kalerkantho


স্বাধীনতার এত বছরেও স্বীকৃতিবঞ্চিত শহীদ যতীন্দ্র চক্রবর্তীর পরিবার

আবু দাউদ, খাগড়াছড়ি   

৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০




স্বাধীনতার এত বছরেও

স্বীকৃতিবঞ্চিত শহীদ যতীন্দ্র

চক্রবর্তীর পরিবার

স্বাধীনতার এত বছরেও স্বীকৃতি বঞ্চিত খাগড়াছড়ির কিছু শহীদ পরিবার। তাঁদেরই একজন শহীদ যতীন্দ্র মোহন চক্রবর্তী। যাঁর লাশ পাওয়া যায়নি এখনো। একাত্তরের রণাঙ্গনে শহীদ হওয়ার ৪৭ বছর পরও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাননি তাঁর পরিবারের সদস্যরা। ’৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া দুই হাজার টাকার চেকই এখন পর্যন্ত একমাত্র স্বীকৃতি। পরিবারটি চরম দুঃখ-কষ্টের জীবনযাপন করছে। বারবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের আবেদন করেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে আছে।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা জানান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সাথেই ছিলেন যতীন্দ্র মোহন চক্রবর্তী। তখনকার মহালছড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন তিনি। বিশেষ করে জেলার জালিয়াপাড়া, সিন্দুকছড়ি ও মহালছড়িতে হানাদার বাহিনীর অবস্থান সম্পর্কে মুক্তিবাহিনীর কাছে খবর পাঠাতেন। নানা সহায়তা করতেন।

জানা যায়, ১৯৬২ সালে চাকরির উদ্দেশ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসেছিলেন যতীন্দ্র মোহন চক্রবর্তী। তখন থেকে মহালছড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনে ঘরে বসে থাকতে পারেননি যতীন্দ্র মোহন। শিক্ষকতার পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতায় এগিয়ে যান। আশপাশের এলাকায় যাতায়াত করে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে শত্রুবাহিনীর অবস্থানের খোঁজ-খবর দিতেন। নিজেও সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। স্থানীয় রাজাকাররাই যতীন্দ্র মোহনের এমন তথ্য হানাদারদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে বলে শোনা যায়।

এরপর ’৭১ সালের মে মাসের কোনো একদিন শত্রুবাহিনীর হাতে গুলিতে প্রাণ হারান যতীন্দ্র মোহন। ঘটনাস্থল সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া না গেলেও জালিয়াপাড়া-সিন্দুকছড়ির কোথাও তাঁকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে পরিবারের ধারণা। লাশের আজ অবধি সন্ধান পাওয়া যায়নি।

মহালছড়ির মুক্তিযোদ্ধা মোবারক আলী মাস্টার বলেন, ‘মুক্তিবাহিনীকে সাহায্য করার অপরাধে শত্রুবাহিনীর সদস্যরা যতীন্দ্র মোহন চক্রবর্তীকে ধরে নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করেছে বলে শুনেছি। মুক্তিযোদ্ধা সংসদের উপজেলা কমান্ডার থাকাকালে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁকে অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ করে কেন্দ্রীয় কমান্ডে পাঠানো হলেও এখনো কিছু হয়নি।’

এছাড়া ২০০১ সালে তৎকালীন মুক্তিযোদ্ধা জেলা কমান্ডার মংমংচিং মারমার সভাপতিত্বে জেলা কমান্ডারের এক বৈঠকে যতীন্দ্র মোহন চক্রবর্তীকে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে কেন্দ্রীয় কমান্ডের কাছে অনুরোধ করা হয়েছিল।

যে স্কুলে শিক্ষকতা করতেন যতীন্দ্র মোহন সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষক লক্ষ্মীকান্ত চর্মকার এবং মহালছড়ির বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. স্বপন চক্রবর্তী জানিয়েছেন, তখন শিক্ষক হিসেবে যেমন একনিষ্ঠ ছিলেন তিনি; তেমনি মুক্তিবাহিনীর সহায়তায় তাঁর অবদান ছিল।

ইতোপূর্বে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতির জন্য পরিবারের পক্ষ হতে করা আবেদনের প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা খোন্দকার নুরুল ইসলামের স্বাক্ষরিত কাগজে যাচাই বাছাইয়ের জন্য যতীন্দ্র মোহন চক্রবর্তীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু জেলা পর্যায়ে যাচাই বাছাই কাজ বন্ধ থাকায় তাও থমকে রয়েছে।

শহীদ যতীন্দ্র মোহনের তৃতীয় ছেলে তপন কুমার চক্রবর্তী বলেন, ‘১৯৭২ সালের দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া ২০০০ টাকার একটি চেকই এখন পর্যন্ত বাবার শহীদ হওয়ার একমাত্র স্বীকৃতি। তখন মা ব্রজরানীর হাতে চেকটি তুলে দিয়েছিলেন তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক এসডিও। বঙ্গবন্ধুর ওই চেক বিতরণের চিঠিতে স্বাধীনতা যুদ্ধে যতীন্দ্র মোহন চক্রবর্তীর অবদান এবং আত্মোৎসর্গের জন্যে সহানুভূতি প্রকাশ করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে সেই অর্থ দেওয়া হয়।’

এদিকে মুক্তিযুদ্ধের সময় যতীন্দ্র মোহন প্রাণ হারিয়েছেন-এমন খবর পেয়ে তাঁদের আদিবাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার উত্তরভূর্ষি গ্রামে তাঁদের সব সহায় সম্পত্তি ও জমিজমা দখল করে নেন সেখানকার প্রভাবশালীরা।  যা আর ফিরে পাননি তাঁরা। পরবর্তীতে খাগড়াছড়ির মহালছড়িই ঠিকানা হয় তাঁদের।

শহীদ পরিবারটি এখন চরম অসহায়। একখণ্ড জমিও নেই তাঁদের। পরিবারের সদস্যরা থাকেন ভাড়া করা ঘরে। অভাবে চলে সংসার। ৪ ভাই, ১ বোনের মধ্যে দুই ভাই আগেই মারা গেছেন। একাত্তরে স্বামীর লাশ না পেয়ে হতাশ ব্রজরানী চক্রবর্তীও মারা গেছেন ’৮৮ সালে। একমাত্র বোন নমিতা রানী চক্রবর্তীর স্বামীও অসুস্থতায় মারা যান। ফলে স্বামীহারা বোনটি ভাই তপন কুমার চক্রবর্তীর অভাবী সংসারে বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়ান। তপন কুমার নিজে পুরোহিত এবং তাঁর অপর ভাই গোপাল চক্রবর্তীও পুরোহিতের কাজ করে কোনো রকমে জীবন নির্বাহ করেন। এত সংকটেও অত্যন্ত দরিদ্র ও দুস্থ পরিবারটির পাশেও কেউ দাঁড়াননি।

এদিকে স্বাধীনতার দীর্ঘ সময়েও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার আশায় তীর্থের কাকের মতো চেয়ে আছেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা। দৃষ্টি আকর্ষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাত পেতে বারবার আবেদন করেও কাজ হচ্ছে না। সর্বশেষ স্থানীয় সংসদ সদস্যের সুপারিশ নিয়ে চলতি বছর জেলা প্রশাসকের মাধ্যমেও সাক্ষাতের আবেদনপত্র পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাত না পেয়ে অনেকটা হতাশ শহীদ পরিবারটির সদস্যরা।

উল্লেখ্য, সমসাময়িক সময়ে হানাদার বাহিনীর হাতে শহীদ হন মহালছড়ির চিত্তরঞ্জন চাকমা (কার্বারি), ইপিআর সদস্য রমণী রঞ্জন চাকমা, গোরাঙ্গ মোহন দেওয়ান (হেডম্যান) ও সব্যসাচী চাকমা।

স্থানীয় রাজাকার জাকারিয়া ও জাকির বিহারী শত্রুসেনাদের কাছে ১২৩ জনের যে হিটলিস্ট দিয়েছিল, যতীন্দ্র মোহন চক্রবর্তীসহ এসব পাহাড়ির নামও ছিল সেই তালিকায়। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবার হিসেবে খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ড. সুধীন কুমার চাকমার বাবা চিত্তরঞ্জন চাকমার স্ত্রীকেও ২০০০ টাকার চেক দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁরাও আজ পর্যন্ত স্বীকৃতি পাননি।


মন্তব্য