kalerkantho


মুক্তিযুদ্ধের গল্প
রাউজানের মুক্তিযোদ্ধা হাসেম চৌধুরী

রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ শুনে যুদ্ধে যাই

জাহেদুল আলম, রাউজান (চট্টগ্রাম)   

৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ শুনে যুদ্ধে যাই

মহান মুক্তিযুদ্ধে রাউজানে মুক্তিযোদ্ধাদের ১০-১২টি গ্রুপ সক্রিয় ছিল। এর একটির নেতৃত্বে ছিলেন কদলপুরের মো. হাসেম চৌধুরী। তাঁর নেতৃত্বে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে রাজাকার ও হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বেশ কিছু সফল অপারেশন পরিচালিত হয়েছে। ওই সময় তিনি রাজাকার বাহিনীর হাতে একবার আটকও হয়েছিলেন।

সরকার মুক্তিযোদ্ধা ভাতা দেওয়া শুরু করলে অনেক বছর তিনি ভাতার জন্য আবেদন করেননি। পরে সহযোদ্ধাদের পীড়াপীড়িতে ২০০৮ সাল থেকে ভাতা গ্রহণ করছেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. হাসেম চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কিছু পাওয়ার আশায় যুদ্ধ করিনি। রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ শুনে দেশ স্বাধীন করার জন্য, মানুষের মুক্তির জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছি।’

মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হাসেম চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৭১ সালে যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি রাউজান গ্রুপ-৯ কমান্ডারের নেতৃত্বে দিয়েছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন ছয়জন। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দেওয়ার পর মন স্থির করি মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করব। তাঁর ডাকে উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৯৭১ সালের জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে আমিসহ ১২ জন রামগড় সীমান্ত দিয়ে ভারতের হরিনা গিয়ে প্রাথমিক ট্রেনিং নিই। এরপর ত্রিপুরা রাজ্যের অম্পি ক্যাম্পে বাংলাদেশ এবং ভারতীয় যৌথ সেনাবাহিনীর দেওয়া উচ্চ পর্যায়ের অস্ত্র ট্রেনিং নিই। ওই ট্রেনিং ক্যাম্পে ৫টি কোম্পানি ছিল। এক কোম্পানিতে ২০০ জন করে ট্রেনিং নিতেন। ট্রেনিং ক্যাম্পটিতে আমরা দ্বিতীয় ব্যাচে ট্রেনিং নিই। অম্পি ট্রেনিং ক্যাম্পে আমি কিছুদিন কোয়ার্টার মাস্টারের দায়িত্বও পালন করি। এরপর আমরা ১২ জন ট্রেনিং নিয়ে দেশের রামগড় সীমান্তে চলে আসি। সেখানে হেডম্যান অপারেশন করি। পরে আমরা বিভক্ত হয়ে যাই। আমার নেতৃত্ব ৬ জন মুক্তিবাহিনী ফটিকছড়ি ও রাউজান হয়ে রাউজান রাবারবাগানে চলে আসি। ওই দিন সন্ধ্যায় সর্বপ্রথম আমার বাড়ির পাশে আবদুল হামিদ ফকিরের বাড়িতে আমরা আশ্রয় নিই।’

অপারেশনের বর্ণনা শুনুন তাঁর মুখে, ‘প্রথম রাজাকারবিরোধী ও হানাদার বাহিনীবিরোধী অপারেশন করি পূর্ব গুজরার বড় ঠাকুরপাড়া, দ্বিতীয় অপারেশন করি পশ্চিম গুজরা ইউনিয়নের মগদাই।

তৃতীয় অপারেশনে কাপ্তাই সড়কের বিদ্যুতের গ্রিড লাইন ধ্বংস করি। এরপর আধারমানিক, রাউজান রাবারবাগানে রাজাকার দালালবিরোধী অপারেশন করি। কদলপুরের ঈশান ভট্টের হাট এলাকায় রাজাকারবিরোধী অপারেশন করার সময় আবদুল হক নামে এক রাজাকার মারা যায় এবং কয়েকজন রাজাকার আহত হয়। এরপর রাউজান ইউনিয়নের মোহাম্মদপুরে রাজাকারের অবস্থানের কথা জেনে সেখানে গোলাগুলি শুরু করি। যুদ্ধকালীন সময়ে একদল রাজাকার ডাকাত আধারমানিক এলাকায় ডাকাতি করে জয়বাংলা স্লোগান দিয়ে চলে যায়। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। এরপর আমরা রাজাকার ডাকাতদের বিরুদ্ধে অপারেশন করি। ওই অপারেশনে তিন ডাকাত মারা যাওয়ার পর সাধারণ মানুষের মাঝে মুক্তিবাহিনীর ওপর বিশ্বাস ফিরে আসে। এয়ার ভাইস মার্শাল সুলতান মাহমুদ মদুনাঘাট পাওয়ার স্টেশনে (বিদ্যুৎ স্টেশন কেন্দ্র) অপারেশন করতে আসেন। তখন আমার গ্রুপ-৯সহ দক্ষিণ রাউজানের সকল কমান্ডার গ্রুপ মদুনাঘাটের হালদা নদীর পূর্ব পাড় থেকে তাঁকে সহায়তা করি। ওই অপারেশনে পাওয়ার হাউসটি ধ্বংস করা হয় এবং তখন দুই পাকিস্তানি মারা যায়। পরবর্তীতে ঢালারমুখ এলাকায় রাজাকার কমান্ডার হানিফ ও ডেপুটি কমান্ডার ইউসুফ আমাকে বন্দী করে। এ সময় তারা নিজেরা আমাকে নিয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

কেউ বলে আমাকে শত্রুবাহিনীর হাতে তুলে দিতে, কেউ না দেওয়ার পক্ষে ছিল। এক পর্যায়ে তাদের দ্বন্দ্বের মধ্যে আমিও কৌশল নিই। পরে তারা আমাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।’

মো. হাসেম চৌধুরী বলেন, ‘কিছু পাওয়ার আশায় যুদ্ধ করিনি। এজন্য ২০০৮ সালের আগে কোনো মুক্তিযোদ্ধা ভাতা গ্রহণ করার চিন্তা করিনি। ২০০৮ সাল থেকে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা গ্রহণ করি। আমার এখন স্বপ্ন হচ্ছে রাজাকারমুক্ত দেশ এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দ্রুত শেষ করা। এদেশের সকল রাজনৈতিক দলের কাছে আহ্বান জানাই, তারা যাতে শোষণমুক্ত রাষ্ট্র গঠন করে জনগণের জন্যে কাজ করে যায়।’

উল্লেখ্য, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. হাসেম চৌধুরী কদলপুর এলাকার মৃত নুরুল হক ও মৃত মর্তুজা বেগমের ছেলে।

তিনি ১৯৭৩ সালের আগে ন্যাপ (মোজাফফর) এ রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ’৭৩ এর পর আওয়ামী লীগে যোগদান করেন তিনি।



মন্তব্য