kalerkantho


ফেনী

ফসলি জমির মাটি ইটভাটায়

আসাদুজ্জামান দারা, ফেনী   

৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ফসলি জমির মাটি ইটভাটায়

ফেনীতে কৃষিজমির মাটি চলে যাচ্ছে ইটভাটায়। ফলে উর্বরা শক্তি হারাচ্ছে জমি। এসব জমিতে ফসল হচ্ছে না। কয়েকটি ভাটায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালিয়েও থামানো যাচ্ছে না মাটি কর্তন।

জেলা রাজস্ব অফিস সূত্রে জানা গেছে, ৯২৮.৩৪ বর্গমাইল আয়তনের ছোট এই ফেনী জেলায় লাইসেন্সভুক্ত ইটভাটার সংখ্যা হচ্ছে ১০৫টি। তার মধ্যে ফেনী সদরে রয়েছে ৫৯টি, দাগনভূঞায় ২৭টি। ৮ থেকে ১০ একর জমি ধ্বংস করে গড়ে ওঠে একেকটি ইটভাটা। আবার ইটভাটার জন্য মাটিও কেটে নেওয়া হয় আবাদি জমি থেকে। ফেনীর গ্রামাঞ্চলে কৃষিজমির সবচেয়ে বড় সর্বনাশ ঘটাচ্ছে ইটভাটাগুলো। ফেনীতে প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছে বহুতল ভবন, রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট। এ ইটের জোগান দিতে গড়ে ওঠছে অপরিকল্পিত ইটভাটা। নগদ অর্থের লোভে ফসলি জমি থেকে ইটভাটায় মাটি বিক্রি করে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন প্রান্তিক কৃষকরা। ফসলি ভূমি যখন জলাশয়ে পরিণত হয়-তখন ফসল-মাছ দুটি থেকে বঞ্চিত হয়ে কৃষক জমি বিক্রি করে এক পর্যায়ে ভূমি হীনে পরিণত হয়।

পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাবেও ফেনীতে ইটভাটার সংখ্যা ১০৫টি। এসব ইটভাটায় বছরে অন্তত দেড় কোটি টন মাটি লাগে, এজন্য বছরে প্রায় ১ হাজার হেক্টর জমি থেকে ২ ফুট গভীর গর্ত করে মাটি কেটে নেওয়া হয়। জমির মালিকরা মাত্র ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকা বিঘা হিসাবে মাটি বিক্রি করে দিচ্ছেন। মাটি কাটার ফলে জমির উপরিভাগে ৪ থেকে ৬ ইঞ্চির মধ্যে থাকা জমির খাদ্যকণা ও জৈব উপাদান নষ্ট হচ্ছে। ফলে ওই সব জমির উর্বরতা হ্রাস পায়, তাতে যে ফসল আবাদ হয় তার উৎপাদন কমে যাচ্ছে।

এছাড়াও জমির উপরিভাগের মাটি কাটার ফলে জমি নিচু হয়ে যাচ্ছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে ওই সব জমিতে ধান রোপণ করা যাচ্ছে না। এসব ইটভাটার ফলে একদিকে যেমন আবাদি জমি উর্বরতা শক্তি হারাচ্ছে, অন্যদিকে বিপর্যয় ঘটছে পরিবেশের।

বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, অনেক ফসলি (আমন-ইরি-আউশ-রবি শস্য) জমি এখন ফসলহীন ধু ধু নিচু মাঠ। কোথাও আবার পুকুরের মতো জলাশয়। মাটি ভরাট করে গড়ে ওঠছে ঘরবাড়ি।

ফেনী সদর উপজেলার পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নের উত্তর কাশিমপুর গ্রামের কৃষক মোস্তাফিজুর রহমান পাটোয়ারী জানান, পার্শ্ববর্তী জমি কেটে ফেললে জমিতে পানি ধরে রাখার স্বার্থেই তাদের জমি কেটে সমান করতে হচ্ছে। বর্তমানে জমি নিচু হয়ে যাওয়ায় ধান হয় না।

ফেনী জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সোহেল রানা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি-২০১০ এবং কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি জোনিং আইন-২০১৩ এ বলা হয়েছে-কৃষিজমি কৃষিকাজ ছাড়া অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না। কোনো কৃষিজমি ধ্বংস করে ইটভাটা, বাড়িঘর, শিল্প কারখানা, অন্য কোনো অকৃষি স্থাপনা কোনোভাবেই নির্মাণ করা যাবে না।

আবার ইট তৈরিতে কৃষিজমির মাটি ব্যবহার করা যাবে না। তবে মালিকরা তা মানছেন না। সম্প্রতি একাধিক ইটভাটায় অভিযান চালিয়েও ফসলি জমির মাটির ব্যবহার রোধ করা যাচ্ছে না।

দাগনভূঞা উপজেলার ছমির মুন্সি গ্রামের ভূমি মালিক জানে আলম টিপু জানান, এভাবে জমির উপরিভাগ কাটা হলে কী ক্ষতি হয় তা তারা তেমন জানেন না। তবে কিছুটা ক্ষতি হচ্ছে-এমন কথা স্বীকার করে তারা বলেন, অনিচ্ছা সত্ত্বেও আর্থিক অনটনে পড়ে বাধ্য হয়ে তারা জমির মাটি বিক্রি করছেন।

ফেনী সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু নাঈম মো. সাইফুদ্দীন জানান, ফেনীর পশ্চিমাঞ্চলে এখন আর আমন-ইরি ধান হয় না। সর্বত্রই উঁচু-নিচু ভূমি। ইটভাটায় মাটি দিয়ে কৃষকরা সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। নিজ পায়ে নিজে কুড়াল মারছেন।

ফেনী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মামুন জানান, ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ এর ধারা ৫ অনুযায়ী কৃষিজমির মাটি কেটে ইট প্রস্তুত করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

একটি কৃষিজমির হিউমাস সমৃদ্ধ টপসয়েল তৈরি হতে ২৫-৩০ বছর সময় লাগে। সে মাটি কেটে ইট বানানোর মাধ্যমে জমিটি দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমাদের অবস্থান থেকে আমরা কৃষকদের এ বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করি। কিন্তু কাঁচা টাকার লোভে অনেকেই টপসয়েল বিক্রি করে দেয়।

এ অবস্থায় আমাদের যার যার অবস্থান থেকে ইটভাটাগুলো যাতে আইন মানতে বাধ্য হয় সেজন্যে কাজ করতে হবে। এ ব্যাপারে সাধারণ মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে।

জেলা কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক ড. খালেদ কামাল বলেন, কৃষিজমির মাটির উপরের সয়েল নষ্ট না করার ব্যাপারে সমপ্রতি আমরা সমন্বয় সভা করেছি। মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশ আছে- কৃষিজমি নষ্ট করলেই প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। কৃষককে আমরা উদ্বুদ্ধ করার জন্য কাজ করছি। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কৃষিজমির মালিক যারা ইটভাটায় মাটি বিক্রি করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা বা জরিমানা করলে তারা ভয় পাবেন। এ বিষয়ে জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীদেরও ভূমিকা রাখার অনুরোধ  করেন তিনি।



মন্তব্য