারও এমন অরাজকতা আমাদেরকে ভাবিয়ে তুলছে। আমার মনে হয় শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতার জন্য এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।’

‘আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পাহাড়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে’ এমন মন্তব্য করে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের পার্বত্যাঞ্চলের আহ্বায়ক প্রকৃতি রঞ্জন চাকমা বলেন, ‘সামনে জাতীয় নির্বাচন আর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা চলতে পারে বলে আমি মনে করি। কেননা, এমন কর্মকাণ্ড নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোন পথ অবলম্বন করলে এমন পরিস্থিতি সামলানো যাবে।’ যদি এখনই  সমস্যার সমাধান করা না হয় তবে সামনে পার্বত্য এলাকার মানুষের জীবনে এটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে বলে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেন সুশীল সমাজের এই প্রতিনিধি।

রাঙামাটির প্রবীণ সাংবাদিক সুনীল কান্তি দে বলেন, ‘এই ঘটনা দুঃখজনক। পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে এসব হত্যা, খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। কারো যদি কোনো দাবি দাওয়া থাকে, তবে সেটা রাজনৈতিকভাবে গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে, সেটাই যৌক্তিক। অস্ত্র দিয়ে জীবননাশ হবে, দাবি আদায় হবে না, এটা সবাইকে মাথায় রাখতে হবে।’

রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজী মোহাম্মদ মুসা মাতব্বর বলেন, ‘আমরা যে এতোদিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের দাবি জানাচ্ছি, এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সেটাই প্রমাণিত হয়েছে। এখানে আমাদের কারো জীবনই আর নিরাপদ নয়। এভাবে প্রকাশ্য দিবালোকে একজন নির্বাচিত ও জনপ্রতিনিধিকে গুলি করে হত্যা এবং তাঁর দাহক্রিয়ায় যোগ দিতে যাওয়ার পথে আবারও গুলি করে ৫ জনকে হত্যা করার ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামকে অবৈধ অস্ত্রমুক্ত করতে হবে এবং এর বিকল্প নেই।’

রাঙামাটি জেলা বিএনপির সভাপতি হাজি মো. শাহ আলম বলেন, ‘নিহতরা পাহাড়ি নাকি বাঙালি সেটি বিষয় নয়। এই ঘটনায় প্রমাণিত হয়েছে এখানে কারো জীবনই নিরাপদ নয়। এ জন্য সরকারের ব্যর্থতাই বেশি। কারণ প্রতিটি নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। সরকার চাইলে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা কোনো বিষয়ই নয়। আমরা মনে করি, পাহাড়ে মানুষের স্বাভাবিক মৃত্যু নিশ্চিত করতে সরকারকে এখনই এসব অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের নির্মূল করতে হবে। নতুবা এই অস্ত্রের কাছে আমাদের কারো জীবনই নিরাপদ থাকবে না।’

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ‘পাহাড়ে মৃত্যুর ঘটনায় বিএনপি-জামায়াতই দায়ি’ মন্তব্যকে ‘হাস্যকর’ উল্লেখ করে রাঙামাটি জেলা বিএনপির এই শীর্ষ নেতা বলেন, ‘এসব হালকা-চালের কথার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না। একজন জাতীয় পর্যায়ের নেতার এসব দায়িত্বহীন কথাবার্তা খুবই দুঃখজনক।’


মন্তব্য