kalerkantho


‘অধিকার আদায় করে নিতে হয়’

৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



‘অধিকার আদায় করে নিতে হয়’

আন্তর্জাতিক নারী দিবস আগামীকাল ৮ মার্চ। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে পালিত হবে দিবসটি। রাষ্ট্র, সমাজ ও জীবনের নানা ক্ষেত্রে নারীর অধিকার আদায়ের উজ্জ্বল দিন এটি। নারী দিবস ঘিরে চার নারীর ভাবনার কথা শোনাচ্ছেন : মোবারক আজাদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

নারী দিবস বিশেষ কোনো গুরুত্ব বহন করে না

ফারজানা করিম

সহকারী অধ্যাপক

যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

নারী যখন সকল শক্তির নাম তখন নারীই আবার মানুষের পৃথিবীতে একমাত্র প্রাণী, যে কিনা দুর্বল, ভীতু সর্বোপরি আবেদনময়ী ও পরজীবী। সমকালে নারী এগিয়েছে ঠিকই। কিন্তু মানুষের মতো তথা পুরুষের মতো নয়। তাইতো এখনো আরো অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে।

মিডিয়া নিয়ে ভাবি বলে এখনো চোখে পড়ে নারী বিক্রী হচ্ছে পত্রিকার পাতায়, টেলিভিশনের পর্দায়। ছোট দুটি উদাহরণ দিলে তা স্পষ্ট হবে। পত্রিকার পাতায় ধর্ষণ সংবাদ ছাপা হয়। বিশ্লেষণে দেখা যায়, ধর্ষক হিরো আর ধর্ষিতার সব শেষ এখনি তার আত্মহত্যা করে সমাজকে মুক্ত করা দরকার। তা নাহলে ধর্ষিতার ছবি নাম ঠিকানা চেহারা কেমন, ধর্ষণের সময় কী পরিধান করেছিল তার বিস্তারিত আলাপ কোনো সভ্য জাতি করতে পারে কি?

অপরদিকে কখনো ধর্ষকের নাম ঠিকানা ছবি তো দূরের কথা, বলা হয় না কি পরিধান করেছিল সেই ধর্ষক। তবে কায়দা করে বলা হয় ধর্ষকের বয়স কত। এ যেন পুরুষতন্ত্রের ইন্দ্রিয়ে মনস্তাত্ত্বিক অবলোকনের পথকে সহজ করা। শুধু তাই নয়, অশ্লীল শব্দের অপর পিঠে পুরুষ নয় নারী শব্দকে প্রতিষ্ঠিত করেছে মিডিয়া। তাই অশ্লীল ছবি হয় নারীর, পুরুষের নয়। ভাবনার জগতে ভোগের সামগ্রী নারী।

এবার চোখ রাখি টেলিভিশনের পর্দায়। নারিকেল তেল বিক্রী বাড়ানোর কৌশলে নির্মাতা হাত দিয়েছেন অন্দর মহলে। নারী নির্যাতনের সহজ সমাধান বাতলে দেন চুল ছোট করে ফেল। যাতে হাত দিয়ে চুল ধরা না যায়। মার খেতে না হয়। পরক্ষণে ত্রাতা হিসেবে ভেসে আসে পুরুষ কণ্ঠ। বলে ওঠে এক চুলও ছাড় নয় নারী নির্যাতনে। নির্যাতিতা মহিলা তার করুণ দৃশ্যে বন্দি হলেও উহ্য থাকে সেই পুরুষ। নারী চিত্রিত হয় দুর্বল, পরজীবী বস্তুতে।

তাই একটি দিন নারী দিবস বিশেষ কোনো গুরুত্ব বহন করে না, যদি না আমরা পুরুষতন্ত্রের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে না পারি। মিডিয়া আজো পুরুষদের দখলে। নারীকে মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করে যদি পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা বাড়াতে পারা যায়, তবে মঙ্গল হবে দেশ, সমাজ তথা বিশ্বের। অপেক্ষা সেই দিনের।

লোক দেখানো নারী দিবস চাই না

রোকসানা তাসনিম বুশরা

যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ

চতুর্থ বর্ষ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

প্রতিবছর নারী দিবস পালনের কারণে নারীদের অবস্থান একটা ভিন্ন জায়গায় এসেছে। অধিকার আর মর্যাদায় নারী-পুরুষ সমানে সমান-এটাই নারী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।

মানুষ হিসেবে একজন নারীও পরিপূর্ণ। নারী কি কখনও পুরুষের পেছনে ছিল? এখনও আমরা দেখি কর্মক্ষেত্রে নারীর মজুরি পুরুষের চেয়ে কম। আশাকরি খুব শিগগিরই সব বাধা অতিক্রম করে নারীরা এগিয়ে যাবে।

নারী স্বাধীনতা এখন আগের চেয়ে বেশি। এখন নারীরা নানা ধরনের কাজ করে এগিয়ে যাচ্ছে। তবু এখনও অনেক কিছুই নারীদের জন্য নিরাপদ নয়। যেমন মেয়েরা এখনও রাত করে ঘরে ফিরলে বাবা-মা বকা দেন। ছেলেদের ক্ষেত্রে এতোটা দেখা যায় না। চারপাশের পরিবেশটায় এর জন্য দায়ী।

তবে সবশেষে বলতে চাই ছেলেমেয়ে সবাই যে যার দিন থেকে সেপশাল।

তাই লোক দেখানো দিবস না হয়ে এটা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা উচিত। একজন মুক্তমনা, শিক্ষিত, রুচিশীল, সংগ্রামী, আদর্শ মা-ই পারেন তার কন্যাকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে। পুরুষকেও এজন্য সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে।

সম্মানটা নারীকেই অর্জন করে নিতে জানতে হবে

সুকর্ণা খাস্তগীর

সহকারী শিক্ষক

শ্রীপুর খরন্দ্বীপ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, বোয়ালখালী, চট্টগ্রাম

বছরের একটি দিন নারীদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হয়ে সভা, মিছিল, মিটিং করা হয় ঠিকই, কিন্তু আদৌ এতে নারীদের কোনো মর্যাদা বাড়ে কিনা তা ভাবনার বিষয়। নারীরা দুর্বল-এ কথা মানতে আমি নারাজ। নারীরা পৃথিবীর সব চেয়ে ধৈর্যশীল ও শক্তিশালী।

আজকের নারীরা চার দেয়ালের মাঝে বন্দি নয়। সে জানে সে কি চায়। একহাতে সে ঘর-বর-অফিস সব সামলায়। কন্যাসন্তানই বাবা মাকে আগলে রাখে। হোক সে গৃহিণী, ডাক্তার, পুলিশ অফিসার কিংবা শিক্ষক। সব দিক এক হাতে সামলানোর ক্ষমতা একমাত্র নারীরই আছে।

অধিকারের প্রশ্ন আর মর্যাদার প্রশ্নে পুরুষ নারীকে তার সমকক্ষ হিসেবে স্বীকার করতে দ্বিধা করে। অনেক সময় শারীরিক, মানসিক ও বস্তুগত বৈষম্যের দৃশ্যমান ও অদৃশ্য দেয়াল তুলে তাকে বুঝিয়ে দিতেও কুণ্ঠা করে না যে নারী একটি দ্বিতীয় শ্রেণির ভোগ্যপণ্য বা প্রাণিবাচক অস্তিত্ব।

তাই কিছু ব্যতিক্রম সহজভাবে মেনে নিয়েই বলতে হচ্ছে নারীর সত্যিকার অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আমাদের আরো অনেক পথ হাঁটতে হবে। তবে পুরুষকে আমি প্রতিপক্ষ মনে করি না। বরং দুজন এক সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করলে উন্নতি বৈ অবনতি ঘটবে না। চোখ রাঙানি কিংবা

করুণা দিয়ে আমার কাজ নেই। সম্মানটা আমাদের নারীদেরই অর্জন করে নিতে জানতে হবে। নিজে কাজ করে অর্থ উপার্জন করার মধ্যে আনন্দ আছে। নিজেকে ছোট মনে না করে আত্মবিশ্বাসী হয়ে গড়ে ওঠা উচিত।

যদিও সব ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি বাধার সম্মুখীন হতে হয় আমাদের। আজকাল নারীদের নিরাপত্তার অভাব অনেক বেশি। খবরের কাগজে ধর্ষণ, গৃহবধূ নির্যাতনের ঘটনা প্রায়ই ওঠে আসে। নৈতিকতার শিক্ষার বড্ড অভাব। জানি না আরো কত নারী দিবস আসলে অবস্থার উন্নতি ঘটবে। এই ঘুণে ধরা সমাজের জন্য নারী দিবস যেন ধারহীন তরবারি। পরিবার আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। পারিবারিক শিক্ষা যথার্থ হলে একজন পুরুষ আরেকজন নারীকে সম্মান করতে শিখবে, একজন নারী আরেকজন নারীকে তথা নিজেকে সম্মান করতে শিখবে। সামনে আরো দীর্ঘ বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হবে নারীদের। নারী ও পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা সকল বাধা অতিক্রম করে সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠা করব-এটাই হোক নারী দিবসের প্রতিজ্ঞা।

যুগে যুগে এগিয়ে যাবে নারীরাই

নারগিস আক্তার সুমি

চান্দগাঁও, চট্টগ্রাম

পাঁচ বছরের ছোট অনন্যা। সবার মুখে যেন একই কথা তার দুরন্তপনা। মেয়ে বলে কথা! মেয়েলিপনা শেখাতেই যেন সবাই ব্যস্ত। মনকে মানাই সবার কথায় কি আসে যায়? যখন আমার মা বলে বসলেন, এতটুকু বাচ্চা মেয়ে ভয়ের ছিটেফোঁটা নেই যেন। এই বয়সে আমাদের বাচ্চারা বড়দের কত ভয় পেত। যদিও মা কষ্ট পাবেন ভেবে কত কথায় বলা হয়ে ওঠেনি জীবনে। কিন্তু এবার আর পারলাম না, বলেই বসলাম, তুমি চেয়েছ আমাকে তোমার ছায়া করে গড়ে তুলতে পেরেছও বটে। কি লাভ হয়েছে বলতে পারো? কথা বলতে এত সামলে বলতে শিখিয়েছ, সামনে বলতে গিয়ে বলা হয়ে ওঠেনি যা বলতে চাই।

দ্বিধা-দ্বন্দ্বে সত্যকে সত্য বলতে ভয় পাই। মিথ্যাকে মিথ্যা বলতে পারি না। ভয়ের প্রথম পর্বটাই শুধু শিখিয়েছ। তারপর শেখাতে হয়নি কোন কিছুই। ধারাটা এমন ছিল যে আর থামেনি। ভয়ে কাটছে আজও জীবন। না মা আমি চাই না আমার কার্বন কপি হোক আমার মেয়ে। আমি চাই আমার মেয়ে হবে স্পষ্টবাদী, নির্ভীক, ওর নামের মতোই অনন্যা। আমার ভয় পেয়ে থেমে যাওয়া মুহূর্তে সে আমার হাত ধরে বলবে, আমি আছি মা, থেমে যেও না। কিছু কথা মাকে বলা হল কিছু কথা যে বাকি রয়ে গেল।

কবি নজরুলের মতে,

‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়েছে নারী অর্ধেক তার নর।’

কোনো দূরে নয় তোমার খুব কাছেই তোমার উপমা। তুমি বেগম রোকেয়া, জাহানারা ইমাম, সুফিয়া কামাল, ওয়াসফিয়া নাজনীন। অতুলনীয় নারী তুমিই যে তোমার উপমা।

কারণ একটি মেয়েই একজন মা। আমি সন্তান জন্ম দিতে পারি। আমার হাতে অনেক কিছুই আছে, বলতে গেলে আমার হাতে পুরো জাতি। এই বিশ্বাসটা যদি নিজেদের মধ্যে থাকে, তাহলে নারী দিবসের প্রয়োজন হবে না। এমনিতে নারী যুগে যুগে এগিয়ে যাবেন।



মন্তব্য