kalerkantho

দ্বিতীয় রাজধানী প্রতিদিন

সীতাকুণ্ডে দুই ত্রিপুরা পরিবারে মাতম

‘মা রে, আমারে ফেলে কেমনে চলে গেলি তুই’

সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি   

২০ মে, ২০১৮ ০৪:১৩



‘মা রে, আমারে ফেলে কেমনে চলে গেলি তুই’

‘মা রে, আমারে ফেলে কেমনে চলে গেলি তুই? পাহাড়ে যাওয়ার সময়ও তো তোর কোনো অভিমান ছিল না। কত যত্নে তোরে বড় করেছিলাম। কী করে আমাকে ছেড়ে যেতে পারলি তুই?’ বুক চাপড়াতে চাপড়াতে এই বিলাপ করছিলেন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল মহাদেবপুর ত্রিপুরা আদিবাসীপাড়ায় নিহত কিশোরী ছবি রানী ত্রিপুরার বাবা সুমন ত্রিপুরা। 

গতকাল শনিবার বিকেলে মেয়ের লাশসংক্রান্ত আইনগত প্রক্রিয়া শেষ করতে থানায় আসেন তিনি। এখানেও মাঝেমধ্যেই বিলাপ করে উঠছিলেন তিনি। সুমন ত্রিপুরা বলেন, ‘আমার দুই ছেলে আর এই একটিই মেয়ে ছিল। একটি মেয়ের খুব শখ ছিল আমার। বিভিন্ন মন্দিরে গিয়ে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছিলাম যেন একটি মেয়ে হয়। সেই মেয়ে পেয়ে যে কত খুশি হয়েছিলাম। আমি অনেক গরিব মানুষ। দিন এনে দিন খাই। কিন্তু বিশ্বাস করুন, এ মেয়েকে একটুও কষ্ট দিইনি কোনো দিন। রানীর মতো রেখেছিলাম। কোনো ভারী কাজ করতে দিতাম না। আমার এত আদরের সেই মেয়েটাকে কেউ এভাবে মেরে ফেলতে পারে, কল্পনাও করিনি,’  বলেই আবারও হাউমাউ করে কাঁদেন এই পিতা। 

সুমন বলেন, ‘ওর মা মঙ্গলতি ত্রিপুরা বাপের বাড়িতে বেড়াতে গেছিল। সে কি জানত আর মেয়েকে দেখবে না? আমি সেদিন সকালে মেয়ের হাসিমুখ দেখে পাহাড়ে কাজ করতে গেছি। কিন্তু মেয়েকে আর দেখব না জানলে আমি কোনো দিনও পাহাড়ে যেতাম না। আমার মেয়ের তো কোনো দোষ ছিল না। সে কেন এমনভাবে মরল? আপনারা আমাকে বলেন, আমি এখন কী করব?’ হতভাগ্য পিতা আবার বলেন, ‘কী কপাল দেখেন, মরার পরও মেয়েটা শান্তি পাচ্ছে না। লাশ নিয়ে কত টানাটানি হচ্ছে। এখনো লাশের শেষকৃত্য করতে পারলাম না। থানায় এসেছি কাগজপত্র নিতে। অনুমতি পেলে রাতে দুজনের লাশের সৎকার করা হবে।’ 

সুমন ত্রিপুরার মতো মেয়েকে হারিয়ে পাগলপ্রায় সুকলতি ত্রিপুরার বাবা ফলিন ত্রিপুরা ও মা প্রতিবালা ত্রিপুরাও। ফলিন ত্রিপুরা বলেন, ‘আবুল হোসেন নামের ছেলেটা আমার মেয়েরে বিরক্ত করত। আমরা পাড়ায় বসে মিটিং করছি। তার পরও তার কাছ থেকে মেয়েরে বাঁচাতে পারলাম না। আমরা গরিব মানুষ। আপনারা ছাড়া আমাদের আর কেউ নাই। ওই ছেলের যেন ফাঁসি হয়, আপনারা দেখবেন। আমার মেয়ের জীবন যে কেড়ে নিল, ঈশ্বর যেন তারে তেমন শাস্তি দেন।’

গতকাল বিকেলে নিহতের স্বজন ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বিভিন্ন এলাকার মানুষ দুষ্কৃতকারীদের শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন করে। সেখানেও বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষকে হাউমাউ করে কাঁদতে দেখা গেছে। সবারই এককথা, এ মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। অনেক কষ্ট স্বীকার করে তারা যুগ যুগ পাহাড়ে বসবাস করছে। জায়গা-জমি নিয়েও কারো সঙ্গে বিরোধ ছিল না। এর পরও কেন এভাবে খুন হতে হলো তাদের—এ প্রশ্নই ছিল সবার মুখে মুখে। 

এদিকে ত্রিপুরাপাড়ার এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সীতাকুণ্ডের সবার মধ্যে। গতকাল সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে এ নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ সীতাকুণ্ড শাখার সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব কুমার দে, ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘দুটি মেয়েকে এভাবে ধর্ষণ ও খুন করা হয়েছে দেখে আমরা বাক্রুদ্ধ।’ সঞ্জীব দে বলেন, ‘আমরা ঘটনার কথা জেনে শনিবার সকালে পরিষদের নেতারা ত্রিপুরাপাড়ায় যাই। তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা ছিল না। আমরা খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’ সীতাকুণ্ড থানার ওসি মো. ইফতেখার হাসান বলেছেন, মামলায় একজনকে আসামি করা হলেও অজ্ঞাতপরিচয় যারা এ ঘটনায় জড়িত ছিল সবাইকে অতি শিগগির গ্রেপ্তার করা হবে।



মন্তব্য