kalerkantho

শ্রমিকের হাট

আসাদুজ্জামান দারা, ফেনী   

১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



শ্রমিকের হাট

‘বর্ষাকালে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয়। ঠিকমতো কাজ পাওয়া যায় না। ওই সময় নির্মাণকাজও কম থাকে। অনেক সময় দিনটাই বেকার চলে যায়।’

... কখনো কখনো এখানকার শ্রমিকরা রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ-মিছিলে যোগ দেন টাকার বিনিময়ে। এতে এক থেকে দুই ঘণ্টা সময় দিয়ে ৩০০ টাকার মতো পাওয়া যায় ...

 

ফেনী শহরের ট্রাংক রোডের খেজুর চত্বর। পূর্ব পাশে রহমানিয়া মিষ্টি মহল। প্রতিদিন ভোর হতে না হতেই এখানে জড়ো হতে থাকেন অসংখ্য মানুষ। এঁরা শ্রমজীবী। শ্রম বিক্রি করে থাকেন অর্থের বিনিময়ে। বেশির ভাগেরই বাড়ি ভিন্ন জেলায়।

ফেনীতে বহু বছর ধরে বসবাস করছেন সবাই। বিভিন্ন কলোনিতে থাকেন পরিবার নিয়ে। আবার অনেকের পরিবার গ্রামের বাড়িতে থাকেন। সারা মাস কাজ করে বাড়িতে টাকা পাঠালে তাতেই চলে সংসার। বউ ছেলেমেয়ে খেয়ে পরে বেঁচে থাকে।

লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতির বাসিন্দা আব্দুর রহমান (৬০)। একসময় এলাকায় ভিটে-জমি সবই ছিল। কিন্তু মেঘনার ভাঙনে সবই চলে যায় নদীগর্ভে। পরে পরিবার নিয়ে চলে যান চর আলেকজান্ডারে। সেখানে রাস্তার পাশে ঝুপড়ি বানিয়ে কিছুদিন বসবাস করেন। এক পর্যায়ে ২০০০ সালের শুরুর দিকে এক আত্মীয়ের সহায়তায় চলে আসেন ফেনীতে।

ফেনী শহরের বনানী পাড়ায় একটি বস্তিতে গত প্রায় ১৮ বছর ধরে পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করছেন তিনি। প্রতি দিন ভোরে ট্রাংক রোডের শ্রমিকের হাটে এসে দাঁড়ান।

কখনো নির্মাণাধীন ভবনে ঢালাইয়ের কাজ, কখনো উন্নয়ন প্রকল্পে মাটি কাটার কাজ, আবার কখনো গৃহস্থ বাড়িতে ধান সংগ্রহ থেকে শুরু করে নানা ধরনের কাজ করেন তিনি। তার এলাকার অনেকেই এখন ফেনীতে থেকে কাজ করছেন বলে জানান রহমান। দিনে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় হয় তার। কখনো কখনো রাতেও ঢালাইয়ের কাজ থাকে। তখন বাড়তি আয় হয়। ছেলে-মেয়েরাও ছোটখাটো কাজকর্ম করে পরিবারে সহায়তা করছে।

তিনি বলেন, ‘বর্ষাকালে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয়। ঠিকমতো কাজ পাওয়া যায় না। ওই সময় নির্মাণকাজও কম থাকে। অনেক সময় দিনটাই বেকার চলে যায়।’

তিনি জানান, শ্রমিকের হাটে অপেক্ষাকৃত জোয়ানদের কদর বেশি। তাঁরা কাজও কিছুটা বেশি করেন, আয়ও তাঁদের বেশি।

বাগেরহাট জেলার মোড়লগঞ্জের বাসিন্দা রহমত শেখ (৪০) তাঁর এক আত্মীয়ের হাত ধরে ফেনীতে আসেন প্রায় ১৪ বছর আগে। শহরের

সহদেবপুরে থাকেন তিনি। এলাকার মেয়ে বিয়ে করেছেন ফেনীতে এসে।

তিনি জানান, তাঁদের এলাকার অনেকে সহদেবপুরে বসবাস করছেন, কাজকর্ম করছেন। এখানে কয়েকটি কলোনিতে থাকেন তাঁরা। আয় রোজগার ভালোই। কেউ কেউ মাসে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন। অনেকে বাড়িতে দোচালা টিনের ঘরও নির্মাণ করেছেন। কেউ কেউ ছেলেমেয়ের লেখাপড়াও করাচ্ছেন।

রহমত জানান, নির্মাণাধীন ভবনের ঠিকাদারদের মাধ্যমে অনেক সময় ইট ওঠানো, ঢালাই ইত্যাদি কাজ পেয়ে থাকেন তাঁরা। এতে পরিশ্রম কিছুটা বেশি হলেও আয় বেশি।

ফেনীর ট্রাংক রোডের শ্রমিকের বাজার ঘুরে শ্রমজীবীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এখানে প্রতিদিন ভোরে চার শতাধিক শ্রমিক এসে উপস্থিত হন। এক ঘণ্টার মধ্যে তাঁরা ছড়িয়ে পড়েন চারদিকে। যাঁরা আগে থেকে কোন উন্নয়ন প্রকল্প বা নির্মাণাধীন ভবনে কাজ করেন-তাঁদের এখানে আসতে হয় না। তারা চলে যান সরাসরি কর্মস্থলে।

আবার কখনো কখনো এখানকার শ্রমিকরা রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ ও মিছিলেও যোগ দেন টাকার বিনিময়ে। এতে করে এক থেকে দুই ঘণ্টা সময় দিয়ে ৩০০ টাকার মতো পাওয়া যায়। আবার নানা অসুখ-বিসুখে অনেকে কাজে যেতে পারেন না। ফলে তাঁদের খোরাকি চালাতে কষ্ট হয়। তবু ফেনীতে এসে কিছু আয় করতে পারছেন, পরিবার নিয়ে খেয়ে পরে বেঁচে আছেন-এজন্য খুশি তাঁরা।

 


মন্তব্য