kalerkantho


দিন ফিরেছে লেবুচাষে

তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার   

১৯ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০



দিন ফিরেছে লেবুচাষে

... কক্সবাজারের রামুসহ পার্শ্ববর্তী বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় লেবুচাষে ভাগ্য বদল হয়েছে অনেকের। সবচেয়ে খুশির খবর, এক সময় যেখানে তামাকের আগ্রাসন ছিল সেই বাঁকখালী নদী তীরের উর্বর চর এখন সবুজ লেবুবাগানে ভরে গেছে ...

 

মুুক্তিযোদ্ধা মোজাফ্ফর আহমদ ১৯৮৩ সালে ১০০টি লেবুচারা রোপণ করেছিলেন।

দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে এসব লেবুগাছ ফলন দিয়ে যাচ্ছে। লেবুগাছ এত দীর্ঘায়ু হয়-সেটাও জানা ছিল না তাঁর। একবার রোপণ করা গাছ থেকে টানা প্রায় তিন যুগ ফল প্রাপ্তির বিষয়টিই এখন সবাইকে নাড়া দিয়ে বসেছে। তা দেখে এলাকার লোকজনও উদ্বুদ্ধ হয়ে পড়েছেন লেবুচাষে। ফলে লেবুচাষে বিপ্লব ঘটছে কক্সবাজারের রামুসহ পার্শ্ববর্তী বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায়। সবচেয়ে খুশির সংবাদ, এক সময় যেখানে তামাক পাতার আগ্রাসন ছিল সেই বাঁকখালী নদী তীরের উর্বর চর এখন সবুজ লেবুবাগানে ভরে গেছে।

এক বস্তা লেবু বিক্রি করে বাগানের মালিক পাচ্ছেন তিন হাজার টাকা। মাত্র দুই মাস আগে লেবুর ফলন যখন কমে গিয়েছিল তখন এক বস্তার দাম ছিল ছয় হাজার টাকা। অপরদিকে, একজন চাষি এক বস্তা ধান বিক্রি করে পান মাত্র ১৪০০ থেকে দেড় হাজার টাকা।

অন্যদিকে, তামাক পাতার চাষে লাভের চেয়ে বিড়ম্বনা বেশি। ধানচাষে স্বল্প সময়ে ফল ভোগ করলেও এক্ষেত্রে রোগ বালাই দমন-পীড়ন থেকে শুরু করে পরিচর্যায় ব্যয়ও হয় অত্যধিক। অথচ লেবুচাষে রোগ বালাই তেমন নেই। পরিচর্যায়ও ব্যয় সাপেক্ষ নয়। একবার রোপণ করে বছরের পর বছর ফল ভোগ করা যায়। তাই কক্সবাজারের রামু ও নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকায় লেবুচাষের প্রসার দ্রুত বাড়ছে।

কক্সবাজারের রামু ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় বর্তমানে কমপক্ষে ৭০০/৮০০ একর জমিতে লেবুবাগান  রয়েছে। তাও রামু উপজেলার চার ইউনিয়ন গর্জনিয়া, কাউয়ারখোপ, ফতেখারকুল ও রাজারকুল এবং নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়নে লেবুচাষের বিপ্লব শুরু হয়েছে। একসময় কক্সবাজার জেলায় লেবুর চাহিদা পূরণ করা হতো বাইরের জেলা থেকে এনে। কিন্তু সেই দৃশ্যপট বদলে গেছে। কক্সবাজারে উত্পাদিত লেবু দেশের প্রধান পর্যটন শহরের চাহিদা মিটিয়ে এখন ট্রাকে ট্রাকে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে।

জানা গেছে, বড় একটি পরিবারের সংসার মাত্র ৫০০ লেবু গাছের একটি বাগান নিয়ে বেশ ভালোভাবেই চলে যায়। প্রতিকানিতে (চল্লিশ শতক) ১০০ লেবু গাছ রোপণ করা হয়। অন্তত ১২ ফুট দুরে লেবুর চারার দূরত্ব থাকতে হয়। দুই একর বা ৫ কানি জমির একটি বাগানে ৫০০ লেবু গাছ থাকে। এ রকম একটি লেবু বাগানের আয় দিয়ে একটি বড় সংসারের খরচ মেটানো কোনো ব্যাপার না। খালপাড় বা পাহাড়ি পাদদেশের পতিত জমি অথবা বাৎসরিক লাগিয়ত দিয়ে ধান চাষযোগ্য জমিতেও করা যায় লেবুবাগান। প্রতিটি চারা ২০ টাকা করে মাত্র দুই হাজার টাকার চারা লাগে এক কানি জমিতে। জমির লাগিয়ত বাৎসরিক ৭/৮ হাজার টাকা এবং পরিচর্যা বাবদ বাৎসরিক ৪/৫ হাজার টাকা খরচ হয়।

লেবু গাছে মুকুল আসার তিন থেকে সাড়ে তিন মাস পরই লেবু পরিপক্ক হয়। প্রতিটি গাছে গড়ে ১০০টি করে লেবুধরলে এক কানি জমির বাগানে ১০ হাজার লেবু আসে। প্রতিটির দাম কমপক্ষে তিন টাকা করে হলেও ৩০ হাজার টাকা আয় হয় তিন থেকে সাড়ে তিন মাস সময়ের মধ্যে। এভাবে বছরের পর বছর ধরে গাছে লেবু ধরে। তবে বছরের কোনো কোনো সময় লেবু ধরা হ্রাস পায় আবার তেমনি বৃদ্ধি পায়।

একটি লেবুর চারা রোপণের বছর দেড়েকের মধ্যেই ফলন শুরু হয়। তাই লেবু চাষের দিকে লোকজন ঝুঁকছে।

পাহাড়ের চেয়ে লেবুচাষের সবচেয়ে উপযোগী জমি হলো নদী বা খালের ভরাট চর। বান্দরবানের পাহাড় থেকে নেমে আসা বাঁকখালী নদী তীরের ভরাট চরে এখন লেবুবাগানের সবুজের সমারোহ।

এ প্রসঙ্গে রামুর বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা মোজাফ্ফর আহমদ কালের কণ্ঠকে জানান, বাঁকখালী নদীর তীরে রামু হাইটুপি এলাকায় সামান্য ভরাট জমিতে লেবুচাষ শুরু করেছিলেন। পাহাড়ি পলিমাটিতে ভরাট চরে লাগানো লেবু চারা মাত্র এক বছরের মাথায় বড় হয়ে ফলন দেওয়া শুরু করে দেয়। পরবর্তীতে বাঁকখালীর ফুলনির চরে নিজের ও পরের জমি বর্গা নিয়ে তিনি বিশাল এলাকাজুড়ে গড়েন লেবু বাগান। তাঁর দেখাদেখি ভাই মোতাহারসহ এলাকার আরো অনেকে এগিয়ে আসেন লেবুবাগানে। বাঁকখালী নদীর বিস্তৃত ভরাট চর এখন লেবু বাগানে বাগানে ছেয়ে গেছে।

ওই এলাকায় লেবু বাগানের যাত্রা শুরু করেন মুক্তিযোদ্ধা মোজাফ্ফর। তিনিই এলাকার লোকজনকে বাগান করার জন্য উদ্বুদ্ধ করে তোলেন। লেবুবাগানে একে তো মূলধন কম লাগে আর শ্রমিকের সংখ্যাও তেমন বেশি প্রয়োজন হয় না। আগে এলাকার লোকজন নিজ ভিটিতে একটি লেবুর চারা রোপণ করতেন নিজের পরিবারের বা পাড়ার লোকজনের জন্য। কোনো বাণিজ্যিক চাষ ছিল না। এখন পুরোদমে চলছে লেবুর বাণিজ্যিক চাষ। কেবল নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়নে ৩/৪ শ একর লেবুবাগান রয়েছে। সেখানকার নুরুল আলম কম্পানি নামের একজনের রয়েছে বিশাল লেবুবাগান। নাইক্ষ্যংছড়ির পাহাড়ে পাহাড়েই এখন লেবুর বাগান। প্রায় প্রতিদিন নাইক্ষ্যংছড়ির লেবুর চালান ট্রাকে-জিপে করে যায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে।

এলাকায় সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে, বাঁকখালী নদী তীরের চরভরাট এলাকায় কয়েক বছর আগেও তামাকচাষ হতো ব্যাপকভাবে। তামাক চাষে পরিবেশ বিষিয়ে ওঠার বিষয়টি নিয়ে এলাকার মানুষের মধ্যে সচেতনতার সৃষ্টি হচ্ছে। এ কারণে দীর্ঘমেয়াদি সুফল ভোগ করার জন্য এলাকাবাসী তামাকচাষকে  বিদায় জানিয়ে লেবুবাগানে আসছেন এগিয়ে।


মন্তব্য