kalerkantho

দ্বিতীয় রাজধানী প্রতিদিন

আ. লীগের কট্টর বিরোধীরা চট্টগ্রামে নৌকার মাঝি?

নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০৩:০৮



আ. লীগের কট্টর বিরোধীরা চট্টগ্রামে নৌকার মাঝি?

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন সংসদ নির্বাচনের দাবিতে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের বিক্ষোভ মিছিলে নেতৃত্বে ছিলেন উপজেলা এলডিপি সভাপতি জিয়াউল হক চৌধুরী বাবুল। এর আগে তিনি দীর্ঘদিন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বাবুল আ. লীগ বিরোধী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। জামায়াত নেতাদের সঙ্গেও তাঁর সখ্যের অভিযোগ রয়েছে এলাকায়। প্রায় এক মাস আগে এলডিপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগদান করা এই বাবুলের নামই লোহাগাড়া উপজেলা চেয়ারম্যান পদে একক প্রার্থী হিসেবে কেন্দ্রে পাঠানো হয়। অন্যদিকে বাদ দেওয়া হয়েছে লোহাগাড়া উপজেলা ও জেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে মনোনয়নপ্রত্যাশী তিনজনকে। ইতিমধ্যে এর প্রতিবাদ জানিয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতারা দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী, সাধারণ সম্পাদকসহ মনোনয়ন বোর্ডের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানায়।

এদিকে চন্দনাইশ উপজেলা চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ থেকে নাম পাঠানো হয়েছে এলডিপি থেকে প্রায় দুই বছর আগে যোগদানকারী আবদুল জব্বার চৌধুরীর। তিনি এলডিপির সমর্থনে টানা দুইবারের উপজেলা চেয়ারম্যান। তিনি এলডিপি চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন এলাকায়। আবদুল জব্বার চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, আমি ২০১৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছি। আমার নাম একক প্রার্থী হিসেবে কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। আওয়ামী লীগ থেকে প্রার্থী মনোনয়ন দিলে আমার বিজয়ের সম্ভাবনা শতভাগ। আমি একসময় ছাত্রলীগ দিয়ে আমার রাজনীতি শুরু করেছি। ঘরের ছেলে আবার ঘরে ফিরে এসেছি।

জব্বার তাঁর নাম আ. লীগ থেকে এককভাবে পাঠানো হয়েছে বলে দাবি করলেও দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান তা অস্বীকার করেন। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল জব্বারসহ আমরা দল থেকে তিনজনের নাম কেন্দ্রে পাঠিয়েছি।’

লোহাগাড়া উপজেলা চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী দলের চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা শাখার উপপ্রচার সম্পাদক নুরুল আবছার চৌধুরী গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, বাবুল কোনো দিন আওয়ামী লীগ, ‘জয় বাংলা’ নাম মুখে নেননি। বরং ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে চাইলে আমাদের বাধা দিয়েছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগবিদ্বেষী হিসেবে পরিচিত। এখন আমাদের দলে এসে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারবেন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারবেন মনে করে এখানে এসেছেন। আমরা তাঁকে মনোনয়ন না দেওয়ার জন্য লিখিতভাবে কেন্দ্রে অভিযোগ করেছি। কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে দেখা করেছি। তিনি বিষয়টি দেখবেন বলে আমাদের জানিয়েছেন।

নুরুল আবছার চৌধুরী আরো বলেন, ‘আমি, উপজেলা সভাপতি (খোরশেদ আলম চৌধুরী) এবং জেলা পরিষদের সদস্য আনোয়ার কামালের নাম জেলায় পাঠানো হলেও জেলা কমিটি আমাদের তিনজনকে বাদ দিয়ে এলডিপি সভাপতি বাবুলের একক নাম পাঠিয়েছে। তিনি কখনো জামায়াতের সুবিধা, কখনো বিএনপি এবং এলডিপি রাজনীতির সঙ্গে ছিলেন। এ রকম একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে আ. লীগ থেকে একক নাম পাঠানোয় আমাদের তৃণমূলে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।’

এদিকে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করা লোহাগাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খোরশেদ আলম চৌধুরী বলেন, বাবুল শুধু আ. লীগ বিরোধীই নয়, তাঁর বিরুদ্ধে থানায় বেশ কিছু মামলা রয়েছে। আমি আ. লীগ সভাপতি, দীর্ঘদিন ধরে দলে আছি। কিন্তু আমাদের দল ও সরকারের বিরুদ্ধে ছিলেন বাবুল। আর তাঁকেই একক প্রার্থী করে জেলা আওয়ামী লীগ থেকে কেন্দ্রে নাম পাঠানো হয়েছে। আমি ঢাকায় গিয়ে সবার সঙ্গে দেখা করে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি।

তবে জিয়াউল হক চৌধুরী বাবুল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি ১৯৯০ সালের আগে বিএনপিতে ছিলাম। ’৯১ থেকে ’৯৬ আওয়ামী লীগে ছিলাম। এরপর আর রাজনীতি করেনি।’ জামায়াত ও এলডিপি নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন কর্মসূচিতে ছিলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি সব সময় জামায়াতবিরোধী। তবে আমি যখন জনপ্রতিনিধি ছিলাম তখন হয়তো সরকারি অনুষ্ঠানে দেখেছেন। ওই ছবিগুলো কোন সময়ের।’ সরকারবিরোধী সমাবেশে অংশ নেওয়া প্রসঙ্গে বাবুল বলেন, ‘এগুলো তো আগের ছবি। আমি গত নির্বাচনে (একাদশ সংসদ) আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে কাজ করে তাঁকে বিজয়ী করেছি। আমি ৩২ বছর জনপ্রতিনিধি ছিলাম। আমাদের বিরুদ্ধে একটি মহল অপপ্রচার চালাচ্ছে।’

আ. লীগ নেতাদের বাদ দিয়ে কেন এলডিপি থেকে সম্প্রতি আওয়ামী লীগে যোগদান করা বাবুলের একক প্রার্থীর নাম কেন্দ্রে পাঠানো হলো-জানতে চাইলে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন,‘ আসলে আমরা গত উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী দেওয়ার জন্য দল থেকে কাউকে পাইনি। জামায়াতকে ঠেকানোসহ নিজেদের প্রার্থী বিজয়ী করতে আমরা বাবুলের বিকল্প কাউকে সেখানে দেখছি না। তাই সর্বসম্মতিক্রমে সাবেক চেয়ারম্যান বাবুলের নাম আমরা কেন্দ্রে পাঠিয়েছি। আর যেকেউ মনোনয়ন চাইতে পারে। তবে দল যাকে মনোনয়ন দিবে আমরা তাঁর পক্ষে কাজ করবো’।

 এছাড়া চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার আওতাধীন সাতকানিয়া, পটিয়া, বাঁশখালী, বোয়ালখালী ও আনোয়ারা উপজেলায়ও চেয়ারম্যান পদে একক নাম পাঠানো হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। তবে জেলার সাধারণ সম্পাদক জানান, বাঁশখালী ও চন্দনাইশে তিনজন করে নাম পাঠানো হয়েছে। অপরগুলোতে একক প্রার্থী হিসেবে কেন্দ্রে নাম পাঠানো হয়েছে। বিভিন্ন উপজেলায় অনিয়মের মাধ্যমে একক প্রার্থীর নাম কেন্দ্রে পাঠানোরও অভিযোগ রয়েছে আওয়ামী লীগের তৃণমূলে। 

৩য় ধাপে উপজেলা নির্বাচনে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার আওতাধীন ৮টি উপজেলার মধ্যে ওই ৭টিতে ভোট হওয়ার কথা রয়েছে। কর্ণফুলী উপজেলা মেয়াদ উর্ত্তীণ না হওয়ায় এখন সেখানে নির্বাচন হবে না।

অপরদিকে চট্টগ্রাম উত্তর জেলার ৭টি উপজেলায় ২য় ধাপে আগামী ১৮ মার্চ ভোট হওয়ার কথা রয়েছে। এসব উপজেলায় কেন্দ্র থেকে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হয়।



মন্তব্য