kalerkantho

দ্বিতীয় রাজধানী প্রতিদিন

‘অভাবকেই ছুটি দিয়েছে আমার বোন’

এস এম রানা ও জাহাঙ্গীর আলম, সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম) থেকে   

১৫ মে, ২০১৮ ১৮:০৪



‘অভাবকেই ছুটি দিয়েছে আমার বোন’

ছবি : কালের কণ্ঠ

তাঁদের মধ্যে কারো স্বামীর সংসারে তীব্র অভাব। কেউ বা স্বামী পরিত্যক্তা। সন্তান নিয়ে খেয়ে-না-খেয়ে দিনাতিপাত করতেন। তাঁদের ঘরে দু-মুঠো অন্ন নেই। নুন আনতে পান্তা ফুরায় দশা। মুখগুলো শুকনো, শরীরগুলো রোগক্লিষ্ট।

এমন হাজারো নারী জড়ো হয়েছিলেন ইফতারসামগ্রী নিতে। রোজায় সন্তানদের মুখে একটু ভালো খাবার তুলে দেবেন—এমন আশায় দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে এসেছিলেন তাঁরা। প্রতিটি প্যাকেটে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকার ইফতারসামগ্রী পাওয়ার আশায় রবিবার রাত থেকেই হতদরিদ্র নারীদের বিপুল সমাগম ঘটেছিল সাতকানিয়ার নলুয়া ইউনিয়নের পূর্ব গাটিয়াডেঙ্গা গ্রামের কাদেরিয়া মঈনুল উলুম দাখিল মাদরাসা মাঠে। তাঁরা ভেবেছিলেন—কত দিন একসঙ্গে ১০ কেজি চাল কিনতে পারিনি। সেই সঙ্গে পাঁচ কেজি ছোলা, চিনি, ডাল আর লবণ। আর কত কী ইফতারসামগ্রী! সবই একসঙ্গে পাওয়া যাবে। সেই সঙ্গে জুটবে একটি নতুন শাড়ি ও নগদ এক হাজার টাকা। এমন স্বপ্ন বুনে ইফতারসামগ্রী নিতে আসা নারীদের আশায় গুড়ে বালি। তাঁদের ১০ জন প্রাণ দিয়েই স্বপ্নের সমাধি রচনা করলেন। ইফতারসামগ্রী নিয়ে তাঁদের আর হাসিমুখে বাড়ি ফেরা হয়নি। সাদা ব্যাগে ভরে পুলিশ তাঁদের নিথর দেহ অ্যাম্বুল্যান্সে করে বাড়ি পাঠিয়েছে।

কাদেরিয়া মঈনুল উলুম দাখিল মাদরাসার একটি কক্ষ মেডিক্যাল সেন্টার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ওই কক্ষের মেঝেতে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে ৯ নারীর নিথর দেহ। নিথর দেহগুলোর ওপর কাগজে নাম লিখে রেখেছে পুলিশ। সেখানে মরণ-কান্নায় ভেঙে পড়েন একজন নারী। রেজিয়া বেগম নামের এই নারীর ছোট বোন নূরজাহানের নিথর দেহ পড়ে আছে ওই ৯ নারীর কাতারে। বোনের মরদেহের কাছে বসে কান্নায় ভেঙে পড়া রেজিয়াকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্যও ওই কক্ষে কেউ ছিল না। একদল পুলিশ সদস্য মরদেহ শনাক্ত ও প্রয়োজনীয় তথ্য লিখছিলেন আর সংবাদকর্মীরা তুলছিলেন ছবি।

বোনের মৃত্যুর বিষয়ে জানতে চাইলে রেজিয়া বলেন, বোনকে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। প্রিয়া ও রিয়া নামের দুই সন্তান আছে তাঁর। কিন্তু স্বামী মোহাম্মদ শফি নূরজাহানকে ছেড়ে যায়। এ কারণে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে হয় নূরজাহানকে। এরই মধ্যে লোকমুখে ইফতারসামগ্রী বিতরণের খবর পেয়ে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে লোহাগাড়ার কলাউজান থেকে এসেছিলেন ইফতারসামগ্রী নিতে। কিন্তু তিনি তো আর কিছুই নিতে পারলেন না। এখন তাঁর দুই মেয়ের কী হবে? বলতে বলতে বিলাপ শুরু করেন রেজিয়া। বলেন, ‘অভাবের তাড়নায় বোন এখানে এসেছিল। এখন অভাবকেই ছুটি দিয়েছে আমার বোন। মৃত্যু তাকে অভাব থেকে চিরতরে মুক্তি দিয়েছে। চিরদিনের জন্য মা-হারা হয়েছে তার দুই শিশু রিয়া ও প্রিয়া। তাদের এখন আর বাবা-মা কেউই রইল না।’

আমি তো তারে উপোস রাখিনি
‘আমি তারে কখনো উপোস রাখিনি। তার পরও কেন ইফতারসামগ্রীর জন্য আসল সেটাই বুঝতে পারছি না। এখন আমার সন্তানের কী হবে?’ এমনটা বলতে বলতে বিলাপ করছিলেন রাজমিস্ত্রি আবুল কালাম। কালের কণ্ঠকে এ কথা জানান তিনি। কালামের পাশে দাঁড়িয়ে বিলাপ করছিলেন নিহত স্ত্রী সাকির মা। তিনিও অঝোর ধারায় কাঁদছিলেন। কথা বলতে পারছিলেন না। কালাম জানালেন, তাঁদের সংসারে এক সন্তান রয়েছে। আগের দিন যখন ইফতারসামগ্রী নিতে আসবেন বলে সাকি তাঁকে জানিয়েছিলেন, তখনই নিষেধ করেছিলেন না আসতে। কালাম বলেন, ‘ঘরে অভাব আছে, কিন্তু কখনো না খাইয়ে রাখিনি। এখন সে আমাকে ছেড়ে গেল। রেখে গেল সন্তান। আমি এই সন্তানকে কিভাবে লালন পালন করব?’ বলতে বলতে আবার কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

কালাম কাঁদছিলেন বউয়ের জন্য। তাঁর অদূরেই দাঁড়িয়ে বোনের জন্য কাঁদছিলেন ইসলাম মিয়া। তিনি নিহত রশিদা খাতুনের ভাই। বললেন, ‘বোনের সংসারে খুবই অভাব। অভাবের তাড়নায় আগের রাতেই খাগরিয়া থেকে এখানে এসেছিল। এখন লাশ নিতে হবে আমাকে। এই ভার আমি কিভাবে সইব?’ তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনার খরব পেয়েই আমি ফোন করতে থাকি বোনকে। অনেকক্ষণ কেউ ফোনে সাড়া দেয়নি। পরে একজন পুলিশ ফোন ধরে আমাকে জানায়, বোন নেই।’

যখন পুলিশ নিহত নারীদের মরদেহ ব্যাগে ভরে অ্যাম্বুল্যান্সে তুলছিল, তখন এলাকার আকাশ ভারী হয়ে ওঠে। চারদিকে কান্নার রোল পড়ে। উপস্থিত সবার চোখ ভিজে যাচ্ছিল। আফসোস করে উপস্থিত মোহাম্মদ ইউনুছ বলছিলেন, ‘এত হতদরিদ্র মানুষ আছে সাতকানিয়া-লোহাগাড়া এলাকায়! যারা এক বেলা খাবার পাচ্ছে না। অথচ আমরা চারদিকে শুধু উন্নয়নের গল্পই শুনছি। কিন্তু মানুষের ঘরে তো তীব্র অভাব। আহা রে, শুধু অভাবের কারণেই আজ এতগুলো প্রাণ শেষ হয়ে গেল!’

এমন অব্যবস্থাপনা বারবার কেন?
একদিকে পুলিশ নিথর দেহগুলো অ্যাম্বুল্যান্সে তুলছিল, অন্যদিকে চলছিল মানুষের ফিসফাস। তাদের ভাষ্য, ২০০৮ সালেও একই বাড়িতে এক দফা মানুষ মরেছিল। সেবার সাতজনের মৃত্যু হয়েছিল। তারাও এসেছিল ইফতারসামগ্রী নিতে। তখনো অব্যবস্থাপনার কারণে মানুষের মৃত্যু হয়। এর ১০ বছর পর দ্বিতীয় দফায় ১০ জনের প্রাণ গেল। অথচ প্রথমবারের দুর্ঘটনা থেকে মোহাম্মদ শাহজাহানের পরিবার শিক্ষা নেয়নি। যদি কার্যকর ব্যবস্থা নিত, তাহলে ১০ বছরের ব্যবধানে দুই দফায় ১৭ জনের প্রাণ যেত না।



মন্তব্য