kalerkantho

দ্বিতীয় রাজধানী প্রতিদিন

১০ কোটির নিচে নেমেছে সিএসইর লেনদেন

সরকার ও বিএসইসির হস্তক্ষেপ কামনা বিনিয়োগকারীদের

রাশেদুল তুষার, চট্টগ্রাম   

২৩ মার্চ, ২০১৯ ০২:৫৭ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



১০ কোটির নিচে নেমেছে সিএসইর লেনদেন

চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) পরিচালন ব্যয় মেটাতে প্রতিদিন লেনদেন করা প্রয়োজন ৮০ থেকে ১০০ কোটি টাকা। সেখানে সপ্তাহজুড়ে লেনদেন হয়েছে মাত্র ৫০ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এর মধ্যে গত বৃহস্পতিবার লেনদেন হয়েছে ৯ কোটি ৫১ লাখ টাকা। গত ১৪ বছরে সিএসইতে সবচেয়ে কম লেনদেনের রেকর্ড এটি। মুনাফার ক্ষেত্রে গত কয়েক বছর ধরে টানা লোকসানে থাকা সিএসই মূলত পরিচালন ঘাটতি মেটাতে বিভিন্ন ব্যাংকে রক্ষিত প্রায় ৬০০ কোটি টাকা এফডিআর (ফিক্সড ডিপোজিট রিসিপ্ট) থেকে প্রাপ্ত সুদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

তবে লেনদেনের এই তলানি স্পর্শ করাকে হঠাত্ ছন্দঃপতন মনে করছেন না বিশ্লেষকরা। বরং দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিমুখতা, সিএসইর দ্বৈত সদস্যদের নিষ্ক্রিয়তা এবং বোর্ড সদস্যদের সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত না নিতে পারার কারণে একসময় জমজমাট পুঁজিবাজার বর্তমানে এই অবস্থায় পৌঁছেছে। সিএসইকে এই পরিস্থিতি থেকে তুলে আনতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি ও সরকারের হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছে বিনিয়োগকারীরা।

চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) একক ও দ্বৈত (ডুয়েল) মিলে সর্বমোট সদস্য আছে ১৪৮টি। এর মধ্যে শেয়ার লেনদেনের অনুমোদন আছে ১৩৮টির। তবে ১৩৮ সদস্যের মধ্যে ২৫ সদস্য শেয়ার লেনদেনে হাত গুটিয়ে বসেছিল বৃহস্পতিবার। আর ১৪ সদস্যের লেনদেন ছিল এক লাখ টাকার নিচে। সদস্যদের এমন নিষ্ক্রিয় থাকার ফলাফল ওই দিন দিনশেষে সিএসই লেনদেন হয়েছে মাত্র ৯ কোটি ৫১ লাখ টাকার। 

সিএসই সূত্র জানায়, গত সপ্তাহের চার কার্যদিবসে সিএসইতে মোট লেনদেন হয়েছে ৫০ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। গড় লেনদেন হয়েছে ১২ কোটি ৭১ লাখ টাকা। একই সময়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সাপ্তাহিক লেনদেন হয়েছে এক হাজার ৭২০ কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে সিএসইর মার্কেট শেয়ার মাত্র ২.৮৭ শতাংশ। অথচ পাঁচ বছর আগেও পুঁজিবাজারে সিএসইর হিস্যা ছিল ১০ শতাংশ।

সিএসইর বৃহস্পতিবারের লেনদেন চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এদিন সর্বোচ্চ ৯২ লাখ ৮৭ হাজার টাকার টার্নওভার করেছে কবির সিকিউরিটিজ। টার্নওভারে পরের অবস্থানে থাকা লঙ্কাবাংলা সিকিউরিটিজের অবস্থান ৯১ লাখ ৮৩ হাজার এবং বি রিচ লিমিটেডের ৬৬ লাখ ৩৭০ হাজার টাকা।
জানতে চাইলে কবির সিকিউরিটিজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শহীদুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুই স্টক এক্সচেঞ্জের মধ্যে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। সিএসই কৌশলগত অংশীদার পাচ্ছে না। কারণ তারাও বাড়তি সুবিধা চায়। কিন্তু সিএসইর বড় সমস্যা এই বাজারের গভীরতা নাই।’

বাংলাদেশের মতো দেশে দুটি পুঁজিবাজার থাকার যৌক্তিকতা দেখেন না কবির সিকিউরিটিজের এই শীর্ষ কর্মকর্তা। বরং দুটি বাজার একসঙ্গে মিলে গেলেই সবার জন্য ভালো বলে মনে করেন তিনি।

চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের এ অবস্থার জন্য সিএসইর পরিচালনা পর্ষদ ও বোর্ডকে দায়ী করেছেন চট্টগ্রাম ইনভেস্টরস ফোরামের আহ্বায়ক আসলাম মোরশেদ। তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে যে স্টেকহোল্ডাররা এখনো লেনদেন করছে তারা দুই দিক দিয়েই লুজার। অথচ অবকাঠামো, কারিগরি দক্ষতা অনেক দিক দিয়েই সিএসই ঢাকার চেয়ে এগিয়ে। কিন্তু আসল যে ট্রেড সেখানেই দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে সিএসই। সিএসইর মার্কেটিং পলিসি ঠিক নেই। স্টক এক্সচেঞ্জটিকে টিকিয়ে রাখতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সিএসই বোর্ড ব্যর্থ হয়েছে।’ তিনি অস্তিত্ব সংকটে থাকা সিএসইকে বাঁচিয়ে রাখতে বিএসইসির বিশেষ নজরদারি এবং সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন। 

সিএসই লেনদেন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার পেছনে স্টেকহোল্ডারদের লেনদেনে নিষ্ক্রিয়তাকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। সিএসইর তথ্যানুযায়ী, লঙ্কাবাংলা সিকিউরিটিজ লিমিটেড ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সিএসইতে তিন হাজার ২০৯ কোটি টাকার লেনদেন করেছে। একই সময়ে মাত্র এক হাজার ছয় টাকা লেনদেন করেছে সিএসইর আরেক স্টেকহোল্ডার নরবান সিকিউরিটিজ লিমিটেড। কিন্তু বছর শেষে সিএসইর ঘোষিত ৫ শতাংশ ডিভিডেন্ড অনুযায়ী, উভয় স্টেকহোল্ডারই মুনাফা পেয়েছে ২১ লাখ টাকা। লেনদেন না করেও সমান মুনাফা পাওয়ার কারণে দ্বৈত স্টেকহোল্ডাররা সিএসইতে লেনদেনে আগ্রহী নয়। অথচ সিএসই সদস্যদের ৪৪ জনই দ্বৈত সদস্য এবং সক্ষমতার বিচারে এরাই বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে ‘মার্কেট প্লেয়ার’ হিসেবে চিহ্নিত।

এদিকে নতুন স্টেক ইস্যুর বিষয়টিও দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। এর জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো সিএসই বোর্ডকে দায়ী করছে। স্টেক ইস্যুর ব্যাপারে ২০১৫ সালে একটি পরিকল্পনা জমা দেওয়া হয়েছিল। সেই পরিকল্পনায় সিএসইতে অন্তত ২০০ নতুন স্টেক ইস্যুর পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। সেটা বাস্তবায়িত হলে সিএসইকে এই কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতো না বলে মনে করেন পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা। কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে আগামী তিন বছরের মধ্যে ১০০ নতুন স্টেক ইস্যু করার যে পরিকল্পনার কথা জানানো হচ্ছে সেটাও আটকে আছে বোর্ডের সিদ্ধান্তের ওপর।

নিষ্ক্রিয় সদস্যদের ব্যাপারে সিএসইর অবস্থান জানতে চাইলে সিএসই পরিচালক মেজর (অব.) এমদাদুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তাদের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা হচ্ছে। শিগগিরই তাদের আমরা চিঠি দেব। তবে তাদের বক্তব্য হচ্ছে সিএসই বাজারে গভীরতা নেই বলে তারা লেনদেন কম করছে। আবার তারা লেনদেন করছে না বলে সিএসই বাজার গভীরতা হারাচ্ছে। আমরা আছি উভয় সংকটে। আমরা এখান থেকে উত্তরণের চেষ্টা করছি।’

নতুন স্টেক ইস্যু প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নতুন স্টেক ইস্যুর ব্যাপারে বোর্ডে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। আমরা একটি কমিটি করে দিয়েছি। সে কমিটি কাদের, কোন কন্ডিশনে স্টেক ইস্যু করবে সে ব্যাপারে আগামী বোর্ড সভায় রিপোর্ট পেশ করবে। আশা করছি সেখানে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসবে।’ 

মন্তব্য