kalerkantho


কুমারশিল্পীদের দুর্দিন

ছোটন কান্তি নাথ, চকরিয়া (কক্সবাজার)   

৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



কুমারশিল্পীদের দুর্দিন

চকরিয়ার বেশ কয়েকটি গ্রামে একসময় দেখা মিলত মাটির তৈরি জিনিসপত্র তথা হাঁড়ি, পাতিলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় রকমারি জিনিসপত্রের। কিন্তু সেসব গ্রামে আগেকার সেই জৌলুশ নেই বললেই চলে। প্লাস্টিক, স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি জিনিসপত্র দখল করে নিয়েছে মৃিশল্পের মাটির তৈরি জিনিসপত্রের বাজার। এ কারণে বাজার হারিয়ে ফেলেছে মাটির তৈরি জিনিসপত্র। তাছাড়া সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়ায় পাল্লা দিয়ে টিকে থাকতে পারছেন না কুমার সম্প্রদায়ের পাঁচ শতাধিক পরিবার। তাই দিন দিন হারিয়ে যেতে বসেছে কুমারশিল্প তথা মৃিশল্প।

তবে উপজেলার গুটিকয়েক গ্রামের কয়েকটি পরিবার বংশপরম্পরায় এখনো ধরে রেখেছেন কুমারশিল্পের ঐতিহ্য। তাই চকরিয়া পৌরশহর চিরিঙ্গা হিন্দুপাড়া অধ্যুষিত কয়েকটি গ্রামীণ দোকানে দেখা মিলছে কুমার শিল্পের নিত্য ব্যবহার্য সামগ্রীর। এসব দোকান থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন তাঁদের ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী মাটির তৈরি জিনিসপত্র কিনে তা ব্যবহার করছেন ধর্মীয় কাজে। যে কয়টি দোকান মাটির তৈরি জিনিসপত্র বিক্রি করছেন সেসব দোকান যদি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে মাথায় হাত পড়বে হিন্দু সম্প্রদায়ের। কেননা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে মাটির তৈরি জিনিসপত্র ব্যবহারে ধর্মীয়ভাবে বাধ্যবাধকতা রয়েছে মর্মে প্রবীণদের অভিমত।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্রামীণ এলাকার প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারক-বাহক কুমারশিল্প অর্থাৎ মাটির তৈরি জিনিসপত্র এখন বিলুপ্তির পথে। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় এবং মাটি ও উপকরণ সংকট ছাড়াও মাটির তৈরি জিনিসপত্রাদি তৈরিতে অত্যধিক ব্যয়বহুল হওয়ায় দিন দিন বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে মৃিশল্প। সেইসাথে হারাচ্ছে মাটির তৈরি রকমারি পণ্যের সাজানো দোকানও। তাছাড়া গুটিকয়েক পরিবার এসব জিনিসপত্র তৈরি করলেও চাহিদামতো দাম না পাওয়ায় তারাও এই শিল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার উপক্রম হয়েছে। 

মৃিশল্পের সঙ্গে জড়িত পরিবারগুলোর দাবি, তাঁদের তৈরিকৃত মাটির জিনিসপত্র বিক্রি করে আগের মতো সংসার চালানোও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। তাছাড়া এই পেশাও তাদের অনেকে ধরে রাখতে চাচ্ছেন না। এসব পরিবারের অনেক সদস্য এখন পড়ালেখার পাঠ চুকিয়ে অন্যান্য পেশায় ঝুঁকে পড়েছেন। আবার অনেক পরিবারে অভাব-অনটন লেগে থাকায় তারা চরম হতাশায় ভুগছেন। একসময় মৃিশল্পে জড়িত থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও এখন সেই গণ্ডি পেরিয়ে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন অনেকে। তাই দিন দিন গৌরব হারাতে বসেছে মৃিশল্প।

চকরিয়া উপজেলার কাকারা, ফাঁসিয়াখালী ও হারবাং ইউনিয়নে রয়েছে কুমার সম্প্রদায়ের পাড়া। এই তিন ইউনিয়নের তিন পাড়ায় কম করে হলেও পাঁচ শতাধিক পরিবারের বসবাস। এসব পরিবারের একমাত্র ভরণ-পোষণ নির্ভর করা হত মাটির তৈরি জিনিসপত্রাদির ওপর। কিন্তু কালক্রমে মৃিশল্পের পেশা হারিয়ে ফেলেছেন সিংহভাগ পরিবার। তাই আগের মতোই এসব পাড়ায় মৃিশল্পের জৌলুশ একেবারে হারাতে বসেছে।

ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের রুদ্রপল্লী তথা কুমার পল্লীর বাসিন্দা সুকুমার রুদ্র কালের কণ্ঠকে জানান, তাদের পাড়ায় দেড় শতাধিক পরিবারের বসবাস। এসব পরিবারের প্রত্যেক বাড়িতে আজ থেকে দশবছর আগেও মৃিশল্পের কাজে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকতেন পরিবার সদস্যরা। বিশেষ করে এসব পরিবারের মহিলারা এই কাজে মশগুল থাকতেন সবসময়। কিন্তু সেই দেড় শতাধিক পরিবারের মধ্যে মাত্র কয়েক পরিবার পূর্বের পেশা টিকিয়ে রেখেছেন।

তিনি বলেন, ‘বর্তমান আধুনিক যুগে মাটির তৈরি জিনিসপত্র তেমন ব্যবহার করেন না মানুষ। তাই কুমার সম্প্রদায়ের পরিবারগুলোও আগেকার পেশা বদলে অন্য পেশায় ঝুঁকছেন। তবে এখনো যে কয়েকটি পরিবার বংশপরম্পরায় পেশা টিকিয়ে রেখে মৃিশল্পের কাজ করে যাচ্ছেন তাদের পরিবারে অভাব-অনটন পিছু ছাড়ছে না। আবার তারা এই পেশা ছাড়তে নারাজ থাকায় অন্য পেশায়ও যেতে পারছেন না।’

হারবাং ইউনিয়নের উত্তর হারবাংস্থ শিবমন্দিরের পুরোহিত সুকুমার চক্রবর্তী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পূজা-পার্বণ তথা ধর্মীয় যেকোনো আচার-অনুষ্ঠানে মাটির তৈরি হাঁড়ি, পাতিল, কলসি, ঘট ব্যবহার অবশ্যাম্ভাবী। তাই মাটির তৈরি জিনিসপত্রের এখনো কদর রয়েছে পূজা-পার্বণ আসলেই।’

এই পুরোহিত আরো বলেন, ‘একসময় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন মাটির তৈরি জিনিসপত্রের ব্যবহারের দিকেই ঝোঁক ছিল বেশি। কিন্তু কালের পরিক্রমায় মাটির তৈরি জিনিসপত্র ব্যবহারের বদলে স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম ও প্লাস্টিকের পণ্য ব্যবহার করছেন। তবে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অবশ্যই প্রয়োজন পড়ে মাটির তৈরি জিনিসপত্রের তথা হাঁড়ি-পাতিলের। তাই কুমার সম্প্রদায়ের যাঁরা এখনো মাটির জিনিস তৈরি করছেন তাঁদেরকে সরকারি বা বেসরকারিভাবে প্রণোদনা দিয়ে পেশা টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।’

কাকারা রুদ্রপল্লী ঘুরে দেখা গেছে, গুটিকয়েক কুমার পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে হাট-বাজারে, দোকানে মাটির তৈরি হাঁড়ি, পাতিল, থালা, বাসন, ছোট ছোট পুতুল ও খেলনার রকমারি জিনিসপত্র সরবরাহের জন্য কাজ করছেন।

কাকারা রুদ্রপল্লীর শতবর্ষী ফনিন্দ্র রুদ্র জানান, তাঁদের গ্রামের পরিবারগুলো বংশপরম্পরায় কম করে হলেও ২০০ বছর পূর্ব থেকে মাটি দিয়ে জিনিসপত্র তৈরি করে আসছেন। অতীতে এমন দিন ছিল যখন গ্রামের মানুষ দৈনন্দিন ব্যবহার করত মাটির হাঁড়ি, পাতিল, কলসি, কড়াই, থালা, বাসন, মালসা ইত্যাদি। কিন্তু এখন তাদের সেই জৌলুশ হারিয়ে গেছে। যে কয়েকটি পরিবার এখনো এসব জিনিস তৈরি করছে তা শহরের দোকানদার এসে নিয়ে যাচ্ছেন।

ফাঁসিয়াখালী কুমার পাড়ার বাসিন্দা ও মৃিশল্প কারিগর কমল রুদ্র বলেন, ‘আমার বাপ-দাদারা শত বছর ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পার্শ্ববর্তী পাহাড় থেকে মাটি এনে জিনিসপত্র তৈরি করতেন। এর পর হাট-বাজারে গিয়ে তা বিক্রি করে সংসার চালাতেন। কিন্তু এখন আধুনিক জিনিসপত্রের ভিড়ে মাটির তৈরি জিনিসপত্র জায়গা পাচ্ছেন না। তাছাড়া যাঁরা এখনো এগুলো তৈরি করেন তাঁদের মজুরি খরচও ওঠে না। তাই দিন দিন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে কুমারশিল্প।’

চকরিয়া পৌরশহর চিরিঙ্গা হিন্দুপাড়ায় কয়েকটি দোকান দেখা যায় মাটির তৈরি জিনিসপত্র বিক্রি করতে। সেখানে দৃষ্টিনন্দন মাটির সামগ্রী কলসি, হাঁড়ি, পাতিল, সরা, মটকা, দই পাতিল, মুচি ঘট, মুচি বাতি, মিষ্টির পাতিল, রসের হাঁড়ি, ফুলের টব, চারার টব, জলকান্দা, মাটির ব্যাংক, ঘটি, খোড়া, বাটি, জালের চাকা, প্রতিমা, বাসন-কোসন, ব্যবহারিক জিনিসপত্র ও খেলনা সামগ্রী পাওয়া যাচ্ছে।

সেসব দোকানীদের একজন দিলীপ দাশ। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে আমার বাবা অশ্বিনী কুমার দাশ এই দোকান খুলেন। তিনি মারা গেছেন বেশ কয়েকবছর হয়। তাই ওনার প্রতিষ্ঠিত দোকান টিকিয়ে রেখেছি এসব সামগ্রীর পসরা সাজিয়ে।’ 

এ বিষয়ে চকরিয়ার চারুশিল্পী মাহবুবুর রহমান চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কুমারশিল্প হারিয়ে যাওয়া মানে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়া। তাই এই শিল্প যাতে কোনোদিন না হারায় সেজন্য সরকারি-বেসরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। তাছাড়া এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে হলে গ্রামীণ মেলাগুলো শুরুর উদ্যোগ নিতে হবে এখন থেকেই। তা না হলে এখনো যেসব গুটিকয়েক পরিবার এই পেশা টিকিয়ে রেখেছেন তারাও মুখ ফিরিয়ে নেবেন।’



মন্তব্য