kalerkantho

দ্বিতীয় রাজধানী প্রতিদিন

সেন্ট মার্টিনসের রক্ষণাবেক্ষণ এক হাতে রাখার পরামর্শ

পর্যটক সীমিত করার সুপারিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৩ মে, ২০১৮ ০১:৪৮



সেন্ট মার্টিনসের রক্ষণাবেক্ষণ এক হাতে রাখার পরামর্শ

দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনসের রক্ষণাবেক্ষণে একক কেউ দায়িত্বে না থাকায় সেখানে প্রকাশ্যে মাদক আর ইয়াবা ব্যবসা চলছে। বিরল কোরাল দিয়ে তৈরি হচ্ছে বহুতল ভবন। টেকনাফ থেকে প্রকাশ্যে নির্মাণসামগ্রী যাচ্ছে সেখানে। সেন্ট মার্টিনস এখন গুলিস্তানের মতো হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক জীববৈচিত্র্য দিবস উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর এলজিইডি ভবনে এক কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া সবার চোখের সামনে কিভাবে সেন্ট মার্টিনসে বহুতল হোটেল গড়ে উঠছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ। তাঁরা সেন্ট মার্টিনসে পর্যটকসংখ্যা সীমিত করাসহ সেখানকার প্রায় ১০ হাজার বাসিন্দাকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেন। এ ছাড়া সেন্ট মার্টিনসের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব একক কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থাকে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। 

সেন্ট মার্টিনসের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় করণীয় ঠিক করতে জাতীয় এ কর্মশালার আয়োজন করে পরিবেশ অধিদপ্তর। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন পরিবেশ ও বন উপমন্ত্রী আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব, পরিবেশসচিব আবদুল্লাহ আল মোহসীন চৌধুরী ও পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. সুলতান আহমেদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক সোলায়মান হায়দার।

কর্মশালায় সেন্ট মার্টিনস নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র উপস্থাপন করা হয়। তবে এই প্রামাণ্যচিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড থেকে অংশ নেওয়া প্রতিনিধি কমান্ডার মোহাম্মদ কামরুল বলেন, ‘কর্মশালায় যে ডকুমেন্টারি দেখানো হয়েছে, তার ৫০ শতাংশ সেন্ট মার্টিনসের নয়। অন্য কোথাকার। কারণ সেন্ট মার্টিনসের এত ভালো অবস্থা নেই।’ 

কমান্ডার মোহাম্মদ কামরুল আরো বলেন, ‘সেন্ট মার্টিনস প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হওয়া সত্ত্বেও ৪০ দিনের মধ্যে সেখানে কিভাবে হোটেল গড়ে ওঠে? আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কোথায়? উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কিভাবে সেখানে ভবন নির্মাণের অনুমতি দেন? ওই সব হোটেল করতে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র আছে কি না?’

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রতিদিন সেখানে পাঁচ থেকে সাত হাজার পর্যটক যাচ্ছে। কিন্তু সেখানে তো কোনো পয়োব্যবস্থা নেই। সে পয়োবর্জ্য যাচ্ছে কোথায়? আমি অনুসন্ধান করে দেখেছি, সব টয়লেট উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। সব ময়লা-আবর্জনা গিয়ে সমুদ্রে পড়ছে। প্রতিদিন কোরাল ভেঙে ভেঙে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এক বড় ব্যবসায়ী তো সেখানে রীতিমতো রাজপ্রাসাদ করছেন। সব হচ্ছে প্রশাসনের নাকের ডগায়।’ 

কমান্ডার মোহাম্মদ কামরুল বলেন, সেন্ট মার্টিনসের ৪০ শতাংশ জমির মালিক এখন স্থানীয় লোকজন। বাকি ৬০ শতাংশের মালিকানা হয়ে গেছে বাইরের মানুষের। সেখানে জেনারেটর বসানোর কারণে বিকট শব্দ হচ্ছে। এটি জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

কর্মশালায় অংশ নেওয়া অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল আশরাফ উদ্দিন বলেন, ‘সেন্ট মার্টিনসে কী না হয়! সেখানে সবই চলে। টাকা দিয়ে ইয়াবা ব্যবসা চলে। ২৫০ জনের ধারণক্ষমতার লঞ্চে এক হাজার ২০০ জনও ওঠে। মানবপাচার হয়।’ যেভাবে চলছে, তাতে একসময় সেন্ট মার্টিনসে কোনো কোরাল থাকবে না বলে আশঙ্কা তাঁর।

পর্যটন বিশেষজ্ঞ আবদুল ওয়াহাব আকন্দ বলেন, সেন্ট মার্টিনসে সাময়িক সময়ের জন্য পর্যটক যাওয়া বন্ধ করতে হবে। পর্যটকদের শুধু সেন্ট মার্টিনসের চারপাশ ঘুরিয়ে দেখানো যেতে পারে। কিছুতেই রাতের বেলায় সেখানে থাকতে দেওয়া যাবে না। এ ছাড়া পর্যটকসংখ্যা কমাতে হবে। এখন যেমন দিনে পাঁচ থেকে সাত হাজার যায়, এটিকে ৫০০ থেকে ৮০০-এর মধ্যে সীমিত রাখতে হবে, যেটা পৃথিবীর অনেক পর্যটন স্থানে চালু আছে। 

বন বিভাগের প্রতিনিধি আরিফুল হক বেলাল বলেন, ‘সুন্দরবনে আমরা একটি নিয়ম চালু করেছি, সুন্দরবনের ভেতরে রাতে থাকা যাবে না। নদীতে লঞ্চের মধ্যে থাকতে পারবে। এটি করতে সবার সহযোগিতা পেয়েছি। এমনটা সেন্ট মার্টিনসে করা যেতে পারে।’

পরিবেশসচিব আবদুল্লাহ আল মোহসীন চৌধুরী মনে করেন, সেন্ট মার্টিনসের দায়িত্ব একক কাউকে দেওয়া উচিত। এর রক্ষণাবেক্ষণ এখন নৌপরিবহন, পর্যটন, পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন জড়িত। এর দায়িত্ব একক কাউকে দিলে সেন্ট মার্টিনসের ভালো হবে। তিনি বলেন, সেখানকার জনসংখ্যাকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া কঠিন হবে। তবে জনসংখ্যাকে নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। 

উপমন্ত্রী আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব বলেন, যেকোনো মূল্যে সেন্ট মার্টিনসকে রক্ষা করতে হবে। সেখানে পর্যটকদের রাতে থাকতে দেওয়া ঠিক নয়। স্থানীয় বাসিন্দা বাদে কাউকে রাতে রাখা যাবে না। সেন্ট মার্টিনসকে রক্ষায় সেখানকার জমি অধিগ্রহণ সরকার করতে পারে। সে জন্য বড় আকারে প্রকল্প নিতে পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন তিনি।

পরিবেশমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, সেন্ট মার্টিনস যে এখনো বেঁচে আছে, তা বিশাল সৌভাগ্যের বিষয়। দ্বীপটি বাঁচিয়ে রাখতে মানুষের সচেতনতাও জরুরি। তবে রাতের বেলায় দ্বীপে কাউকে থাকতে দেওয়া উচিত নয়।  

এ বিষয়ে সবার সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দ্বীপের মধ্যে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা হোটেলগুলো পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ছাড়পত্র নিয়েছে কি না তা যাচাই-বাছাই করতে পরিবেশ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেন তিনি। যদি না নিয়ে থাকে তাহলে একটি নীতিমালা তৈরি করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণেরও নির্দেশ দেন মন্ত্রী। 

পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. সুলতান আহমেদ বলেন, সেন্ট মার্টিনস এখন গুলিস্তানের মতো হয়ে গেছে। দূষণে এর অস্তিত্ব এখন হুমকিতে। যেসব মতামত এসেছে, তা সব অংশীজনের সঙ্গে বসে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।



মন্তব্য