kalerkantho


টানা ২৩ কিলোমিটার সমুদ্রসৈকত

তবু পর্যটনকেন্দ্র হয়ে ওঠেনি শতবর্ষী কুতুবদিয়া

৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



টানা ২৩ কিলোমিটার সমুদ্রসৈকত

কুতুবদিয়ার বড়ঘোপ সমুদ্রসৈকতে প্রস্তাবিত ড্রিম পার্কের নকশা।

যন্ত্রচালিত নৌকা থেকে যেদিকে চোখ যায়, চারপাশেই সমুদ্রের নীল জলরাশি। মাঝখানে টিপের মতো একটি ভূখণ্ড। কমপক্ষে শতবর্ষ প্রাচীন এ দ্বীপের নাম কুতুবদিয়া। সমুদ্রপথে চট্টগ্রাম থেকে ৭৬ কিলোমিটার এবং কক্সবাজার থেকে ৮৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থান এ দ্বীপের। এর একপাশে বাংলাদেশের একমাত্র বায়ুচালিত বিদ্যুৎ প্রকল্প। অন্য পাশে দক্ষিণ ধুরংয়ে কুতুবদিয়া বাতিঘরের সুউচ্চ টাওয়ার। মাঝখানের সবটাই টানা সৈকত। সম্প্রতি কক্সবাজারের কুতুবদিয়া ঘুরে এসেছেন আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক : মনু ইসলাম, বান্দরবান

 

কুতুবদিয়া দ্বীপ কবে জেগে ওঠেছিল, কবে গড়ে ওঠেছিল জনপদ-সেটি বলতে পারেন না স্থানীয়দের কেউই। তবে প্রশাসনিক রেকর্ড অনুযায়ী ১৯১৭ সালে পুলিশ স্টেশন স্থাপিত হয় এখানে। সেই থেকে এর বয়স এক শ বছর ছাড়িয়েছে। গত বছর দ্বীপবাসী উদযাপন করেছে শত বর্ষপূর্তি উৎসব।

দৈর্ঘ্যের দিক থেকে বাংলাদেশে কক্সবাজারের পরেই কুতুবদিয়া সমুদ্রসৈকতের অবস্থান। প্রায় ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ কুতুবদিয়ার ২৩ কিলোমিটারই সমুদ্রসৈকত। সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত দুটিই উপভোগ করা যায় কুতুবদিয়া থেকে। কিন্তু পুরো সৈকত ঘুরে পর্যটকদের জন্যে সামান্য এতটুকু ব্যবস্থা কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। গড়ে ওঠেনি আবাসিক হোটেল কিংবা রেস্তোরাঁ সেবা। সোয়া লাখ জনসংখ্যার জন্যে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা ৫ মেগাওয়াট। কিন্তু গত এক শ বছরেও এখানে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা চালু করা হয়নি। ফলে পর্যটন সম্ভাবনাময় এই এলাকা সন্ধ্যার পর পরই ঘুটঘুটে অন্ধকার এক জনপদে রূপ নেয়।

যোগাযোগ সুবিধার দিক থেকেও কুতুবদিয়া ভালো অবস্থানে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার বা বাংলাদেশের যে কোনো এলাকা থেকে সড়ক পথে চকরিয়া ইনানী হাইওয়ে রেস্টুরেন্টের কাছে নেমেই কুতুবদিয়া যাওয়ার পরিবহন ব্যবস্থা রয়েছে।

সিএনজি অটোরিকশায় জনপ্রতি ৪০ টাকা ভাড়ায় পেকুয়া হয়ে সোজা মগনামা জেটি ঘাট। এই ঘাট থেকে ঢাউস সাইজের যান্ত্রিক বোটে কুতুবদিয়া চ্যানেল পাড়ি দিয়ে উপজেলা ঘাট বা দরবার ঘাটে পৌঁছা যায় মাত্র ২০ টাকায়। স্পিডবোটে এই ভাড়া জনপ্রতি ৬০ টাকা।

সরকারি-বেসরকারি সবদিক থেকেই বর্ণনাতীত অবহেলিত কুতুবদিয়া। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি উদ্যোগে আনোয়ারার পারকি সৈকত এবং চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সৈকত উন্নয়নে ৭৮ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও কুতুবদিয়াকে পর্যটন উপযোগী করতে সরকারি তরফ বা প্রাইভেট সেক্টর এখনও এগিয়ে আসেনি।

সম্প্রতি কুতুবদিয়া সফরে গেলে এলাকার মানুষ চরম অবহেলার এসব চিত্র তুলে ধরেন।

তবে এত অবহেলার মধ্যেও কিছুটা আশার আলো দেখিয়েছে কুতুবদিয়া উপজেলা পরিষদ। ২৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকতকে পর্যটন সম্ভাবনাময় করতে একটি উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বছরখানেক আগে এই উপজেলায় নির্বাহী অফিসারের দায়িত্ব নিয়েছেন সুজন চৌধুরী। তিনি আসার পর কুতুবদিয়াকে পর্যটন সম্ভাবনাময় করে তুলতে নড়েচড়ে বসে উপজেলা পরিষদ। কুতুবদিয়া নিয়ে স্বপ্নের কথা জানান সুজন চৌধুরী। ‘প্রাথমিকভাবে বড়ঘোপ সমুদ্রসৈকতের ওপরের অংশে সিসি ব্লক দ্বারা সুরক্ষিত করে বিভিন্ন পয়েন্টে ওয়াকওয়ে, সিনিয়র সিটিজেন ব্লক, রেস্টুরেন্ট, ওয়াচ টাওয়ার, ফ্রেন্ডস কর্নারসহ একটি ‘ড্রিম পার্ক’ স্থাপন করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। তিনি প্রস্তাবিত ড্রিম পার্কের কয়েকটি স্থির ছবি এবং মিনিটখানেকের একটি ভিডিও ক্লিপও দেখান।

কত টাকা খরচ হতে পারে-জানতে চাই। ‘আমার তো পুরো ধারণা নেই। তবে মনে হচ্ছে ৫ থেকে ৭ কোটি টাকা ব্যয় করলে ড্রিম পার্ক প্রস্তাবনায় পুরো সৈকতকে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা পর্যটকদের কাছে উপভোগ্য করে তোলা সম্ভব হবে।’-জানান সুজন চৌধুরী।

কুতুবদিয়া দ্বীপ দৈর্ঘ্যে প্রায় ৩০ কিলোমিটার এবং প্রস্থে ৩ দশমিক ২ কিলোমিটার। ম্যাপ দেখলে একটি লম্বা বোয়াল মাছের মতোই মনে হয়। তিন কিলোমিটারের কিছু অংশে জনপদ। বাকি পুরো অংশ জুড়েই সমুদ্রসৈকত। ১৮৪৬ সালে কুতুবদিয়া পয়েন্টে সাগরের বুকে লাইটহাউস নির্মাণ করে ব্রিটিশ সরকার। এখন এটি আর নেই। ওই পয়েন্টের কাছাকাছি দক্ষিণ ধুরং ইউনিয়নের একটি অংশে নৌ পরিদপ্তরের মালিকানাধীন ৪ দশমিক ৬৩ একর ভূমির উপর নির্মিত হয়েছে নতুন লাইটহাউস। আগের লাইটহাউস সাগরের বুকে একাকী দাঁড়িয়ে থাকলেও এখনকার লাইটহাউস এলাকায় আছে সুউচ্চ স্টিল টাওয়ার। নিয়ন্ত্রণ কক্ষ, স্টাফ কোয়ার্টার। বিশাল এই ভূমির পরপরই দৈর্ঘ-প্রস্থে বিস্তৃত সমুদ্রসৈকত। এখনও শত শত পর্যটক এবং স্থানীয় মানুষ লাইটহাউসের ভেতর দিয়েই সৈকতে যাচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার জানান, একটি নৌ জাদুঘর স্থাপন করে এই লাইটহাউসকেও পর্যটন স্পট হিসেবে

ব্যবহার করা যায়।

১৯১৭ সালে থানা হিসেবে যাত্রা শুরু করে ১৯৮৩ সালে উপজেলায় উন্নীত হয় কুতুবদিয়া।

কুতুবদিয়া দ্বীপে সোয়া লাখ লোকের বাস। কিন্তু শত বছরেও বিদ্যুৎ সরবরাহ হয়নি এখানে। এর ফলে এলাকায় কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হতে পারছে না।

স্থানীয়রা বলছেন, কুতুবদিয়া চ্যানেল পার হয়ে ওভারহেড বিদ্যুৎ লাইন স্থাপন হয়তো কঠিন। কিন্তু সন্দ্বীপের মতো সাব-মেরিন ক্যাবল স্থাপন করে কি বিদ্যুৎ পৌঁছানো যায় না?

স্থানীয় প্রবীণ নাগরিক শাহজাহান আলী দাবি করেন, কুতুবদিয়া চ্যানেল কোনো কোনো অংশে দেড় কিলোমিটার থেকে ৪ কিলোমিটারের বেশি নয়। সামান্য এই অংশে সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপন করে কুতুবদিয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি শাহজাহান আলীরও।

হায় উইন্ডমিল!

সরকারি উদ্যোগে দেশের ৮টি অঞ্চলে স্থাপনের পরিকল্পনা থাকলেও এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের একমাত্র উইন্ডমিল টারবাইন বিদ্যুৎ কেন্দ্র কুতুবদিয়ায়। এটি পর্যটকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয় এবং রোমাঞ্চকর। সমুদ্র পাড় ঘেঁষে সুউচ্চ স্টীল খাঁচার উপর লম্বা লম্বা পাখা ঘুরছে। সারি সারি রূপালি রঙের খুঁটি। মাঝে মাঝে প্রবল বেগে ঘুরছে পাখাগুলো। আহ! কী মনোমুগ্ধকর এ দৃশ্য। অথচ কুতুবদিয়ার সাংবাদিক হাসান কুতুবীসহ হাজার হাজার মানুষের কাছে বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প বা উইন্ডমিল এ অঞ্চলে সরকারি বিদ্যুৎ সরবরাহের মূল অন্তরায়!

উইন্ডমিলের দিকে হাত উঁচিয়ে হাসান কুতুবী বললেন, এটা দেখিয়ে দেখিয়ে সরকার আমাদের ধোঁকা দিচ্ছে।

ঘাসান কুতুবীর বর্ণনা অনুযায়ী ১৯৯৬ সালে আলী আকবর ডেইলে ৫০টি উইন্ডমিল স্থাপন করে বায়ুচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদনের শুভযাত্রা বাংলাদেশে উইন্ডমিল যুগের সূচনা ঘটলেও কুতুবদিয়াবাসীর বিদ্যুৎ প্রাপ্তির দাবিকে গলা টিপে ধরেছে উইন্ডমিল প্রকল্প।

এলাকাবাসীর বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর কথা বলে ২০১৫ সালে আরো ৫০টি হাইব্রিড উইন্ডমিল স্থাপন করা হলেও এই প্রকল্প গত ২২ বছরে টারবাইন এলাকার আশপাশের মাত্র ১৮০টি পরিবারে বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে পেরেছে।

তিনি জানান, যারা বিদ্যুৎ সংযোগ পেয়েছে তারাও কোনো দিন ১ ঘণ্টা, কোনো দিন ২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ পায়। কখনও কখনও সপ্তাহের পর সপ্তাহ বিদ্যুৎ থাকে না।

আলী আকবর ডেইলের জসিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় চত্বরে আমাদের দেখে এগিয়ে এলেন এক যুবক।

পরিচয় জানতে চাইলেন। বললেন, ‘একটু লিখে দেন-আমরা বিদ্যুৎ চাই। উইন্ডমিল কুতুবদিয়াবাসী চায় না।’



মন্তব্য