kalerkantho


বান্দরবান ভিক্ষুকমুক্ত করার উদ্যোগ

২৪ মে, ২০১৭ ০০:০০



বান্দরবান ভিক্ষুকমুক্ত করার উদ্যোগ

বান্দরবান জেলা শহর ভিক্ষুকমুক্ত করার উদ্যোগ নিচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলো থেকে ভিক্ষা করার জন্য প্রতিদিন কমপক্ষে ২০০ ভিক্ষুক বান্দরবান শহরে আসেন। পর্যটনকেন্দ্রসহ বিভিন্ন সরকারি অফিস তাঁরা চষে বেড়ান। তাঁদের মধ্যে অধিকাংশ মেয়ের বিয়ের জন্য, কেউ চিকিৎসার খরচ জোগাতে আবার অনেকে স্বামী পরিত্যক্ত নারী পরিচয় দিয়ে সন্তান কাঁধে নিয়ে ভিক্ষা করেন। বহিরাগত ভিক্ষুকদের মধ্যে অঙ্গহানিজনিত সমস্যা এবং বয়োঃবৃদ্ধ ভিক্ষুকের সংখ্যা খুব কম। বিস্তারিত জানাচ্ছেন : মনু ইসলাম, বান্দরবান

 

প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে বিকল্প স্থানে পুনর্বাসনের মাধ্যমে পর্যটন শহর বান্দরবানকে ভিক্ষুকমুক্ত করা হবে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে আগামী অর্থবছরে বিশেষ থোক বরাদ্দ রাখা হবে। বান্দরবান শহরের বাসভবনে আলাপকালে কালের কণ্ঠকে এ তথ্য জানান পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর এমপি। বলেন, ‘বান্দরবানকে ভিক্ষুকমুক্ত করার লক্ষ্যে একটি অনানুষ্ঠানিক জরিপ চালানো হয়েছে।

এতে দেখা গেছে, দারিদ্র্যতার কারণে নয়, ভিক্ষাপ্রাপ্তির সুযোগ থাকায় বহিরাগতরাই পেশা হিসেবে বান্দরবানে ভিক্ষাবৃত্তি করছে।

জরিপে ওঠে এসেছে, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির আওতায় বয়স্কভাতা, ভিজিডি, বিশেষ ভিজিডি, জরুরি খাদ্য বিতরণ, শীতবস্ত্র বিতরণ, ঢেউটিনসহ গৃহ নির্মাণ কর্মসূচির সুযোগ-সুবিধা দিয়েও তাঁদেরকে ভিক্ষাবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত করা যাচ্ছে না।

এক প্রশ্নের জবাবে পার্বত্য প্রতিমন্ত্রী জানান, ভিক্ষাবৃত্তিতে স্থানীয়দের সংখ্যা খুব কম হওয়ায় ভিক্ষুকমুক্ত করার এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন খুব একটা

কঠিন হবে না।

এদিকে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ এবং বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেসা গোল্ডকাপ স্কুল ফুটবল প্রতিযোগিতার বান্দরবান পৌরসভা পর্যায়ের চূড়ান্ত খেলার পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠান শেষে বান্দরবান স্টেডিয়াম সভাকক্ষে ভিক্ষুকমুক্ত শহর ঘোষণা বিষয়ে এক প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয় সম্প্রতি। এতে জেলা প্রশাসক দিলীপ কুমার বণিক, পুলিশ সুপার সঞ্জিত কুমার রায়,

বান্দরবান পৌরসভার মেয়র মোহাম্মদ ইসলাম বেবী এবং বান্দরবান সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবদুল কুদ্দুসের সাথে প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর ভিক্ষুকমুক্ত বান্দরবান কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিষয়ে মতবিনিময় করেন।

জেলা প্রশাসক দিলীপ কুমার বণিক প্রতিমন্ত্রীকে জানান, সরকারের চলমান সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় গৃহ নির্মাণ এবং স্বল্পপুঁজির ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি করে ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধ করা সম্ভব।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় বিশেষ উদ্যোগ এবং অর্থ বরাদ্দ দিলে খুব কমসময়ের মধ্যে বান্দরবান শহরকে ভিক্ষুকমুক্ত করা যাবে।

পুলিশ সুপার সঞ্জিত কুমার রায় বলেন, ‘বহিরাগত ভিক্ষুকদের বান্দরবান শহরে প্রবেশ বন্ধ করা গেলে স্থানীয় বিত্তহীনদের ভিক্ষাবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত করা অধিকতর সহজ হবে।’

এদিকে একদিনের সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পরিচালিত বিশেষ এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলো থেকে ভিক্ষা করার জন্যে প্রতিদিন কমপক্ষে ২০০ ভিক্ষুক বান্দরবান জেলা সদরে আসেন। মেঘলা পর্যটন কেন্দ্র, বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ, নীলাচল পর্যটন কেন্দ্র, কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল, পৌর ভবন, উপজেলা পরিষদ, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়,

প্রেস ক্লাব মার্কেট, বান্দরবান বাজার, বন বিভাগ, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড  এলাকা, গণপূর্ত ভবন, কেওচিংঘাটা, কালাঘাটা, বালাঘাটা বাজার মধ্যমপাড়া, উজানি পাড়াসহ বিভিন্ন সরকারি অফিস তাঁরা চষে বেড়ান।

পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এদের মধ্যে অধিকাংশ মেয়ের বিয়ের জন্য সাহায্য, কেউ চিকিৎসা খরচ জোগাতে, নিজেদের স্বামী পরিত্যক্ত নারী পরিচয় দিয়ে সন্তান কাঁধে নিয়ে কেউ কেউ ভিক্ষা করে বেড়ান।  আরো দেখা গেছে, বহিরাগত ভিক্ষুকদের মধ্যে অঙ্গহানিজনিত সমস্যা ও বয়োঃবৃদ্ধ ভিক্ষুকের সংখ্যা খুব কম। এর বাইরে বান্দরবানে বসবাসকারী প্রায় ৩০ জন ভিক্ষুকের দেখা মেলে প্রতিদিন। সারাদিন ঘুরে ঘুরে তাঁরা বিভিন্ন স্থানে ভিক্ষা করে বেড়ান। সারাদিন খেটে বান্দরবানে দৈনিক মজুরি পাওয়া যায় ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা। কিন্তু ভিক্ষা করে দৈনিক আয় কমপক্ষে ৭০০-৮০০ টাকা।

আয়ের এই সুযোগ অলসদের ভিক্ষাবৃত্তিতে আকর্ষণ করে। এক সময় বলা হতো, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মানুষ ভিক্ষা করে না। এটি এখন আর সত্য নয়। সাম্প্রতিক সময়ে নানা উছিলায় কোনো কোনো পাহাড়ি মানুষকে ভিক্ষার জন্য হাত পেতে ঘুরে বেড়াতে দেখা যাচ্ছে।

ক্ষুব্ধ একজন দোকানি বলেন, ইসলাম ধর্মে ভিক্ষাকে ক্ষেত্রবিশেষে নিরুৎসাহিত ও হারাম করা সত্ত্বেও ধর্মের দোহাই দিয়ে করা ভিক্ষাবৃত্তির জন্যে এক উর্বর এলাকা বান্দরবান। এখানে হাত পাতলে কমপক্ষে এক টাকা মেলে।

অতি উৎসাহী কেউ কেউ দ্রুত পুণ্য অর্জন বা লোক দেখানোর জন্যে কড়কড়ে ৫ টাকা বা ১০টাকার নোট তুলে দেন ভিক্ষুকদের হাতে। তিনি জানান, ভিক্ষুকদের প্রধান টার্গেট পর্যটক ও দোকানগুলো। দোকানিরা কিছুটা অভ্যস্ত হয়ে গেলেও বিপাকে পড়েন পর্যটক।

তাঁর মতে, বান্দরবান শহরকে ভিক্ষুকমুক্ত করতে হলে বহিরাগত ভিক্ষুকদের বান্দরবান শহরে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা দরকার সবার আগে। এরপর স্থানীয় ভিক্ষুকদের পুনর্বাসনে হাত দিতে হবে। তা না হলে ‘ডাবল লাভ’-এর আশায় ভিক্ষুক সংখ্যা হঠাৎ করে আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যেতে পারে।



মন্তব্য