kalerkantho

দ্বিতীয় রাজধানী প্রতিদিন

আইপি সনদ ইস্যু নিয়ে ভোগান্তিতে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা

আমদানি চট্টগ্রামে অনুমতি ঢাকায়!

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

২০ জুলাই, ২০১৮ ০২:১০



আমদানি চট্টগ্রামে অনুমতি ঢাকায়!

পণ্য আমদানিকারক চট্টগ্রামের। আমদানি হবে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। বিক্রিও হবে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে। কিন্তু পণ্য আমদানির জন্য সনদ নিতে হবে ঢাকা থেকে। এমন এক অদ্ভুত নিয়ম চালু করেছে উদ্ভিদ সংগনিরোধ দপ্তর। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন এই বিভাগ গত ২০ জুন থেকে নতুন এই আদেশ জারি করায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন চট্টগ্রামকেন্দ্রিক ব্যবসায়ীরা। 

চট্টগ্রামের বদলে ঢাকা থেকে সনদ ইস্যু করায় চট্টগ্রামকেন্দ্রিক ব্যবসায়ীদের ১০ থেকে ১২ দিন বাড়তি সময় লাগছে। আগে যেটি দিনে দিনে কিংবা এক দিনেই হতো। এই বাড়তি সময়ের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য পড়ে থাকছে। গুনতে হচ্ছে বাড়তি মাসুল। এর প্রতিবাদে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা গত রবিবার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে মানববন্ধনও করেছেন।

চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম বলছেন, ‘কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া চট্টগ্রাম থেকে এই সনদ ইস্যু বন্ধ করার সিদ্ধান্ত চক্রান্ত বলেই মনে হচ্ছে। এতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। ঢাকা কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর থেকে আইপি সংগ্রহ করা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। এতে শুধু চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরাই পিছিয়ে পড়েছেন। আমরা দ্রুত এর সুরাহা চাই।’

ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের মোট আমদানি পণ্যের সিংহভাগ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানি হয়। আর কৃষিজাত পণ্যের ৮৭ ভাগই আমদানি হয় দেশের প্রধান এই সমুদ্রবন্দর দিয়ে। ২০০২ সালের আগ পর্যন্ত কৃষিজাত পণ্যের আমদানি অনুমতিপত্র (আইপি) দেওয়া হতো উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্র ঢাকা থেকে। এতে চট্টগ্রাম-ঢাকা দৌড়াদৌড়ি করতে বিপুল সময় লাগত। সময় লাঘবে চট্টগ্রাম চেম্বার ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে ২০০২ সালে চট্টগ্রাম কেন্দ্র থেকে আইপি দেওয়ার নিয়ম চালু হয়। 

এই কাজে জড়িত একাধিক সিঅ্যান্ডএফ কর্মচারী বলছেন, আমদানি অনুমতিপত্র চট্টগ্রাম থেকে সরবরাহ দেওয়া হলেও অনুমতি দেওয়া হতো ঢাকা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে। আমদানিকারকের প্রতিনিধি হিসেবে সিঅ্যান্ডএফ কর্মকর্তারা যাবতীয় কাগজপত্র চট্টগ্রাম উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রে জমা দিতেন। আর সেই কাগজপত্র যাচাই করে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ঢাকায় পাঠিয়ে দিতেন চট্টগ্রাম উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের কর্মকর্তারা। ঢাকা থেকে সেগুলো অনুমোদন হয়ে চট্টগ্রামে ফেরত আসত। চট্টগ্রাম থেকেই অনুমোদনের কপি সংগ্রহ করতেন আমদানিকারকের প্রতিনিধিরা। এই কাজটি করতে চট্টগ্রাম কেন্দ্রের কর্মকর্তারা ব্যাপক আর্থিক লেনদেন করতেন বলে অভিযোগ ওঠে। 

পরে ২০১৫ সালে বিদেশ থেকে তুলা আমদানির একাধিক চালানে জালিয়াতি ও ঘষামাজা করে মান যাচাই ছাড়া ছাড়পত্র প্রদানের প্রতিবেদন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। বিষয়টি তদন্ত করতে কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের তদন্ত দল চট্টগ্রাম আসে। তদন্ত শেষ করে যাওয়ার আগে রেজিস্ট্রারে চট্টগ্রাম থেকে আইপি দেয়া বন্ধ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অনিয়মের অভিযোগে চট্টগ্রাম উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক আবদুর রশিদ মিয়াকে চট্টগ্রাম থেকে বাগেরহাটে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়। আরেক কর্মকর্তা মোহাম্মদ সালাউদ্দিনকে পটুয়াখালীর রাঙাবালিতে বদলি করা হয়।

এরপর থেকে কিছু কিছু সনদ চট্টগ্রাম থেকে ছাড় পেলেও বেশির ভাগই নিতে হতো ঢাকা থেকে। সর্বশেষ গত ২০ জুন এক আদেশে চট্টগ্রাম থেকে আইপি সনদ ইস্যু বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর থেকে ব্যবসায়ীরা আবার ভোগান্তিতে পড়েন। 

বন্ধের কারণ জানতে চাইলে চট্টগ্রাম উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের উপপরিচালক জহিরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, জাতীয় উদ্ভিদ সংগনিরোধ কর্তৃপক্ষ গঠনের পর শুধুমাত্র ঢাকা থেকে এই সনদ দেওয়ার বিধান যুক্ত করা হয়। এর ফলে চট্টগ্রাম থেকে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। 

তিনি আরো বলেন, বন্ধের নির্দেশনা আসার আগ পর্যন্ত আমরা প্রতিমাসে গড়ে প্রায় ৩০০ সনদ ইস্যু করতাম চট্টগ্রাম কেন্দ্র থেকে। বন্ধ হওয়ার কারণে রাজস্ব একটু কমেছে। তবে আমরা চট্টগ্রাম কেন্দ্র থেকে ছাড়পত্র দিচ্ছি।

জহিরুল ইসলাম বলেন, চট্টগ্রাম কেন্দ্র থেকে ইস্যু করা হলে অবশ্যই ব্যবসায়ীরা সুফল পেতেন। কিন্তু এই দাবি তো করবেন ব্যবসায়ীরা। তিনি আশা করেন, কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে এই নির্দেশনা বাতিল করা হবে। 

খাতুনগঞ্জ ট্রেড ও ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক জামাল হোসেন বলেন, অত্যন্ত সুকৌশলে এই ধারা বাতিল করা হয়েছে। জাতীয় উদ্ভিদ সংগনিরোধ কর্তৃপক্ষ গঠনের সময় বিধিতে ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রাম থেকে সনদ ইস্যু যুক্ত না করাটা চক্রান্ত ছাড়া কিছু নয়।



মন্তব্য