kalerkantho


চবি বিএনসিসিতে ছাত্রীদের সাফল্য

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৯ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০



চবি বিএনসিসিতে ছাত্রীদের সাফল্য

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএনসিসির কার্যক্রমে কোনো অংশে পিছিয়ে নেই মেয়েরা। এখানে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের (বিএনসিসি) শাখা রয়েছে তিনটি।

এর মধ্যে সেনা শাখায় ৩৫, বিমান শাখায় ৪০ এবং নৌ শাখায় ৪০ জন মেয়ে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। ইতিমধ্যে তাঁদের কয়েকজন বিদেশও সফর করেছেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বিএনসিসির সেনা, নৌ ও বিমান শাখার সমন্বয়ক লে. কর্নেল ড. এম শফিকুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিএনসিসির মেধাবী ক্যাডেট বিদেশে গিয়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করাটা আমাদের গর্বের বিষয়। তাঁরা বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড ও সংস্কৃতি দিয়ে বাংলাদেশকে অন্যদেশের কাছে আলোকিত করেন। অন্যদেশের ক্যাডেটদের অভিজ্ঞতাও শেয়ারিং করে আউটলুক বৃদ্ধি করছেন। ভবিষ্যতে আমাদের ক্যাডেটরা যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র যেতে পারলে আরো বেশি জানার সুযোগ সৃষ্টি হবে। ’ বিএনসিসির সেনা শাখার পিইউও লিটন মিত্র বলেন, ‘এই  কোরের সকল ক্যাডেট বিনা মূল্যে সামরিক বাহিনীর প্রাথমিক প্রশিক্ষণ লাভ করার পাশাপাশি শ্রেষ্ঠ ক্যাডেটরা দেশের বিভিন্ন স্থানে এমনকি রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফর করে থাকেন। এছাড়া তাঁরা ইভটিজিং, মাদকাসক্তি, যৌতুক, পরিবেশ দূষণ, দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের মতো সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে তরুণ সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করেন। ’

টিষা তঞ্চঙ্গ্যা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।

তবে ক্যাম্পাসে পরিচিতিটা তাঁর বেশি বিএনসিসি দিয়েই। টিষা গত ফেব্রুয়ারি মাসে বিএনসিসির সেনা শাখার ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রীয়ভাবে নেপালের আর্মি ডে ২০১৭ তে অংশ নিয়ে সম্প্রতি দেশে ফিরেন।

রাঙামাটি জেলা সদরের দেবাশীষ নগরে বাড়ি টিষার। বাবা হৃদয় কান্তি তঞ্চঙ্গ্যা এনজিওতে চাকরি করেন আর মা দীপ্তি চাকমা গৃহিণী। বাবা মায়ের দুই ছেলে মেয়ের মধ্যে টিষা সবার বড়। নৌবাহিনী স্কুল অ্যান্ড কলেজে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েন। এর পর রাঙামাটি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ার সময় গার্লস গাইডে যোগ দেন। ২০১০ সালে চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজে পড়তে এসে যোগ দেন বিএনসিসিতে। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে যোগ দেন বিএনসিসিতে। ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এ সময়ের মধ্যে বিএনসিসির সকল কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন টিষা।

একাধারে বিএনসিসির ক্যাপসুল ক্যাম্প, বার্ষিক প্রশিক্ষণ, কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ অনুশীলনও করেছেন একাধিকবার। গত বছর বিজয় দিবসের প্যারেডে ভারত ও শ্রীলঙ্কান ক্যাডেটদের গাইড ক্যাডেট হিসেবে চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে শুধু টিষা প্রতিনিধিত্ব করেন।

দীর্ঘ ছয় বছরে কলেজে থাকাকালীন রেজিমেন্ট মেডিক্যাল সার্জেন্ট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় রেজিমেন্টের লেডি অ্যাডজুটেন্ট (সিইও), ঢাকা ভাইপাল সেন্টারের অ্যাডজুটেন্টসহ (সিইও) বিভিন্ন  দায়িত্ব পালন করেছেন।

নেপালে ১১ দিনের অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে টিষা বলেন, ‘গত ২৪ ফেব্রুয়ারি নেপালের  আর্মি ডে ২০১৭ ছিল। সেখানে অংশ নিতে ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ থেকে আমরা ছয়জন ছেলে ও ছয়জন মেয়ে যাই। ২৬ ফেব্রুয়ারি দেশে ফিরে আসি। আর্মি ডেতে রাষ্ট্রীয় প্যারেড, নিজস্ব সংস্কৃতি তুলে ধরা এবং নানা ধরনের সামরিক প্রশিক্ষণ ও সেখানকার প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাত্কারের সময় ছবি তোলা বেশ উপভোগ করেছি। অন্যদিকে আমাদের ঘুরে দেখানো হয়েছে দর্শনীয় স্থান ওয়ার্ল্ড পিস প্যাগোডা, পোখরা, নারায়ণ হিতি মিউজিয়াম, পাঠান মিউজিয়াম, মনোকামনা মন্দির, ধূলিকেল, বাসার্ন্ডপুর দরবার, মহেন্দ্রখেপ ও ইন্টারন্যাশনাল মাউন্টেন মিউজিয়াম। ’

জানা গেছে, টিষা বিএনসিসির নানা অনুষ্ঠানের মধ্যে ড্রিল, উপস্থাপনা, উপস্থিত বক্তব্য, আধুনিক গান ও লোকনৃত্যে পেয়েছেন বেশ কয়েকটি পুরস্কার। বিএনসিসির প্রশিক্ষণ নেওয়া প্রসঙ্গে টিষা তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, ‘যেকোনো সংগঠন পরিচালনা করতে হলে দায়িত্বশীলদের সবদিক ম্যানেজ করার গুণ থাকতে হয়। ছোটবেলা থেকে বাবার পেশা দেখে স্বপ্ন বুনেছি এনজিও কর্মী হয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য কাজ করব। ’

তাঁর মতে, এনজিওকর্মীরা তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের সাথে সরাসরি কাজ করার সুযোগ পান। একজন ভালো এনজিওকর্মী হতে দরকার নেতৃত্বের সাথে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করা। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএনসিসির মাধ্যমে যোগ্য নেতৃত্ব, দায়িত্ব, শৃঙ্খলা ও নানা ধরনের উদ্ভট পরিস্থিতিও মোকাবিলা করা হাতেখড়িতে শেখানো হয়। এছাড়া ড্রিল, অস্ত্র প্রশিক্ষণ, মাঠ নৈপুণ্য, শারীরিক প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র রণকৌশল, সামরিক বিজ্ঞান, সামরিক ইতিহাস, স্বাস্থ্যবিধি ও প্রাথমিক চিকিৎসা বিষয়ে বিএনসিসি সুনিপুণ প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। যাতে ছাত্রছাত্রী ও তরুণদের নৈতিক উন্নয়ন এবং তাঁদের মাঝে নেতৃত্বের গুণাবলি বিকশিত হয়।

মেহেরপুরের মুজিবনগর এলাকার মেয়ে তাহমিনা আক্তার মিনা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা বিভাগে মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সাথে সাথেই এক আপার কাছে বিএনসিসির কথা শুনে যোগ দিলেন সেখানে। আত্মবিশ্বাস, প্রত্যয় ও উদ্দেশ্যে নিয়ে নানা বাধা পেরিয়ে তাহমিনা বিএনসিসির সামরিক প্রশিক্ষণটা পাকাপোক্তভাবে নিয়েছেন। নানা পরীক্ষার যাচাই-বাছাই শেষে গত বছর বাংলাদেশ থেকে ইয়ুথ এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম বিটুইন ফ্রেন্ডলি ফরেন কান্ট্রিজ ২০১৬ তে নেপালে চারজন মেয়ে ক্যাডেট অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে তাহমিনা অন্যতম। তাহমিনা পদার্থবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী হয়েও ল্যাব-প্র্যাকটিক্যাল নিয়মিত করে বিএনসিসির ক্যাডেট আন্ডার অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে, বিএনসিসির ব্যবস্থাপনায় ব্লাড ডোনেশন, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, ইংলিশ স্পোকেন, কম্পিউটার ডিপ্লোমাসহ নানা প্রোগ্রামে সক্রিয় আছেন।

জানতে চাইলে তাহমিনা বলেন, ‘নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানের পাশাপাশি দেশের সামাজিক ও আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অংশগ্রহণ করাটা আমার জন্য অনেক আনন্দের। আমাদের দেশের মেয়েরা অনেকটা ঘরকুনো থাকে। আর একজন পুরুষের জন্য চলার পথটা যতটা মসৃণ, নারীর জন্য ততটা নয়। এই বাস্তবতা জীবনে চলার পথেই লক্ষ করা যায়। আমি মনে করি প্রতিযোগিতার বিশ্বে টিকে থাকতে হলে বিএনসিসির মতো গতানুগতিক সিলেবাসের বাইরে যে শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে থাকে তাই আসল সম্পদ। ’

‘শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বরের জন্য নয়, নতুন কিছু জানাও সেটা জীবন চলার পথটাকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যায়। আর বিএনসিসির ক্যাডাররা যেকোনো পরিবেশে সুশৃঙ্খলভাবে নেতৃত্বের নিপুণতা দেখিয়ে বহির্বিশ্বেও বাংলাদেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছে। ’-যোগ করেন তাহমিনা। তিন ভাই বোনের মধ্যে তাহমিনা মা-বাবার বড় সন্তান। মধ্যবিত্ত পরিবারের মনের মধ্যে পুষে রাখা অনেক স্বপ্ন পূরণ করতে সব বাধা পেরিয়ে দুরন্ত গতিতে এগিয়ে চলছে তাহমিনা। তাঁর ইচ্ছা এয়ার ফোর্সের শর্ট কোর্স করে ফ্লাই অফিসার হওয়া। কারণ দক্ষ ও যোগ্য ক্যাডেটদের মধ্য থেকে বিশেষ বাছাইয়ের মাধ্যমে সামরিক বাহিনীতে অফিসার হিসেবে যোগ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।


মন্তব্য