kalerkantho


কবুতর পালন করে স্বাবলম্বী দুই যুবক

৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



কবুতর পালন করে স্বাবলম্বী দুই যুবক

আকর্ষণীয় রংয়ের কবুতরগুলোর ছবি ও দাম লিখে আপলোড করা হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে। সেই ছবি ও দাম দেখে ক্রেতা বেছে নেন পছন্দের কবুতর। এভাবেই কবুতরের জমজমাট ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের দুই যুবক। আর দিন দিন চাহিদা বাড়তে থাকায় নিজ নিজ বাড়িতে তাঁরা গড়ে তুলেছেন কবুতর খামার। তাঁদের উদ্যোগ বেকারত্ব নিরসনে অন্যদের জন্য অনন্য উদাহরণে পরিণত হয়েছে। বিস্তারিত জানাচ্ছেন : সৌমিত্র চক্রবর্তী, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)

 

সীতাকুণ্ডের মুরাদপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ রহমতনগর গ্রামের দুই যুবক রায়হান উদ্দীন ও সুমন। এলাকায় ‘কবুতরপ্রেমী’ হিসেবে বেশ পরিচিত তাঁরা। কোথাও কোনো সুন্দর বা দুর্লভ প্রজাতির কবুতর দেখলেই সেটি কিনে নিয়ে আসেন তাঁরা। তারপর কবুতরটির বংশ বিস্তারের মাধ্যমে তাঁদের সংগ্রহকে সমৃদ্ধ করে বাজারজাত করতে থাকেন। এভাবে কবুতর পালন করেই তাঁরা এখন স্বাবলম্বী।

লোকমুখে এসব তথ্য জেনে সুমন ও রায়হানের কবুতরের খামার ঘুরে দেখা যায়, দুটি খামারে বেশ কয়েকরকম কবুতর রয়েছে। কবুতর ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সুমন জানান, ২০১৭ সালে উপজেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে কবুতর পালন বিষয়ে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেন তিনি। এখানে কবুতর পালন বিষয়ে বিস্তারিত জেনে ট্রেনিং শেষে যুব উন্নয়ন থেকেই ৩০ হাজার টাকা ঋণ গ্রহণ করেন। এই টাকা পুঁজি করে কবুতর, খাঁচা, খাদ্য ও ওষুধ ক্রয় করেন। এর পর বাড়ির ছাদে খাঁচা রেখে কবুতর পালন শুরু হয়। এখন তাঁর কাছে বিদেশি কবুতরের মধ্যে লাহোর জাতের ও রেচার হোমা কবুতর বেশি আছে। এ কবুতরগুলোর মূল্য কয়েক লাখ টাকা। সেই ৩০ হাজার টাকার পুঁজি থেকে তিনি এখন সচ্ছল।

জানতে চাইলে মোহাম্মদ সুমন বলেন, ‘লাহোর ও রেচার হোমা কবুতর দেখতে খুবই সুন্দর, আকর্ষণীয়। কবুতরগুলো ছয় মাস বয়স হলেই ডিম দেয়। ডিম থেকে ১৮ দিন পর বাচ্চা ফুটে। এর ২০ দিন পর আবারো ডিম দেয়। এভাবে বছরে একাধিক বার বাচ্চা পাওয়া যায়। এক জোড়া লাহোর কবুতর প্রায় ২০ হাজার টাকায় এবং বেলজিয়াম রেচার হোমা প্রতিজোড়া চার হাজার টাকায় বিক্রি হয়।’

এছাড়া বিভিন্ন দামের কবুতর বিক্রি করেন তাঁরা। কবুতরগুলো ফেসবুকে পেইজ খুলে বিক্রি করায় দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিলসহ অন্য কোনো ঝামেলা নেই। নির্দিষ্ট দিন বা সময়ে হাটে নেওয়ার জন্য অপেক্ষাও করতে হয় না।

‘সিটিজি অন লাইজ পিজন বায় অ্যান্ড সেল্স’ নামে পেজটির ফলোআরের সংখ্যাও প্রচুর। তাই কোনো কবুতরের ছবি ও দাম আপলোড দেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই ক্রেতার খবর আসে। পরে দরদাম করে বিক্রি হয়। এভাবেই ব্যবসা করে তাঁরা দুজন এখন সফল ব্যবসায়ী। সুমন কবুতর পালন ও বিক্রির ব্যবসার পাশাপাশি চট্টগ্রামের ষোলশহর দুই নম্বর গেট এলাকার একটি পলিটেকনিক কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করেছেন।

অনলাইনে কবুতর ব্যবসায় সফল সুমনের প্রতিবেশী অপর যুবক রায়হান উদ্দীন।

কবুতর পালন ও ব্যবসা প্রসঙ্গে রায়হান বলেন, ‘বরাবরই কবুতর আমার কাছে খুব ভালো লাগত। ২০০৫ সালের দিকে শখের বসে দেশীয় জাতের দুই জোড়া কবুতর পালন শুরু করি। এই কবুতরগুলো পোষ মানার পর প্রতিদিন উড়ে এসে আমার গায়ে বসত, হাত থেকে খাবার খেত।’

এসব তাঁর কাছে খুবই ভালো লাগত। একসময় তিনি আরো কবুতর কিনে আনতে থাকেন। কবুতরগুলোর জন্য অনেক খাঁচা বানিয়েছেন তিনি। ঘরের বারান্দায় তিনি কবুতরের খাঁচাগুলো স্থাপন করেছেন।

বর্তমানে বিভিন্ন জাতের ৩০ জোড়া কবুতর আছে তাঁর। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য লাহোর, ব্ল্যাক লাহোর, ব্ল্যাক চেকার, ব্লুচেকার, ব্লুবার, গ্রেভার, গিরিবাজসহ বিভিন্ন দেশি জাতের কবুতর আছে। এর মধ্যে ব্লু বার্লেস নামক এক জাতের কবুতর প্রতিজোড়া ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।

বর্তমানে ফেসবুকে তাঁদের ওই পেজে এসব কবুতরের বিজ্ঞাপন চলছে। সুমন ও রায়হান জানান, তাঁদের পেজে ৪০ হাজারেরও বেশি ফলোআর আছেন। সীতাকুণ্ডেরও ২০ জনের মতো কবুতরপ্রেমী আছেন তাঁদের গ্রুপে। সবাই নিজের কবুতরের বিজ্ঞাপন প্রচার করেন সেখানে।

তাঁদের মতে, অনলাইনে বিজ্ঞাপন প্রচারের সুবিধা হলো, ওই পেজে কবুতর নিয়ে স্ট্যাটাস দিলে তা সব ভিজিটরের কাছে নোটিফিকেশনের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে যায়। ফলে সবাই দেখতে পান। যার প্রয়োজন তিনি নক করে ইনবক্সে দরদাম করেন।

এরপর মোবাইল ব্যাংকিয়ের মাধ্যমে টাকা পাঠিয়ে পছন্দের কবুতর কিনে নেন। এভাবেই চলছে তাঁদের ব্যবসা। এই অনলাইন পদ্ধতিতে কবুতর বিক্রি তাঁরা দুজনেই বেশ উপভোগ করছেন বলে জানান।

উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. শাহআলম বলেন, ‘কবুতর পালন একটি লাভজনক ব্যবসা। অনেক যুবক এ ব্যবসায় লাভবান হচ্ছেন। ২০১৬-১৭ সালে আমরা ৪০ জন করে মোট ৮০ জনকে কবুতর পালন বিষয়ে ট্রেনিং দিয়েছি। এর মধ্যে ২২ জনের মতো কবুতর পালনে সফল হয়েছেন।

সম্প্রতি সফল যুবকদের মধ্যে সুমন ও রায়হান উপজেলায় উন্নয়ন মেলায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের স্টলে নিজের কবুতর নিয়ে অংশগ্রহণ করেন। তাঁদের কবুতর সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। যুব উন্নয়নের স্টল তৃতীয় স্থান লাভ করে।’



মন্তব্য