kalerkantho


অধিকার প্রতিষ্ঠায় নারীরা বিভক্ত

৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



অধিকার প্রতিষ্ঠায় নারীরা বিভক্ত

আধুনিক যুগে অনেক কিছুর পরিবর্তন হলেও পিছিয়ে আছে আমাদের ধ্যান-ধারণা এবং মানসিকতা। নানান নিয়মের কুসংস্কারগুলোকে রীতিনীতি বলে চাপিয়ে আমরা অনেকটা পিছিয়ে আছি। যেখানে সভ্যতার আধুনিক বিশ্ব, আধুনিক নগরায়ন, আধুনিক পরিবেশ ও পরিবার যখন গঠন করা হচ্ছে, তখন সেখানে আমাদের আধুনিক মন মানসিকতার বড়ই অভাব দেখা দিচ্ছে। নারীরা আজো মন থেকে বের হতে পারেনি বদ্ধ ঘর থেকে। পারেনি আজো আলোকে বরণ করে তেজের মশাল দ্বারা কুসংস্কারগুলোকে পুড়িয়ে ছাই করতে। আজো যাদের শুধু কন্যা সন্তান থাকে তাদের সব সময় শুনতে হয় তোমার পুত্র সন্তান নেই কেন? পুত্র না থাকলে বংশ রক্ষা হবে কি করে? বংশ রক্ষার্থে একটা পুত্র সন্তান প্রয়োজন। এখন কথা হল আগেকার দিনে মেয়েদের পড়াশোনা করতে দেওয়া হতো না, ঘরের বাইরে কাজ করতে দেওয়া হতো না।

কিন্তু এখন সময় পাল্টেছে মেয়েরা এখন উচ্চশিক্ষা লাভ করছে এবং বাইরে বড় বড় প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে কাজও করছে। এমনকি অনেক মেয়েরা পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্বও পালন করছে। এতকিছু পরিবর্তন হলে শুধু বংশরক্ষার ক্ষেত্রে কেন নয়? আমি জানি না, এই প্রশ্নের উত্তর কয়জন নারী খুঁজেছে। কারণ যুগের সাথে সব পরিবর্তন হলেও পরিবর্তন হয়নি মানসিকতা। নারীরা আজ শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও সশিক্ষায় কতটা শিক্ষিত হতে পারছে? আর যদি হয়ে থাকে তবে কেনই বা সাহসের সাথে প্রকাশ করতে পারছে না? এর প্রধান কারণ নারীরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি। অবশ্য এর পেছনে রয়েছে বিশেষত অন্ধকার এক ইতিহাস। যখন থেকে নারীদের অধিকার খর্ব করা হয়েছিল এবং আস্তে আস্তে পিতৃতন্ত্র শাসক হিসেবে শোষণ করতে থাকে তখন থেকে নারীরা হয়ে ওঠে পরাধীনতার শৃঙ্খলে বাঁধা কাঠ-পুতুল মাত্র। যে জাতি বেশি শোষিত তাদের ক্ষেত্রে নিজ আত্মতৃপ্তিটাই মুখ্য হয়ে ওঠে সার্বিক ভূমিকা থেকে। আমরা আজ যেই নারী জাতিকে দেখছি নিয়মের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে আছে পিতৃতন্ত্রের কাছে, এক সময় পরিস্থিতিটা সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। সভ্যতার গোড়ার দিকে (পাথর যুগে) মানুষ বেঁচে থাকার তাগিদে দলবদ্ধ হয়ে বাস করত এবং তাদের মধ্যে এক ধরনের সমাজ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেছিল। তখন এসব আদি সমাজগোষ্ঠীর সম্পর্ক রক্ষা করা হত মায়ের দিক থেকে। মা ছিলেন গোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় চরিত্র বা গোষ্ঠীপতি এবং সমাজ ছিল মাতৃতান্ত্রিক। সমাজে তখন সাম্য বিরাজ করত এবং সেখানে কোনো অসমতা ছিল না। বর্তমানেও আমরা পাহাড়ি আদিবাসীদের মধ্যে এমন সমাজ ব্যবস্থা দেখতে পাই। যাই হোক, আদিম সমাজ ছিল নারীশাসিত। কিন্তু পরবর্তীতে (ধাতব যুগ) যখন উৎপাদনের ক্ষেত্রে পরিবর্তন সূচিত হলে তখন সমাজে আস্তে আস্তে পরিবর্তন দেখা দেয় কারণ সেই যুগে ধাতব হাতিয়ারের ব্যবহার শুরু হলে নারীর তুলনায় পুরুষের শক্তি বেশি কাজে লাগে ফলে সমাজ তখন পুরুষশাসিত সমাজে পরিণত হয় এবং পুরুষ তখন দিনে দিনে ক্ষমতাধর হয়ে ওঠে। নির্মমভাবে শক্তির কাছে পরাজয় মেনে নিতে হয় নারী জাতির। সেই থেকে আজো নারীরা পরাজয়ের মালাকে ধারণ করে রেখেছে।

তবে কিছু নারী এই ধারাবাহিকতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বের হয়ে এসেছিল, চেয়েছিল নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু কতটা সার্থক হতে পেরেছে তা আজো প্রশ্নবোধক চিহ্ন রয়ে গেল। তবু তাদের অসীম সাহসিকতাকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। যাদের অবদান সমাজে অনস্বীকার্য। হয়ত তাদের কারণে নারীর পথ এতটা হলেও প্রসার হতে পেরেছিল। অন্ধকারে আচ্ছন্নে থাকা নারীদের পথ দেখাতে একজন নারী যিনি আলোর মশাল হাতে নিয়েছিলেন তাঁর অবদান কোনো যুগে কেউ ভুলতে পারবে না।

হ্যাঁ, তিনিই একজন মহীয়সী নারী যাঁর নাম ‘রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন’ যিনি বেগম রোকেয়া নামে পরিচিত। বাঙালি নারী জাতির অগ্রগতিতে যিনি অসামান্য ভূমিকা রেখে গেছেন। তিনি বাঙালি নারী জাতির বুকে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে জ্বলবেন চিরদিন। নারীর নতুন জীবন দানে দুজন পুরুষের নাম না বললে নয়। একজন ‘রাজা রাম মোহন রায়’। যিনি সতীদাহ প্রথা আইনের মাধ্যমে উচ্ছেদ করেছিলেন। দিয়েছিলেন হিন্দু অসহায় নারীদের প্রাণ ফিরিয়ে। পরবর্তীতে সেই প্রাণের সঞ্চার করার চেষ্টায় ‘ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর’ প্রণয়ন করেছিলেন হিন্দু বিধবা বিবাহ প্রথা। কিন্তু দুঃখের বিষয় আজো কি নারীরা পেয়েছে তাদের নতুন প্রাণ? সেই সতীদের আর্তচিৎকার বাতাসে ধ্বনিত হয়, আজো বিধবারা কাঁদছে পিতার রাজত্বে। সত্যি! যদি আজ কেউ তাঁদের শিক্ষার অনুসারী হয়ে এগিয়ে আসত! যদি আবার ফিরে আসত বেগম রোকেয়ার মতো কেউ। হয়ত নারী জাতির পথ অবরুদ্ধ করার পথ থাকত না। দুঃখ শুধু আজো বেশ কিছু নারীরা সগোত্রের সাথে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মেতে থাকে। যেই আলোর মশাল হাতে নিয়ে অন্যকে পথ দেখানোর কথা সেখানে তারা নিজেই অন্যের চলার পথকে রুদ্ধ করার প্রয়াসে অপচেষ্টা চালিয়ে যায়। অন্যের শ্রীবৃদ্ধিতে কাতর হয় এবং বিভিন্নভাবে তাকে পরাস্ত করতে চেষ্টা করে যায়। কটুকথা কিংবা অপবাদের অস্ত্রাঘাতে জর্জরিত করার অভিপ্রায়ে লিপ্ত থাকে। এমন মানসিকতা শুধুই কষ্টের বোঝা বৃদ্ধি করে সমাজে। তবু আলো হয়ে কিছু শক্তি জ্বলেছে এবং জ্বলবে। যেমনটা এসেছিলেন বেগম রোকেয়া।

শুধু বর্তমান অবস্থায় প্রত্যাশা করি-বাঁচার তাগিদে, মুক্তির তাগিদে, নতুন জীবনের জয়যাত্রার সূচনায় যেন খুঁটিনাটি পরিহার করে সবাই একই হাতে হাত রেখে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার শপথে এগিয়ে যেতে পারে। বৃহৎ কিছু পাওয়ার জন্য আমরা কি পারি না ক্ষুদ্রকে ত্যাগ করতে? নারী দিবসকে সামনে রেখে আমার পক্ষ থেকে সমগ্র নারীর প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

টুম্পা ভট্টাচার্য, খুলশী, চট্টগ্রাম।



মন্তব্য